প্রতিটি টাকার গুরুত্ব আছে। প্রশ্ন হলো কীভাবে তারা তাদের সীমিত সম্পদ এমনভাবে বণ্টন ও ব্যবহার করবেন, যাতে সব সন্তানের সর্বোচ্চ উপকার হয়।

এটি সম্পদ সমানভাবে ভাগ করে দেয়ার বিষয় নয়। সমান বণ্টন মানেই কার্যকর বণ্টন, তা নয়। কার্যকারিতা মানে হলো সীমিত সম্পদ থেকে সর্বোত্তম ফল অর্জন করা। প্রতিটি সন্তানের চাহিদা আলাদা, কারো ক্ষেত্রে বাড়তি মনোযোগ বা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। যদি এ সিদ্ধান্তগুলো খেয়ালখুশি বা এলোমেলোভাবে নেয়া হয়, তবে তার ফল ভোগ করতে হয় এক বা একাধিক সন্তানের—কখনো কখনো সবাইকে। সন্তানের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করা কোনো লটারির টিকিট কেনার মতো বিষয় নয়। ফল অনিশ্চিত, আর ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য বাস্তব ও গুরুতর। তাহলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, যেন সীমিত সম্পদেও সর্বোত্তম ফলাফল পাওয়া যায়?

এবার কল্পনা করুন, একই সিদ্ধান্ত নেয়ার সমস্যাটি জাতীয় পর্যায়ে। যাদের আমরা নির্বাচিত করি, যারা ক্ষমতার আসনে বসে আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন—তাদের কথা ভাবুন। পরিবারের ভেতরের যে আপস ও বাছাইয়ের প্রশ্নগুলো থাকে, সেগুলোই বৃহত্তর রূপে ফিরে আসে সংসদে, মন্ত্রণালয়ে এবং নীতিনির্ধারণী টেবিলে, যেখানে আইন প্রণয়ন হয়। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত—সরাসরি বা পরোক্ষভাবে, তাৎক্ষণিকভাবে বা সময়ের সঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমাদের জীবন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে শিক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সর্বাধিক।

অনেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘ভাঙা’ বলে বর্ণনা করেন। আমার মতে, এটি কখনো যথেষ্ট শক্ত হয়ে গড়েও ওঠেনি যে ভাঙবে। এটি একটি অসম্পূর্ণ অসমাপ্ত সিঁড়ির মতো, যার ধাপগুলো বিভিন্ন দিকে চলে গেছে, ফলে ওপরে ওঠা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা কোনোভাবে এ শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে টিকে থাকে, তারা হয়তো কোনোমতে লাফ দিয়ে সিঁড়ি পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়। অন্যদিকে আমরা বছরের পর বছর শিক্ষা সংস্কারের কথা বললেও শিক্ষা সংস্কারের সিঁড়িতে খুব বেশি পরিবর্তন আসে না। সিঁড়ি খুব একটা নড়ে না। পরিবর্তন অধরাই থেকে যায়। প্রশ্ন হলো—কেন?

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে গত কয়েক সপ্তাহ ছিল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার ও নানা প্রস্তাবে ভরা। প্রায় সব দলের কথাবার্তায় শিক্ষার গুরুত্ব উঠে এসেছে—কখনো কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে, কখনো মেয়েদের শিক্ষা বা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে, যেমন ট্যাব বা ল্যাপটপ বিতরণ। একই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিশন ডকুমেন্ট প্রকাশ করেছে; প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে একটি প্রতিবেদন শিগগিরই আসার কথা।

এ ভিশন ডকুমেন্টগুলো নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য এবং আমার দৃষ্টিতে মানসিকতার পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সঙ্গেই একটি অনিবার্য প্রশ্ন আসে—এরপর কী? কাগজের ভাবনা কীভাবে বাস্তব শ্রেণীকক্ষে পৌঁছবে? নীতিপত্র থেকে প্রয়োগে যাওয়ার পথটি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

একই প্রশ্ন রাজনৈতিক ইশতাহারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো উদ্যোগকে সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করার আগে কতটা চিন্তাভাবনা ও প্রস্তুতি নেয়া হয়? সরকারে গেলে শিক্ষা খাতে কোথায় ও কীভাবে জনসাধারণের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং কোন কাঠামোর ভিত্তিতে? আমাদের লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য কি এই দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষালাভ সম্পর্কে একটি যৌথ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে?

