মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, কৃষকের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ভাবনা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের কৃষকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারের এ সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। কারণ দেশের খাদ্য উৎপাদন, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ফলে এ খাতের মূল কারিগর কৃষকের স্বার্থরক্ষার জন্য সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায়বদ্ধতা মেটানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বাজেট বরাদ্দের সুষম বণ্টন এবং একই সঙ্গে কৃষি অর্থায়নের সব সুযোগ-সুবিধা নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। আর এক্ষেত্রে কৃষি ঋণ বিতরণ এবং ঋণের সুষম বণ্টনের বিষয়টি তদারকি করতে হয় সরকারকে।

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কৃষকের জন্য নির্ধারিত ঋণের সুষম বণ্টন হয় না। কৃষকের ঋণ না পাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষকদের ঋণ দিতে চায় না। কৃষি ঋণ পাওয়ার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু আনুষ্ঠানিকতা ও শর্ত রয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের পক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব আনুষ্ঠানিকতা কিংবা শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষককে এনজিও, ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সমবায় কিংবা সমিতি থেকে অর্থ ধার করতে হয়। এনজিও বা সমবায়ে সহজেই ঋণ পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে চড়া সুদ পরিশোধের শর্তেই ঋণ পাওয়া যায়। বেশ কয়েকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এনজিওতে ঋণের সুদহার প্রচলিত ব্যাংক থেকে প্রায় দুই-তিন গুণ বেশি। তাই এনজিও বা সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে কৃষক আদৌ লাভবান হয় কিনা এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা অনেকাংশে দায়ী।

অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় সরকার প্রতি বছর নীতিমালা জারির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর জন্য কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। ঋণ বিতরণের অগ্রগতি তদারকির দায়িত্বও সরকারের। অন্যদিকে ঋণ সুষমভাবে বণ্টনের দায়িত্ব নেয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে অনর্জিত অংশকে জরিমানা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবিএফডিসিএফ বাধ্যতামূলকভাবে জমা করার নির্দেশ দেয়া আছে। প্রতি বছর কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র বলছে, ব্যাংকগুলোর ছলচাতুরির কারণে কৃষি ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। ব্যাংকগুলো অন্য খাতে ঋণ দিয়ে তা কৃষি ঋণ বলে চালিয়ে দেয়। কৃষি ঋণের বদলে মাইক্রোফাইন্যান্সিয়াল খাতে ঋণ বিতরণের বিষয়েই ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বেশি। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি ঋণ বিতরণের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেনি। সরকারি ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে ঋণ কিছুটা হলেও বিতরণ করছে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলো নেটওয়ার্কের অভাব থাকায় এনজিওর ওপর নির্ভর করছে।

কৃষক যাতে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডেই নিয়োজিত থাকতে পারে সে অর্থায়নের জন্যই কৃষি ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া সুষ্ঠু করা জরুরি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এরই মধ্যে কৃষি খাতের বাজার ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য তদারকি প্রতিষ্ঠানকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশও দিয়েছেন। দায়িত্ব নেয়ার পর স্বল্প সময়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি প্রশংসনীয়। তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না। আমরা এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শুধু কৃষি ঋণ বিতরণ করলেই হবে না, ঋণপ্রাপ্তি ও পরিশোধের প্রক্রিয়াও যেন ভোগান্তিহীন হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে বর্তমানে তিনটি তহবিল চালু রয়েছে। এ তহবিলগুলোর অর্থায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির। তহবিলের অর্থ বণ্টনের প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই করতে পারলে কৃষি ঋণ বিতরণ এবং আদায়ের উপায়ও সহজ হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

দেশের ব্যাংকগুলোর কৃষি ঋণের পরিসর সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই বলেই অধিকাংশ সময় প্রতীয়মান হয়। কৃষক শুধু ফসল উৎপাদনের জন্য সার কিনতেই কৃষি ঋণ নেন, বিষয়টি এমন নয়। ঋণ নেয়ার মাধ্যমে কৃষকের পক্ষে উৎপাদন প্রসারণ, জীবিকা বহুমুখীকরণ এবং পণ্য বাজারজাতের কাজ সহজ হয়ে যায়। উৎপাদনমুখী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ঋণ ফেরত দেয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তাদের খেলাপি হওয়ার হারও কম। কৃষকের ঋণ চাহিদার অংক বিশাল নয়। উৎপাদন মৌসুম বিবেচনায় কৃষক স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদি যে ঋণ তারা নিয়ে থাকেন সেগুলো অধিকাংশই খামারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত। সার, সেচযন্ত্র, কীটনাশক এবং অন্যান্য উপকরণের চাহিদাসমেত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং প্যাকেজিং, পরিবহন, শিল্পজাত প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং কৃষিপণ্যের বাজারসমেত ফরওয়ার্ড লিংকেজ গড়ার জন্যই কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু এ ধরনের ঋণ অধিকাংশ কৃষকই পান না। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলে উন্নত ও টেকসই প্রযুক্তির সমন্বয় হচ্ছে না। খামারবহির্ভূত কৃষি খাতে অর্থায়ন বাড়াতে পারলে বর্ধিত কর্মসংস্থান ও আয় নিশ্চিত করা কঠিন হবে না।

শুধু কৃষি ঋণ বিতরণের নীতিমালা দিলেই হবে না, বিতরণ প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত ও সহজলভ্য করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ভালো উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষি অফিসগুলোকে আরো সক্রিয় ও দায়িত্বশীল করতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কৃষি ঋণ বিতরণের উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের ঋণ বিতরণে জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে পুরস্কৃত করারও ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

বাংলাদেশ আজ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ অর্জনের পেছনে কৃষকের ঘাম ও পরিশ্রম রয়েছে। তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কৃষকের হাতে যদি নিশ্চিত উপকরণ পৌঁছে যায়, তবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরো মজবুত হবে। কৃষি হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণ। কৃষিকে অবজ্ঞা করে তথাকথিত শিল্পায়ন বা উন্নয়ন অভিযাত্রা হোঁচট খেতে পারে। তাই নতুন বাস্তবতা কিংবা প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও এর বাস্তবায়ন দরকার। অবাস্তব পরিকল্পনা নয়, দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। কৃষি ঘিরে আমাদের সম্ভাবনার চিত্র যেমন উজ্জ্বল, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দৃঢ় প্রত্যয় সরকার ব্যক্ত করেছে। সরকারের প্রত্যয় বাস্তব রূপ পাক এবং কৃষকের স্বার্থ অসার না হোক, এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।