রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই গৃহস্থালির অপরিহার্য উপাদান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তি তৈরি করেছে। সরকারি হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। কোনো কোনো এলাকায় আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় অতিরিক্ত দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন, বিভিন্ন দেশের নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে দেশের এলপিজি বাজারে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে নিজস্ব মজুদের সক্ষমতা না থাকায় এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে, সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখানে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এলপিজি সংকটের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। একটি পক্ষ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গত ২০ নভেম্বর ৪৮ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে তালিকায় রয়েছে সিঙ্গাপুর, ইরান ও ভারতের ১৪ ব্যবসায়ী, ২৪টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০টি এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহনকারী জাহাজ। নিষেধাজ্ঞার ফলে এসব ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাজারে। তবে ব্যবসায়ীদের আরেকটি অংশ এ সংকটকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফল হিসেবে দেখতে নারাজ। তারা বলছেন, দেশের কয়েকটি বড় কোম্পানি হঠাৎ করে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দেয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এসব কোম্পানির অনুপস্থিতিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি বাড়াতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি পায়নি। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হয়েছে।

শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির উচ্চ চাহিদা এমনিতেই দাম বাড়িয়ে দেয়, তার ওপর আমদানির ঘাটতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সে বাস্তবতা মাথায় রেখেই আগাম পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত আমদানি নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, এলপিজি সরবরাহ সংকটের আভাস পাওয়া সত্ত্বেও সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে এ পরিস্থিতি সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করেছে।

এ সংকটের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। সংস্থাটি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের গৎবাঁধা দায়িত্ব পালন করলেও সেই দাম বাজারে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা দেখার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা তাদের নেই বললেই চলে। এতে অসাধু চক্র আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সংস্থাটির মাঠপর্যায়ে নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা এলপিজির দাম ইচ্ছামতো বাড়াচ্ছেন। রান্নার গ্যাসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে এমন লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর যে ধরনের কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা ছিল, তা মাঠপর্যায়ে অদৃশ্য। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নীরবতাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।

দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টির লাইসেন্স থাকলেও বাজারে আছে ২৮টির মতো কোম্পানি। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও কার্যকরভাবে বাজারে সক্রিয় কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। এতে বাজারে প্রতিযোগিতাকে সীমিত করে এবং সংকটকালে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে ভবিষ্যতেও এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। কিছু বড় কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প সরবরাহ দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা অন্যদের থাকে না। সরকারি অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতা এক্ষেত্রে সংকটকে আরো দৃঢ় করে। এ সুযোগে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি ও দাম বাড়ানো সহজ হয়।

রান্নার গ্যাস কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এলপিজি সংকটকে শুধু বাজারের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাই বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে অভিযান চালাতে হবে। যেসব বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে মূল্য বেশি নেবে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাহাজ–সংকট কাটাতে আমদানিকারকদের বিকল্প কোনো পথ বা ভিন্ন পতাকাবাহী জাহাজের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত মজুদের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সীমিত এবং তা দ্রুত কমে আসছে। বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত ও গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আবার অবকাঠামোগত দুর্বলতায় এলএনজি আমদানিতে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। ফলে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিপ্রেক্ষিতে দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণে ভালো বিকল্প হতে পারে এলপিজি। তবে বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি এবং তা এলপিজি খাতের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। প্রয়োজনীয় সরকারি নীতিসহায়তা এবং আমদানি ও সরবরাহের জন্য উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে ভোক্তা পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। নীতিসহায়তা ও অবকাঠামো থাকাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ—এ চারটির সমন্বয় না হলে এলপিজির দাম বাড়ার প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়।

বিইআরসিকে শুধু মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সংস্থাটিকে কার্যকর ও সক্রিয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনকে এখনই দৃঢ় হস্তক্ষেপ করতে হবে। অন্যথায় এলপিজি সংকটের উত্তাপ আরো বাড়বে।