দেশের মোট ফসলি জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ জুড়ে ধান চাষ বিস্তৃত, যা আমাদের কৃষি কর্মকাণ্ডের প্রধান মেরুদণ্ড। বর্তমানে বোরো, আমন ও আউশ—এ তিন মৌসুমে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩৬-৪০ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করছে। এ উৎপাদনের সিংহভাগই (৫০ শতাংশের বেশি) আসে বোরো মৌসুম থেকে; যার পরেই রয়েছে বৃষ্টিনির্ভর আমন এবং আউশ। শস্যের নিবিড়তায় (প্রায় ২১৬ শতাংশ) বাংলাদেশ আজ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়, যা আমাদের সীমিত ভূমি থেকে সর্বোচ্চ ফলন আহরণের এক অনন্য ও বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত।
এ অভাবনীয় সাফল্যের মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে একটি উদ্বেগজনক চিত্র। নিবিড় চাষাবাদের এ ধারা অব্যাহত রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ আজ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিশ্বের প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। বর্তমানে দেশের কৃষি ব্যবস্থা আমদানীকৃত রাসায়নিক সারের ওপর প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল, যার পেছনে সরকারকে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি সেচ, নিবিড় চাষাবাদ এবং রাসায়নিকের এ লাগামহীন ব্যবহার আমাদের মাটির জীবনীশক্তি ও উপকারী অণুজীবের ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
২০৫০ সালে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষির এ বর্তমান ধারা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার, পরিবেশ রক্ষা ও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে ধান গবেষণায় একটি মৌলিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আজ কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এক অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। এ সম্পাদকীয়তে আমি তুলে ধরব কীভাবে অত্যাধুনিক বিজ্ঞান বা ফ্রন্টিয়ার সায়েন্স ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ চালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারে।
২০৫০ সালের সংকট: খাদ্যনিরাপত্তায় ধান গবেষণার নবদিগন্ত
কয়েক দশকে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেও ‘সবুজ বিপ্লবের’ সেই অর্জন এখন স্থবিরতার মুখে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম তীব্রতা—এ দ্বিমুখী সংকটে আমাদের শস্যভাণ্ডার আজ অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জে লিপ্ত।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ট্রেন্ডস ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স’-এর তথ্যমতে, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা ধান ও প্রধান দানাদার ফসলের ফলন এবং পুষ্টিগুণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এ ক্ষিপ্র পরিবর্তনের বিপরীতে প্রচলিত ১০-১২ বছর মেয়াদি দীর্ঘসূত্রতার প্রজনন পদ্ধতি এখন অকার্যকর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অসংখ্য জাত উদ্ভাবন করলেও তার অধিকাংশই ‘ব্রি ধান ২৮’ বা ‘ব্রি ধান ২৯’-এর মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। তাই ফলনের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করতে প্রচলিত পদ্ধতির আমূল সংস্কার বর্তমানে সময়ের দাবি।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অথচ নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবাদি জমি প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে সংকুচিত হচ্ছে। এ ত্রিমুখী সংকট মোকাবেলায় আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা এক বড় অন্তরায়। কেবল বিদ্যমান প্রবৃদ্ধির ধারা দিয়ে ভবিষ্যতের বিশাল খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এ বিপর্যয় এড়াতে আমাদের বিচ্ছিন্ন গবেষণা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে জিনোম এডিটিং, সয়েল মাইক্রোবায়োম এবং জলবায়ু সহনশীল ‘স্মার্ট’ ফসলের মতো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিতে নজর দিতে হবে। গবেষণার এ বিচ্ছিন্নতা দূর করে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ধান গবেষণা ও উন্নয়ন’ রূপরেখা বাস্তবায়নই এখন একমাত্র পথ।
জলবায়ুজনিত সীমাবদ্ধতা: প্রথাগত কৃষি পদ্ধতির কার্যকারিতা হ্রাসের প্রকৃত চিত্র
দেশের বিদ্যমান উচ্চফলনশীল ধানের জাতগুলো তাদের শারীরবৃত্তীয় সহনশীলতার চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষ করে ধানের ফুল ফোটার স্পর্শকাতর সময়ে আকস্মিক তাপপ্রবাহ পরাগরেণুকে বন্ধ্যা করে দিচ্ছে এবং শস্যদানা পুষ্ট হওয়ার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আজ এক ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি উদ্ভিদের শ্বসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে সঞ্চিত শক্তি কমিয়ে দেয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের ওজন ও পুষ্টিমানের ওপর। বাংলাদেশের প্রায় সব প্রচলিত উচ্চফলনশীল জাতই এমন তীব্র তাপপ্রবাহের প্রতি চরম সংবেদনশীল। ধানের ফুল ফোটার পরবর্তী উচ্চ তাপপ্রবাহের ফলে এপ্রিলে ধানের শীষ দানাহীন ও সাদা বর্ণ ধারণ করে (হিট শক), যা অনেক ক্ষেত্রে ফলন শতভাগ পর্যন্ত কমাতে পারে।
