ঢাকার সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহনের আধিক্য। সড়কে চলাচলকারী বেশির ভাগ বাসের দরজা-জানালা নেই বা ভাঙা, ইন্ডিকেটর নষ্ট, বডির অংশ খুলে পড়ছে, আসন তেল চিটচিটে ইত্যাদি। বিভিন্ন সরকারের আমলে এসব লক্কড়-ঝক্কড় বাস অপসারণের জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে কোনো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখেনি। এর প্রধানতম কারণ গণপরিবহন মালিকদের দৌরাত্ম্য। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার কোনো বিকল্প আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন বাসা সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য সরকার বাস মালিকদের প্রথমে ছয় মাস বেঁধে দেয়া হয়। গত এপ্রিলে সে মেয়াদ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মালিকদের চাপে আবারো সেই সময় বর্ধিত করা হয়। ‍কিন্তু তাতেও কোনো সুফল মেলেনি। এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন হয়নি। একই সিদ্ধান্ত বিগত সরকারের আমলেও নেয়া হয়েছিল। সেসময়ও পরিবহন মালিকদের চাপে সরে আসতে বাধ্য হয় সরকার। মালিক এমন চাপ প্রয়োগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার বক্তব্যেও উঠে এসেছে। বণিক বার্তাকে তিনি জানিয়েছেন বেঁধে দেয়া মেয়াদ শেষে বাস অপসারণের অভিযানের উদ্যোগ নেয়া হলে মালিকদের পক্ষ থেকে বাধা দেয়া হয় এবং এ নিয়ে প্রতিনিয়ত হরতালের হুমকি দেয়া হচ্ছে। পরিবহন মালিকদের দাবি হলো, ঢাকাসহ সারা দেশে বাসের অর্থনৈতিক আয়ু ৩০ বছর নির্ধারণ করা হোক। এ দাবিসহ আরো কয়েকটি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ১২-১৫ আগস্ট পরিবহন ধর্মঘটের ডাকও দিয়েছেন। যদিও এর পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত এক সভা শেষে তারা হরতালের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, যেকোনো উদ্যোগ নেয়া হলে তাতে কোনো না কোনো পক্ষ আংশিক হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ নিয়মের বাইরে পরিবহন মালিকরাও নেই। তবে সরকার বরাবরই সে ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ারও আশ্বাস দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক ওই সভা শেষেও সাংবাদিকদের উদ্দেশে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে নতুন মোটরযান কেনার জন্য অর্থ উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা আসা প্রয়োজন, যাতে গণপরিবহন সেবা উন্নত করা যায়। তারা সহযোগিতা না করলে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে জিরো টলারেন্স নীতিতে যেতে হবে। এ পর্যন্ত নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণেই সরকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যে দেখা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে চলতি জুন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে ২০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৩২টি। মিনিবাস আছে ৬ হাজার ৪৭৮টি। এর মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ বাস এখন রাস্তায় চলে না। চলাচলকারী অধিকাংশ বাসের রুট পারমিট নেই।

পৃথিবীর উন্নত দেশের গণপরিবহনের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেগুলো বড়জোর ১৫-২০ বছরের পুরনো। একটি বাসের অর্থনৈতিক আয়ুও থাকে সাধারণত ১৫-২০ বছর। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ফিটনেস থাকা সাপেক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেও বাস চলতে পারে। কিন্তু দেশে এসব নিয়ম-নীতির কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। উন্নত দেশে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুচ্চালিত বাস চালু হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকাসহ প্রায় পুরো দেশেই চলেছে ফিটনেসবিহীন বাস। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে সারা দেশে ২০ বছরের পুরনো ১৮ হাজার ২০৫টি বাস ও মিনিবাস রয়েছে। আবার কেবল বাস বা মিনিবাস নয়, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলায় ২৫ বছরের পুরনো পণ্যবাহী (ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্যাংকলরি) মোটরযানের সংখ্যা ১৪ হাজার ৬৮৩। এর বাইরে সারা দেশে আরো ৩১ হাজার ৭৯৮টি পণ্যবাহী মোটরযান রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস ও ট্রাকের সংখ্যা ৭৫ হাজারের বেশি। ঢাকাসহ পুরো দেশের এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে চাইলে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা থাকা জরুরি।

মানহীন গণপরিবহন সেবার কারণে তিন ও দুই চাকার যানসহ ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকেছে জনগণ, বিশেষত ঢাকার বাসিন্দারা। চাহিদার কারণে এ শহরে এসব যানের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণে। বিচিত্র গাড়ি একই সড়কে চলাচল করায় বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। কোনো যানবাহনকে সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির আওতায় আনা যায়নি। ফলে বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। সিংহভাগ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের ফিটনেস ঠিক থাকে না। ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পার্টস দুর্বল থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারান চালক। ব্যস্ত সড়কে এসব দুর্ঘটনা ঘটলে তীব্র হয়ে ওঠে যানজট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে প্রতিদিন যত সড়ক দুর্ঘটনা হয়, তার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী আনফিট মোটরযান। যদিও দেশের প্রচলিত আইনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু সে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নেই এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও নজির নেই।

বিআরটিএ মূলত যেকোনো পরিবহনের ফিটনেস সনদ ইস্যু করে। এ সনদ ইস্যু করার আগে যানবাহনের এক্সেল লোড, টায়ারের বিড, স্পিড, ব্রেক, ধোঁয়া নির্গমন, হেডলাইট, অ্যালাইনমেন্ট, রঙ, আসনসহ ইঞ্জিন ও বডির বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সবকিছু ঠিক থাকলে তবেই সড়কে চলার অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু একদিকে দেশে সঠিকভাবে ফিটনেস পরীক্ষা না হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অনেক যানবাহনের সনদই নেই, কিংবা থাকলেও সেটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। সুতরাং অনুন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থার পেছনে মালিকদের যেমন দায় রয়েছে, তেমনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থারও দায়িত্বপালনের ব্যর্থতা রয়েছে। তাই মালিকদের দৌরাত্ম্যের লাগাম টানার পাশাপাশি তাদেরও আরো দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।