এ দুই ধারার কথাবার্তাতেই একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো অনুপস্থিত—প্রমাণভিত্তিক জ্ঞান সৃষ্টির প্রচেষ্টা। যেকোনো গবেষণা নয়, বরং এমন গবেষণা, যা আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে দেয় কোনো ধারণা সত্যিই বড় পরিসরে প্রয়োগের যোগ্য কিনা। এর জন্য প্রয়োজন একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ‘পাইলট–পরীক্ষা-বিস্তৃতি’ মানসিকতা, যা পরীক্ষামূলক ও আচরণগত অর্থনীতিবিদ জন লিস্টের মতে ‘ভোল্টেজ ড্রপ’ এড়াতে সাহায্য করে। প্রায়ই দেখা যায়, কোনো উদ্যোগ ছোট পরিসরে সফল হলেও বড় আকারে প্রয়োগ করলে তার কার্যকারিতা কমে যায়—এটাই ভোল্টেজ ড্রপ। এর কারণ হতে পারে জনগোষ্ঠীর পার্থক্য, প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন, বাস্তবায়নের মানের অবনতি, ব্যবস্থাগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা গুণগত মানের বদলে সংখ্যার ওপর জোর দেয়া।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরোতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখছি:

১. ভিশন ও প্রমাণকে আলাদা করুন এবং দুটোকেই তাদের কাজ করতে দিন

প্রথমত, একটি তিন স্তরবিশিষ্ট নীতিনির্ধারণ কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন: একটি ভিশন নির্ধারণকারী দল, একটি গবেষণা দল এবং একটি অ্যাডভোকেসি বা জনসম্পৃক্ততা দল। এ দলগুলো যেন ব্যক্তিনির্ভর বা স্থায়ী না হয়; বরং একটি স্বচ্ছ, প্রক্রিয়াভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে গঠিত ও সময়ান্তরে পুনর্গঠিত হয়, যাতে স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত থাকে। এতে একাডেমিয়া, নাগরিক সমাজ, বাস্তবায়নকারীরা এবং অন্য অংশীদারদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে, সঙ্গে থাকতে হবে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা।

ভিশন নির্ধারণ ও অ্যাডভোকেসির কাজ হবে শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য নিয়ে বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা চালানো। আর গবেষণা দল, যা আনুষ্ঠানিকভাবে সিস্টেমের ভেতরে সংযুক্ত থাকবে—তাদের দায়িত্ব হবে প্রস্তাবিত ধারণা ও সমাধানগুলোকে সুপরিকল্পিত পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে কঠোরভাবে যাচাই করা। নীতিনির্ধারকরা তখন অন্তর্দৃষ্টি বা রাজনৈতিক সুবিধার বদলে এ প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। যদি সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান অগ্রাধিকার হয়, তবে গবেষণার কাজ হবে—কী সত্যিই কাজ করে, তা চিহ্নিত করা, বড় পরিসরে নেয়ার আগে।

২. রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার

দ্বিতীয়ত, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের দীর্ঘমেয়াদে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। শিক্ষানীতি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। একটি ২০ বছরের দৃষ্টিভঙ্গি সরকার বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যেতে পারে না।

৩. তথ্যকে দিন দীর্ঘ গল্প বলার সুযোগ

তৃতীয়ত, তথ্যভিত্তিক মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে এবং এমন দীর্ঘমেয়াদি ডেটা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পথ বুঝতে সাহায্য করবে।

আমার লক্ষ্য এখানে বিদ্যমান গবেষণা পুনরাবৃত্তি করা নয়। আমরা পরিসংখ্যান জানি, সমস্যাও জানি। আমাদের ঘাটতি হলো নির্ভরযোগ্য, পরীক্ষিত ও ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধানের। প্রতিটি টাকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্য।