এ বাস্তবতায় আমরা যদি কেবল প্রথাগত ধীরগতির প্রজনন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে থাকি, তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ফলনের যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ২০৫০ সালের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে হলে ধানের ফলন বৃদ্ধির হার বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়ানো অপরিহার্য। সরকারের নীতিগত দলিল ‘ট্রান্সফর্মিং এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’-এ সঠিকভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে যে আগামীর জটিল সমস্যাগুলো ‘গতকালের হাতিয়ার’ বা মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।
নকশাভিত্তিক নির্ভুল ইঞ্জিনিয়ারিং: আধুনিক ধান গবেষণার ভবিষ্যৎ
বর্তমান সংকটের টেকসই সমাধানে আমাদের ‘নির্বাচনভিত্তিক’ প্রজনন থেকে ‘নকশাভিত্তিক’ নির্ভুল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিকে ধাবিত হওয়া অপরিহার্য। এখানেই জিনোম এডিটিং, বিশেষ করে ক্রিসপার-ক্যাস প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। প্রথাগত প্রজননে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য পেতে এক দশকের বেশি সময় লাগলেও জিনোম এডিটিং বিজ্ঞানীদের উদ্ভিদের ডিএনএতে অত্যন্ত নিখুঁত পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়। এখন আমরা নির্দিষ্ট জিনকে লক্ষ্য করে ধানের ছড়ার গঠন পরিবর্তন করতে পারি, যাতে প্রতি ছড়ায় দানার সংখ্যা বাড়ে। এমনকি উদ্ভিদের অভ্যন্তরীণ ‘সার্কাডিয়ান ক্লক’ বা জৈবিক ঘড়ি বিন্যাসের মাধ্যমে ধান গাছকে দিনের তুলনামূলক শীতল সময়ে ফুল ফোটাতে সক্ষম করা সম্ভব, যা মারাত্মক তাপপ্রবাহ থেকে ফসলকে রক্ষা করবে।
এটি কেবল ফলন বাড়ানো নয়, বরং ফসলের গুণমান ও পুষ্টি রক্ষার লড়াই। পিআইএফ (ফাইটোক্রোম ইন্টারঅ্যাক্টিং ফ্যাক্টর), পিআরআর (সিউডো-রেসপন্স রেগুলেটর), ইএলএফ (আর্লি ফ্লাওয়ারিং) এবং সিওয়ের (কনস্ট্যান্স) মতো কেন্দ্রীয় ঘড়ি নিয়ন্ত্রক (সেন্ট্রাল ক্লক রেগুলেটরস) জিনগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় উদ্ভিদের ফুল ফোটার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে তাপপ্রবাহের মধ্যে পুষ্পমঞ্জুরির গঠন এবং শস্যের গুণমান বজায় রাখতে এসপিএল১৪, জিআইএফ১, ভিআইএন৩ এবং ডিইপি১-এর মতো জিনগুলো প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এছাড়া তাপীয় চাপের প্রভাব প্রশমিত করতে এবং বীজের পুষ্টিকরণ ও গুণমান নিয়ন্ত্রণে আইএনভি এবং এনএফ-ওয়াই কমপ্লেক্সের মতো জিনগুলো শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তবে জলবায়ু সহনশীল ফসলের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরিতে পুষ্পবিন্যাসের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। দিন বা রাতের তাপজনিত ধকল কীভাবে পুষ্পবিন্যাসের বিভিন্ন অংশে স্টার্চ মেটাবলিক এনজাইমের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে এবং ভাসকুলার আর্কিটেকচারের মাধ্যমে পরাগায়নের সময়কে কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিরূপণ করা জরুরি। তাপজনিত ধকলের অধীনে পুষ্পবিন্যাসের গঠন ও হেডিংয়ের সময়কাল নিয়ন্ত্রণকারী সুনির্দিষ্ট কিউটিএল বা জিনগুলোর ভূমিকা শনাক্ত করা এখন সময়ের দাবি। এ গবেষণার ঘাটতিগুলো পূরণ করা গেলে রাতের উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব মোকাবেলা করে জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
‘স্মার্ট’ ধানের জাত উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ
২০৫০ সালের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে ‘স্মার্ট রাইস’ উদ্ভাবন, যা কেবল উচ্চফলনশীলই হবে না, বরং জলবায়ু-অভিযোজনক্ষম ও প্রতিকূলতা সহনশীল হিসেবে গড়ে উঠবে। এ চ্যালেঞ্জের শিকড় মূলত আমাদের মৃত্তিকার ক্রমক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্যের গভীরে নিহিত। গত কয়েক দশকের নিবিড় চাষাবাদ ও রাসায়নিকের অত্যধিক ব্যবহারে মাটির যে গুণগত অবনতি ঘটেছে, তা মোকাবেলায় আগামী দিনের জাতগুলোকে পুষ্টি আহরণে অত্যন্ত দক্ষ হতে হবে, যাতে পুষ্টিহীন মাটিতেও স্বল্প সারে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি মাটির অম্লতা, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও উপকূলীয় লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা হবে এ ‘স্মার্ট’ জাতগুলোর অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে ধানের এ নতুন জাতগুলোয় মাটির গভীর থেকে পানি ও খনিজ উপাদান সংগ্রহের জন্য থাকবে এক বিশেষ মূল বা শিকড় কাঠামো। সেই সঙ্গে এতে যুক্ত হবে কৃত্রিমভাবে বিন্যস্ত অণুজীব সহাবস্থান, যা কার্যকরভাবে পুষ্টি আহরণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ ও তা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্ভিদের পুষ্টিচক্রকে শক্তিশালী করবে।
