দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে ২০২২ সালের শেষে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালে এসব কূপ খনন করে জাতীয় গ্রিডে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা। এ প্রকল্পের সময় শেষ হতে আর মাত্র বাকি রয়েছে দুই মাস। কিন্তু প্রকল্পের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ কূপের কাজ যেমন শেষ করা যায়নি, তেমনি প্রকল্পের আওতায় যতগুলো কূপ খনন করে যতটুকু গ্যাস মিলেছে তার ৬২ শতাংশই গ্রিডে ‍যুক্ত করা যায়নি। দেশের স্থানীয় গ্যাসের সংকট ক্রমেই যেখানে ঘনীভূত হচ্ছে, সেখানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গ্যাস কূপ খনন করে তা গ্রিডে যুক্ত করতে না পারাতে পেট্রোবাংলা তথা জ্বালানি বিভাগের ব্যর্থতাকেই বড় করে তুলে ধরছে।

প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে দ্বীপ জেলা ভোলায় গ্যাসের আবিষ্কার হয় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে। অথচ এ আবিষ্কারের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানকার গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা যায়নি। ভোলায় গ্যাস আবিষ্কার করে তা জাতীয় গ্রিডে আনা যাবে না এমন প্রাক্কলন আগেই ছিল সরকারের কাছে। কারণ মূল ভূখণ্ড থেকে ভোলার সঙ্গে গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই। ফলে সেখানকার গ্যাস আবিষ্কার করে তা আদৌ জ্বালানি খাতে কোনো সুফল দিতে পারবে কিনা এমন প্রশ্ন বারবার উত্থাপন হয়েছে। অথচ সেখানেই কূপ খনন করে বিপুল মজুদ আবিষ্কার হলেও উত্তোলনের কোনো সুযোগ তৈরি করা যায়নি। আর্থিকভাবে এসব কূপ গ্যাস খাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

বিগত দুই দশকের বেশি সময় স্থানীয় গ্যাসকূপ খননে বিগত সরকারের অবহেলা ছিল। বিপুল অর্থ ব্যয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সমালোচনা থেকেই স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কিছুটা মনোযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ কতটুকু আর্থিকভাবে সফল হয়েছে তা নিয়ে নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তোলা যায়। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সময়ের প্রকল্পগুলোয় সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সেই একই ঘটনা ঘটছে জ্বালানি খাতের গ্যাস অনুসন্ধানে। কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কূপ খনন করা হলেও এখন পাইপলাইন নির্মাণের অভাবে গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। অথচ গ্যাস কূপ খনন ও পাইপলাইন প্রকল্প সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা গেলে আবিষ্কৃত গ্যাস লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গ্রিডে ‍যুক্ত করার সুযোগ ছিল।

জ্বালানি বিভাগের ৫০ কূপ খনন প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য থেকে জানা গেছে, ১৮টি কূপ খনন করে যে পরিমাণ গ্যাস আবিষ্কার করা হয়েছে তার ৬২ শতাংশই গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা আর মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও এখনো ১৮টি প্রকল্প শুরুই করা যায়নি। তিনটি প্রকল্প ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব অগ্রগতি বলে দেয় ৫০ কূপ খননের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।

এ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে আরো ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। আওয়ামী সরকার সময়ে নেয়া এসব প্রকল্প কতটুকু বাস্তবসম্মত সেটি যাচাই-বাছাই না করে অন্তর্বর্তী সরকারও উচ্চাভিলাষী এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন করতে যাচ্ছে। অথচ এর আগে কূপ খননে বাপেক্সের নেয়া ‘রূপকল্প’ প্রকল্পের মতো উচ্চকাঙ্ক্ষী ও ব্যর্থ প্রকল্প নেয়ার বড় উদাহরণ রয়েছে। ১০০ কূপ খননে পেট্রোবাংলা ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চায়। অথচ চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো সন্তোষজনক নয়।

দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় কূপ খননে আশাব্যঞ্জক কিছু না পাওয়ায় বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি কেনার প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা কিনতে সরকারের প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বিপুল অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি না করে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, রিগ, দক্ষ লোকবল নিয়োগ করা গেলে তাতে বড় সুফল মিলতে পারে বলে বারবার জানিয়ে আসছেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা। অথচ দেখা যাচ্ছে, গ্যাস খাতের সহজ সমাধান হিসেবে আমদানি গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। অথচ তা দিয়ে কতটুকু চাহিদা পূরণ হচ্ছে এটা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প, পরিবহন, গৃহস্থালি—সবখানেই স্থানীয় গ্যাসের বড় নির্ভরতা এখনো। বলা চলে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাসের ওপর এখনো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে পর্যায়ক্রমে আমদানি ও ব্যয়বহুল গ্যাস দেশের অর্থনীতিতে বড় জায়গা দখল করে নিয়ে তা জ্বালানি খাতের জন্য তীব্র হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। শিল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, এমনকি সস্তার এ জ্বালানি পণ্যটির ক্রয়ক্ষমতা হারাতে পারে দেশের মানুষ। গ্যাস সংকটের কারণে এরই মধ্যে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন তীব্র আকারে ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা ঠিকমতো না চলায় এ খাতে কর্মহীন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মানুষ। যথাযথ উৎপাদন না হওয়ায় ক্রয়াদেশ ও রফতানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

গ্যাস খাতে কূপ খননে সমন্বয়হীনতা ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে ধীরগতির ফলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে দেশের জ্বালানি খাতে। সুতরাং পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের উচিত এসব বিষয়ে যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং যাতে আবিষ্কৃত গ্যাস যত দ্রুত সম্ভব গ্রিডে যুক্ত স্থানীয় নির্ভরতা বাড়ানো যায়।