স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন একজন উপদেষ্টা। জন ও খাদ্যনিরাপত্তা বিবেচনায় দুটি মন্ত্রণালয়ই গুরুত্বপূর্ণ। একজন উপদেষ্টার পক্ষে দুটি মন্ত্রণালয়কে সমান সময় ও গুরুত্ব দেয়া কঠিন। নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে উপদেষ্টাকে। এর পরও এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হয়নি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। পুলিশ পুরোপুরি মাঠে নামাতে না পারায় আবারো সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এতসব ব্যস্ততার মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়কে ঠিকমতো সময় দিতে পারছেন না উপদেষ্টা। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দপ্তর বা সংস্থা আছে ১৮টি। সাধারণত কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের দু-এক মাসের মধ্যেই অধীন সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু গত ১৬ আগস্ট এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর এখনো এর অর্ধেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠকে বসতে পারেননি উপদেষ্টা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করেও তারিখ পাচ্ছেন না। আবার কয়েকটিতে নিকট ভবিষ্যতে তার বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা তাও জানা নেই কর্মকর্তাদের। কীভাবে কাজ করবেন বা সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা সেসব বিষয়েও কোনো নির্দেশনা পাচ্ছেন না কর্মকর্তারা। সবদিক বিবেচনায় নিলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে কৃষির সমস্যাগুলো প্রয়োজনীয় মাত্রায় গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন হ্রাস ও উপকরণ সংকটে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। যেহেতু কৃষি কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনীতির সংমিশ্রণে বিশেষায়িত একটি খাত সেহেতু অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে গতিশীল রাখা উচিত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে যাবে। দুই বছর পাঁচ মাস ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমবে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পার হলেও এখনো বাজারে সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে এখনো। উদ্বেগ রয়ে গেছে কৃষি খাতের উৎপাদন নিয়েও। আবার সার, বীজ ও কীটনাশকের মতো প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের সংকটও কাটেনি। এসব সংকট মোকাবেলায় দরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। কিন্তু এসব সংকট মোকাবেলায় এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি মন্ত্রণালয়কে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সংকট মোকাবেলায় উৎসাহ ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা পৌঁছে দিয়ে পুনরায় কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে মন্ত্রণালয়টিতে আলাদা একজন উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেয়া উচিত। এতে শক্তিশালী নেতৃত্বের অধীনে এ মন্ত্রণালয় পরিচালিত হওয়া উচিত।
দেশের অর্থনীতি এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বৈশ্বিক, ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব, বিশেষ করে দুবারের বন্যা দেশের খাদ্য উৎপাদনকে আরো কঠিন করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য খাদ্যনিরাপত্তা সমস্যা সমাধানের জন্য এখন থেকেই পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। দেশে চিনির উৎপাদন ও আমদানি—দুটোই এখন কমতির দিকে। সরবরাহ সংকটে পণ্যটির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএসআরআই) কাছ থেকে দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সরকার এরই মধ্যে কয়েকটি চিনিকল নতুনভাবে চালুর উদ্যোগও নিচ্ছে। কিন্তু বিএসআরআইয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না। এদিকে চালের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি এখন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক দুটি বন্যা এবার আমনের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এ কারণে ধানের ফলন গতবারের তুলনায় কমে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। তাছাড়া দেশে এবার গমের উৎপাদন গত পাঁচ বছরের গড়ের ৩ শতাংশ কমে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আমনের উৎপাদন ১ লাখ ৬৫ হাজার টন ছাড়ানোর দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু বাজারে চালের দাম বাড়তে থাকায় এ উৎপাদনের কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত উৎপাদন সরকারের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে চালের দাম এভাবে বাড়ত না। কৃষির সমস্যাগুলোকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার ছিল তা হচ্ছে না।
আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কৃষিপণ্য পরিবহনকে চাঁদাবাজি মুক্ত রাখতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এর প্রভাব পড়ছে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের দামে যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকেও বাড়িয়ে তুলছে। বাজারে সিন্ডিকেট, সড়কে চাঁদাবাজি, অবৈধ মজুদদারি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এখনো বিদ্যমান। এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য এখনো ঊর্ধ্বমুখী।
দুই বছর পাঁচ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রয়োজনীয় খাদ্যমূল্য দেশের সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৃষি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষি, তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও প্রবাসী আয়কে দেখা হয়। দেখা গেছে, কৃষকদের পুত্র-কন্যারা এ তিন খাতেই কাজ করছেন। প্রায়ই তারা তাদের আয়ের একটি অংশ গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে পাঠান। এ অর্থ ছোট ও বড় উভয় ধরনের কৃষি উদ্যোগে বিনিয়োগ করা হয়। এটি কেবল আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেনি বরং যুবসমাজ, বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়ন করেছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বা দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। কিন্তু এখন যথাযথ গুরুত্ব না দিলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে আসা বিভিন্ন প্রভাব মোকাবেলা দেশের জন্য আরো কঠিন হয়ে উঠবে। এজন্য আমাদের যতটা সম্ভব খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা উচিত। দেশের বিপুল জনসংখ্যা, আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কৃষি খাতে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ কৃষি খাতে নিযুক্ত। তাই আমাদের রাষ্ট্রনীতিগুলো এ খাতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গ্রহণ করা উচিত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোকে সমন্বয় করে কাজ করা গেলেই দেশ এগিয়ে যাবে এবং কৃষি খাত সমৃদ্ধি লাভ করবে। সর্বোপরি দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।










