উন্নততর কর্মসংস্থান ও জীবিকার খোঁজে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গেছেন। এছাড়া দিন দিন বিদেশে পাড়ি দিতে আগ্রহীর সংখ্যাও বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব। বিএমইটির আরেকটি পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২৩ সালে কাজের প্রত্যাশায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৫০ বাংলাদেশী দেশ ছাড়ছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশগামী বা বিদেশ যেতে ইচ্ছুক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বৈদেশিক শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর নামে দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা শ্রমবাজার নিয়ে সিন্ডিকেট ও তাদের দৌরাত্ম্যও বেড়েছে। এদের মাধ্যমে মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যার শিকার হচ্ছেন কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষ। আর মানব পাচারের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা যে কম নয় সেটি বোঝা যায় এ-সংক্রান্ত মামলাগুলো লক্ষ করলে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে মোট ৪ হাজার ৫৪৬টি। এতে আসামি করা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮০ জনকে। এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাজা হয় ১৫৭ জনের। এর মধ্যে ২৪ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩৩ জনকে দেয়া হয়েছে অন্যান্য মেয়াদে সাজা। যদিও অনেকের বিরুদ্ধে এসব মামলায় গুরুতর অভিযোগ ছিল। কিন্তু সে অনুপাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো নজির নেই। ১ শতাংশেরও কম বিচারের আওতায় এসেছেন। বরং গত ছয় বছরে মানব পাচারের মামলায় খালাস পেয়েছে প্রায় ৩ হাজারের অধিক। সবচেয়ে বেশি আসামি খালাস পেয়েছে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে।
আবার সম্প্রতি বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভিবাসন বিষয়ক জাতিসংঘ নেটওয়ার্ক (বিডিইউএনএনএম) একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কেবল গত বছর মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে মামলা দায়ের করা হয়েছে ৪ হাজার ২৯১টি; নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৬৬২টি মামলা। নিষ্পত্তিকৃত মামলায় কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে ৮৮টিতে এবং ৩৮টিতে জরিমানাসহ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পাঁচজন অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে।
এসব পরিসংখ্যান যেমন মানব পাচারের ব্যাপকতাকে তুলে ধরে, তেমনি এটাও স্পষ্ট করে যে মানব পাচার নিয়ে বিগত সময়ে বিপুলসংখ্যক মামলা হলেও সেগুলোর বিপরীতে সাজাপ্রাপ্তির হার নগণ্য। বরং খালাস পেয়ে যাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। একদিকে আইনের শাসন নেই, অন্যদিকে এমন বিচারহীনতার কারণে মানব পাচারের মতো অপরাধ বেড়েই চলেছে বলে অভিমত অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের। এতে অভিবাসন খাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের কারণে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশ। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপ বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে প্রায় এক বছর। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মানব পাচার রোধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও এ-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত কিন্তু যথাযথভাবে নিষ্পত্তি আবশ্যক।
গত বছর মানব পাচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালের তুলনায় সামগ্রিকভাবে ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৩ সালের মতোই দ্বিতীয় ধাপেই (টিয়ার-২) রয়ে গেছে। মানব পাচার নির্মূলে যেসব দেশ ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি। সুতরাং মানব পাচার নির্মূলে বাংলাদেশের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার আরো অবকাশ রয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি মানব পাচার আইনকে আরো যুগোপযোগী করে শক্তিশালী করা, যাতে মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেয়া যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে কেবল মিডলম্যানদের সাজা হয়। মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
মানব পাচারের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়েই ২০১২ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান করা হয়। বর্তমানে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। আজকাল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই পাচারকারী ও তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়। সামান্য মুঠোফোনের কল আর বিকাশের ট্রান্সফার ট্র্যাক করেও এসব করা সম্ভব এবং সে প্রযুক্তি স্থানীয় পুলিশের কাছে রয়েছে। এর বাইরে সরকার চাইলে মোবাইল অপারেটর ও মোবাইল মানি ট্রান্সফারিং কোম্পানিগুলোকে বিগ ডাটা থেকে তথ্য দিতে বাধ্য করতে পারে। মূলত আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতে সরকারকে কাজ করতে হবে। নজরদারি জোরদার করতে হবে। নয়তো মানব পাচার রোধ করা সম্ভব হবে না, এমনকি নিয়ন্ত্রণেও আনা যাবে না।
পাশাপাশি দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। মানব পাচার মামলায় ৯০ দিনে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ধীরগতির তদন্তের কারণে নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। শক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তিতে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। কেননা দুর্বল তথ্য-প্রমাণের কারণে অনেকেই খালাস পেয়ে যান। মানব পাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়ে জাতিসংঘের মানব পাচার প্রটোকল ২০০০-এ নির্দেশনাও রয়েছে। এ প্রটোকল অনুযায়ী, পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। যেসব মামলা চলমান রয়েছে, সেখানে শক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে সক্রিয় হতে হবে। যতক্ষণ না অপরাধীদের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ততক্ষণ পাচার একটি কম ঝুঁকির ও উচ্চ লাভের কাজ হিসেবেই বিদ্যমান থাকবে। সুতরাং অবশ্যই এর পরিবর্তন দরকার। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কার্যক্রমগুলোকে ভুক্তভোগী-সহায়ক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নারী-পুরুষ বা তরুণ-বয়স্ক সব ভুক্তভোগী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা পায়। এর অর্থ হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রচেষ্টার সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সেবা জোরদার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং মানসিক, সামাজিক, আইনি ও পুনর্বাসন সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। আর এসবের মাধ্যমে মূলত দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি ও সিন্ডিকেটের অপকর্মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।