আমি যে নতুন চিন্তাধারার কথা বলছি, তা আমাদের শিক্ষা অগ্রগতির পেছনে ছুটে চলা থেকে বাস্তব অগ্রগতি অর্জনের পথে নিয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বাস করি। এর উত্তর নিহিত আছে ব্যবস্থার পরিবর্তনে—কে সিদ্ধান্ত নেবে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এবং অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সেই কাঠামো বদলে দেয়ায়। গবেষণাকে ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য স্তর হিসেবে যুক্ত করা এবং গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়াই এখানে মূল কথা। এ স্তরটি ছাড়া শিক্ষা নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে, কিন্তু রূপান্তর ঘটে না।

এ কারণেই শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষা’ বলতে আমরা অনেক সময় শিশুদের জীবন নিয়ে খেলা বোঝাই। কিন্তু খেলা আর এক্সপেরিমেন্ট এক নয়। প্রকৃত পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক, খেলা হলো জুয়া। পুরনো পাঠ্যক্রম, নতুন পাঠ্যক্রম, সৃজনশীল মূল্যায়ন, গঠনমূলক মূল্যায়ন—পরিবর্তনের স্তূপ জমে, প্রায়ই যথাযথ পাইলটিং, বাস্তবায়ন নির্দেশিকা, কিংবা অভিভাবক-শিক্ষক-স্কুলপ্রধানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার অভাবে।

গবেষকরা, আমিও তার অন্তর্ভুক্ত, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আসছি। এখন সময় এসেছে সমান গুরুত্ব দিয়ে এমন সমাধান চিহ্নিত করার, যেগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কার্যকর প্রমাণিত। ব্যর্থ উদ্যোগের কবরস্থান বড় না করে, আমাদের সম্পদ বিনিয়োগ করা উচিত কঠোর গবেষণায়, যা বলে দেবে—কোনটি সত্যিই ফল দেয়।

শেষে একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। ধরুন, আমরা চাই শিশুরা গণিত, বাংলা ও ইংরেজিতে আরো গভীরভাবে ভাবতে শিখুক। একটি ধারণা হতে পারে—মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলে দেয়া, যাতে মুখস্থবিদ্যা আর যথেষ্ট না হয়; শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কবিতা লিখতে বলা, বিখ্যাত কবিতা হুবহু মুখস্থ লেখার বদলে।

আপনি যদি এ প্রস্তাবে একমত হন, অনুগ্রহ করে থামুন—এখনই একমত হবেন না। এটি কেবল একটি ধারণা। গবেষকদের সুযোগ দিন এটি পরীক্ষা করার, পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ তৈরির এবং তারপর শক্ত ভিত্তির ওপর আলোচনা করার। যে কেউ সমস্যা চিহ্নিত করতে বা ধারণা দিতে পারে। কিন্তু সমাধান বাস্তবায়নের জন্য—বিশেষ করে নীতিনির্ধারণে প্রয়োজন আরো গভীর, শৃঙ্খলাবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

এটাই আমার মূল বক্তব্য: শিক্ষা নিয়ে আরো বৈজ্ঞানিকভাবে ভাবা। অন্তর্বর্তী সরকার ভিশন ডকুমেন্টের মাধ্যমে হয়তো সঠিক পথে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু গবেষণাভিত্তিক পরবর্তী ধাপ না এলে এ প্রচেষ্টার ফল খুব সীমিতই থাকবে।

আমি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক লিখেছি, বারবার লিখেছি। এবার লিখছি নতুন কোনো ধারণা যোগ করতে নয়, বরং এই প্রশ্ন তুলতে—কোন ধারণা গুরুত্ব পাবে, তা যেন আমরা সঠিক উপায়ে ঠিক করি। যতদিন না প্রমাণ ভাষণের জায়গা নেয়, ততদিন প্রকৃত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে—এ আশঙ্কাই রয়ে গেল।

ড. রুবাইয়া মোরশেদ: শিক্ষা খাতে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক