বিভিন্ন জেলা, বড় শহর বা নগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী জাতীয় সড়ককে মহাসড়ক বলা হয়। মহাসড়কের একটি বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুতগতিতে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে। এজন্য পৃথিবীর সব স্থানে মহাসড়কগুলো প্রশস্ত করে বানানো হয়। বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে মহাসড়কগুলোকে প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে এমন মহাসড়ক খুব কমই আছে, যেগুলোয় বাধাহীন বা নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে। এর প্রধান কারণ হাটবাজারসহ অবৈধ স্থাপনা, অবকাঠামো এবং বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড। নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনা ও পার্কিং অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এক বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের উচ্চ আদালত। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। আবার সড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কিংবা স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা ২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এ আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানা গেছে বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে। তারা বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কের আশপাশে থাকা হাটবাজার ও অবৈধ অবকাঠামো অপসারণও করেছেন। কিন্তু অপসারণের মাসখানেকের মধ্যে পুনরায় এ ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠে। আর সেটিও হচ্ছে ২০২৩ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইনের বিধান অনুসারে। এ আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে হাট ও বাজার স্থাপন করতে পারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। মূলত দুই আইনের সাংঘর্ষিক অবস্থার কারণেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কসহ প্রায় সব সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাটবাজারসহ অবৈধ স্থাপনা ও অবকাঠামো। সড়ক-মহাসড়কে বাধাহীন বা নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচলের জন্য দুই আইনের মধ্যে যেসব অসামঞ্জস্য রয়েছে সেগুলোর দ্রুত অবসান ঘটিয়ে আইনে সামঞ্জস্য আনা উচিত। অনতিবিলম্বে দুই আইনের মধ্যে সমন্বয় করে সড়ক-মহাসড়কে বাধাহীন বা নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাসভিত্তিক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের তথ্য যোগ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫ হাজার ৪৮০ জন, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুসারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা আরো বেশি। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, সড়কে বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি সরকার। হাইওয়ে পুলিশের এক তথ্যে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটবাজারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এসব হাটবাজারে আসা ছোট ছোট যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে তীব্র আকার ধারণ করছে যানজট। মাঝেমধ্যেই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
মহাসড়ক বা হাইওয়ে হওয়ার কথা নির্বিঘ্ন যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু দেশে অনেক মহাসড়কের পাশে হাটবাজারের মতো প্রতিবন্ধক তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনা কমানো ও যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বাজার এড়িয়ে বাইপাস তৈরি করা হলে সেই বাইপাস ঘিরেও গড়ে উঠছে হাটবাজার। বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে মহাসড়কগুলো কার্যত মহাসড়ক হয়ে উঠতে পারছে না। বর্তমানে সারা দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ছোট-বড় হাজার হাজার দোকান নিয়ে কয়েকশ স্থায়ী, অস্থায়ী ও অবৈধ হাটবাজার গড়ে উঠেছে। এসব হাটবাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। এছাড়া যত্রতত্র মানুষের রাস্তা পারাপারের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে যানজট। এতে একদিকে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে সময়ের অপচয়। কাজেই এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কসংলগ্ন দোকানপাট উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পরই তা আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। দুই আইনের অসামঞ্জস্য এবং নিষ্ফল অভিযানের কারণে দখলদাররা আরো বেশি উৎসাহিত হয়। মহাসড়কের পাশে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী। কিন্তু তার পরও থেমে নেই স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা। মহাসড়কগুলো যাতে স্থানীয় সড়কের মতো হয়ে না যায়, সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দেশের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। স্থানীয় লোকেরা মহাসড়কে যানবাহন চলাচলকে কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের অবৈধ বাণিজ্যও করতে চায়। এসব সমস্যার সমাধানে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বস্তুত মহাসড়কের ওপর বা পাশে হাটবাজার বসানোর কোনো সুযোগ নেই। বাধাহীনভাবে গাড়ি চলার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি হলে সেই সড়ক মহাসড়কের বৈশিষ্ট্য হারায়। মহাসড়কে চাইলেই যেকোনো যানবাহনের প্রবেশের সুযোগ থাকার কথা নয়। যেহেতু এ সড়কে গাড়ি চলে উচ্চগতিতে ও বাধাহীনভাবে, সেহেতু সেখানে অযান্ত্রিক যানবাহন প্রবেশেরও সুযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে লক্ষ করা যায়, মহাসড়কের যত্রতত্র অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করছে। এসব বন্ধ করা জরুরি।
ভারতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ হাইওয়েগুলো। ভারত হাইওয়েগুলোকে সর্বাধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করে গড়ে তুলছে। এ হাইওয়েগুলোয় ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য অধিকাংশ হাইওয়েতে গাড়ি দাঁড়ায় না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শক্ত আইন রয়েছে, রয়েছে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা। এছাড়া পথে পথে ট্রাফিক পুলিশ প্যাট্রোলিং, চেকিং করা হয়। উন্নত সড়ক নির্মাণ ও মহাসড়কে সবুজায়ন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর আর্জেন্টিনার মহাসড়কগুলো মহাপরিকল্পনার অনন্য ফসল। আর্জেন্টিনার নদী, পাহাড়, রুক্ষ, দুর্গম অঞ্চল মহাসড়ক নির্মাণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেসব ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে দেশটির সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়। আর্জেন্টিনার অন্তত ১৫টি মহাসড়ক বিশ্বজুড়েই আলোচিত ও প্রশংসিত। দেশটির বিখ্যাত হাইওয়ের কথা এলে অনেকেই ‘রুতে ফোরটি’র কথা বলেন। পশ্চিম আর্জেন্টিনার গর্ব এ মহাসড়ক। পুনা থেকে কাবো ভার্জিন পর্যন্ত দীর্ঘ হাইওয়েটি পাড়ি দিয়েছে ৩ হাজার ৪৫ মাইল! রীতিমতো অবিশ্বাস্য দৈর্ঘ্যের এ মহাসড়ক আর্জেন্টিনার সবচেয়ে দীর্ঘ মহাসড়ক।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মহাসড়কগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গতিতে ছুটে চলে গাড়ি। ঘণ্টায় ১০০ মাইল বেগে ছুটে পাড়ি দেয় শত শত কিলোমিটার। বাংলাদেশের মহাসড়কের চিত্র পুরো উল্টো। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান মহাসড়কগুলো চলে গেছে বিভাগীয় শহরে। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র মহাসড়কগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। মহাসড়কে যানজটের চিত্র ঈদ মৌসুমে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নিয়ম ভেঙে মহাসড়কে গাড়ি চলার উৎসব চলে। ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মহাসড়কে নেমে অবস্থা আরো শোচনীয় করে তোলে। মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকসহ যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, বৃষ্টির কারণে খানাখন্দ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকল হয়ে পড়া যানজটের মূল কারণ। প্রধান মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে যানজটের তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে এর সাধারণ শর্তগুলো মানতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে যে একটি কার্যকর মহাসড়ক শুধু রাস্তা চওড়া করার ওপর নির্ভর করে না। একে বাধাহীন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশের দিকে যাত্রার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো উন্নত ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেটা নিশ্চিত করতে হলে সড়ক হাটবাজারমুক্ত করতে হবে। যারা অবৈধভাবে হাটবাজার বা বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুই আইনের মধ্যে যেসব অসামঞ্জস্য রয়েছে সেগুলোর অবসান ঘটাতে হবে। হাটবাজারসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। সে নির্দেশনাও সরকারকে যথাযথভাবে পরিপালন করা উচিত। সর্বোপরি নিরাপদ সড়ক ও পরিবহনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।