এ বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি, যেখানে ভূস্থানিক মডেলিং ব্যবহারের মাধ্যমে দিন ও রাতের উচ্চ তাপমাত্রার (এইচডিটি ও এইচএনটি) হটস্পটগুলো শনাক্ত করে তাপজনিত ধকল এড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে নিখুঁত প্রজনন ও জিনোম এডিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্যকর জিনের উন্নত অ্যালিল শনাক্ত করে সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং স্পিড-ব্রিডিং প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুততম সময়ে উন্নত পুষ্পবিন্যাস ও কার্যকর দানা গঠন সম্পন্ন পরবর্তী প্রজন্মের জাত অবমুক্ত করা সম্ভব হবে। খাদ্য ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং উচ্চ গুণমানসম্পন্ন জলবায়ু সহনশীল ফসলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এ আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বয়ে আনবে।
খাদ্যনিরাপত্তার জাতীয় পথরেখা
বাংলাদেশে ধান গবেষণায় ‘প্যারাডাইম শিফট’ নিশ্চিত করতে সমন্বিত কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। সরকারের সাম্প্রতিক ‘এসওপি’ অনুমোদন জিনোম-এডিটেড অট্রান্সজেনিক ফসলের উদ্ভাবন ও অবমুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। এ আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিজিইসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় জিনোম এডিটিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ুসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের অর্থায়ন আমাদের দেশীয় সক্ষমতারই প্রতিফলন। তবে এ গবেষণাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রি ও বিনার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের জিনোমিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা অপরিহার্য। ল্যাব ও মাঠের পরীক্ষার সমন্বয় নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি বীজ শিল্প ও বায়োটেক কোম্পানিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাটির টেকসই ব্যবহারে ‘মাইক্রোবায়োম ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবং সারের সাশ্রয়ী ব্যবহারে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ জরুরি। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে ‘ডিজাইনার প্ল্যান্ট’ তৈরির মতো ফ্রন্টিয়ার সায়েন্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মেধা পাচার রোধে গাজীপুরের মতো কৃষি হাবগুলোয় ‘সিলিকন ভ্যালি’ সদৃশ উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরি করে তরুণ বিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে পারলেই ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
২০৫০ সাল কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক রূঢ় বাস্তবতা, যেখানে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সনাতন পদ্ধতির ধীরগতির ওপর নির্ভর করে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি না নিয়ে, আধুনিক বিজ্ঞানকে আলিঙ্গন করে আমাদের খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নকশা করা এখন সময়ের দাবি। এ রূপান্তর কেবল বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন নয়, বরং একটি অপরিহার্য জাতীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্য অর্জনে জিনোম এডিটিংয়ের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তিকে গবেষণার মূলধারায় যুক্ত করতে হবে, যেখানে ‘বিগ ডেটা’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবেশের উপযোগী ‘ডিজাইনার প্ল্যান্ট’ তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হবে। এজন্য উদ্ভিদ প্রজননবিদ, মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ও ডেটা বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি ‘আন্তঃডিসিপ্লিনারি’ বা বহুমুখী গবেষণা কাঠামো এবং ‘স্মার্ট রাইস’ প্রযুক্তিতে কৌশলগত বিনিয়োগই নিশ্চিত করতে পারে ২০৫০ সালের খাদ্যনিরাপত্তা। আমাদের ‘আউটলুক ২০৫০’ হোক একটি রূপান্তরের অভিযাত্রা, যেখানে বৈশ্বিক হুমকিগুলোকে আমরা সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করব—এ সাহসী পদক্ষেপই হবে আগামীর নিরাপদ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।
ড. তোফাজ্জল ইসলাম: ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ; প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়










