বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রুটিন কাজ হচ্ছে মুদ্রানীতি প্রণয়ন। বছরে দুবার মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হয়। সাধারণত ঋণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। লক্ষ্য থাকে, কর্মসংস্থানের জোগান দিয়ে সরকার নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশ।
জানা গেছে, এ মাসের শেষের দিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হতে পারে। মুদ্রানীতির মূল কাজ হচ্ছে অর্থপ্রবাহ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এবারের মুদ্রানীতিতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেমে আসেনি, অন্যদিকে ঋণপ্রবাহ কম থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে আছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ঠিক রাখতে গিয়ে মুদ্রানীতি একটু ব্যতিক্রমধর্মী হওয়ার দাবি রাখে।
গত মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা ছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুনের মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখা যায়, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে, যা বিগত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে যা মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করেছে। মুদ্রাস্ফীতি কমানোর প্রায়োগিক পন্থা ব্যবহার করায় এমন ফল পাওয়া গেছে যা বিগত সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ক্রমবর্ধমান ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পূর্বে তার নীতিমালার হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। যদিও এ পদক্ষেপ মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করেছিল, তবে এটি বিনিয়োগের গতিকেও বাধাগ্রস্ত করেছিল।
নতুন মুদ্রানীতিতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য নেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে বর্তমান সংকোচনমূলক অবস্থান থেকে সরে আসবে বলে আশা করা যায়। এতে নীতি সুদহার কমানো হতে পারে বলে জানা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশনা অনুসারে নীতি সুদহারে সামান্য সমন্বয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবশেষ মুদ্রানীতিতে বিনিময় হারের ওপর চাপ কমিয়ে রিজার্ভ ধরে রাখতে চেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং এক্ষেত্রে বেশ সফল হয়েছে সংস্থাটি। তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার পাশাপাশি রিজার্ভ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। যেহেতু মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, সেদিক বিবেচনায় সুদহার কমানো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ভালো এমন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ দেখা গেছে, যেমন সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমছে, ট্রেজারি বিলের সুদহারও কমে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান বাড়ানোর সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে।
বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির দিকেও জোর দিতে হবে। এরই মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে, যা আরো বাড়তে পারে বলে ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এতে দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হতে পারে। তাই খেলাপি ঋণের এ চাপ মোকাবেলায় মুদ্রানীতিতে কিছু ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদার, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত ও যথাযথভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যথাযথ পদক্ষেপ থাকা উচিত। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন প্রধান অর্থনীতিবিদ যোগদান করেছেন। আশা করা যায়, নতুন মুদ্রানীতিতে তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটবে নতুন মুদ্রানীতিতে।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক










