নীতি কনক্লেভের আলোচনায় সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের তথ্য-উপাত্তের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমি বলতে চাই, আমাদের এখানে ব্যবসায়ীদের ভালো অনুশীলনের অভাব রয়েছে। যেমন পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয়, সঙ্গে সঙ্গে দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। আবার দেখা যায়, চালের সরকারি মজুদ কমে গেলেই মিলাররা চালের দাম বাড়িয়ে দেন। যে কারণে বছরজুড়ে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়। আগামী রমজানের জন্য এবার পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্যের সংরক্ষণ আছে। তার পরও দেখা যাবে, রমজান শুরু হলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াবেন এবং পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করবেন। তাই আমার মনে হয়, দাম সহনীয় রাখতে মূলত আমাদের ব্যবসায়ীদের আচার-আচরণে পরিবর্তন আনা দরকার।
- দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ৩১টি পণ্যে শুল্ক কমিয়েছে, কিন্তু বাজারে পণ্যগুলোর দাম এক পয়সাও কমেনি। কিন্তু কয়দিন আগে যখন ভ্যাট বাড়ানো হলো, সেদিন রাতেই অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ভ্যাট আমরা দিতে চাই। কিন্তু এনবিআরকে সেখানে সুষ্ঠু তদারকি করতে হবে। কেবল ঢাকার বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেগুলোয় ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন নেই। অর্থাৎ সেটার সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ দোকানে নেই। তাহলে ভোক্তার দেয়া ভ্যাট কোথায় যাচ্ছে?
- এখানে দাম বাড়ানো নিয়ে নানা যুক্তি দেয়া হয়—ভ্যাট বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে এখানেও দাম বেড়ে যায়। কিন্তু যখন বিশ্ববাজারে দাম কমে আসে, তখন এখানে দাম এক পয়সাও কমে না। উদাহরণ হিসেবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে গমের দাম আর এ দেশে গমের দামের দিকে লক্ষ করা যায়। সুতরাং দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের ব্যবসায়ীদের অনুশীলনের সমস্যা। এ নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমাদের অনুশীলনে যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে কীভাবে দাম কমবে? আবার আগে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের সংকট হতো, তবে এখন সব পণ্যেরই সংকট হচ্ছে। ব্যবসায়ীসহ সবাইকে এ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ যিনি সয়াবিন তেলের ব্যবসা করেন, তাকেই আরো পণ্য কিনতে হয়। তাই বাণিজ্য উপদেষ্টার মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়ীদের আশ্বাস চাই—রমজানে আর ভোক্তাদের পকেট কাটা হবে না।
- পণ্যের দাম বা মুনাফা কেমন হবে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকবে। দু-একজন ব্যবসায়ীর কারণে আমাদের ওপর একটি নেতিবাচক ধারণা চলে আসে। আমাদেরও ন্যায্য অধিকার দরকার আছে, সমতার দরকার আছে। বর্তমান সরকার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এখনো ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এখন ভোক্তাদের চাহিদা কমছে, ছোট হয়ে আসছে। অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন এমন খবরও পাচ্ছি। আমরা এমনটা চাই না। এ ব্যবসায়ীদের ভোক্তা, প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবতে হবে। তেমনি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সেলফ রেভল্যুশন দরকার।
- ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে ব্যবসায়ী ও সরকারকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ১৮ কোটি মানুষ যে সমস্যাগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে সেগুলো থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেলফ রেভল্যুশন এলেই ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা হবে।
- বৈষম্য বিলোপের কথা বলা হলেও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন বাজারে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়, একজন সীমিত আয়ের মানুষকে তখন বাধ্য হয়ে খাবারের চাহিদা ও তালিকা ছোট করতে হয়।
এস এম নাজের হোসাইন: সহসভাপতি, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম: বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










