নাগরিকরা প্রতিদিন কোথায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবেন, শিশু-কিশোররা অবসরে কোথায় খেলবে কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠরা কোথায় একটু রোদ পোহাবেন—এসব বিষয় নগরের বাসযোগ্যতা নিশ্চিতে অপরিহার্য। এজন্য যেকোনো নগরেই সবুজ উন্মুক্ত স্থান যেমন পার্ক বা খেলার মাঠের সুষম বণ্টন জরুরি। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে এটি যেন শুধু উপলব্ধি। মেগাসিটি ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ‘বাসযোগ্যতা বঞ্চিত’ নগরী। দশকের পর দশক নীতিগত অবহেলা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদাসীনতার ফলে ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দেয়া যাচ্ছে না।
ঢাকার বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তির চাহিদা যে এখনো প্রান্তিক সে চিত্র মিলেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটিতে রমনা পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার যে তথ্য মিলেছে তা ইতিবাচক। একই সঙ্গে এটি এক ধরনের বৈষম্যের দিকেও ইঙ্গিত করছে। দুই সিটি করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো নগরে কাগজে-কলমে ৬৩-৬৫টি পার্ক রয়েছে। গোটা নগরীর উন্মুক্ত স্থান প্রায় ৪ শতাংশ। অথচ জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বলে, আদর্শ নগরে মোট জমির কমপক্ষে ২৫ শতাংশ সবুজ থাকা চাই। ঢাকার বাস্তবতা এ মানদণ্ড থেকে এতটাই দূরে যে সংখ্যাগুলো পড়তে গেলে হোঁচট খেতে হয়। কাগজে-কলমে যেসব পার্ক আছে সেগুলোর অধিকাংশ দখলদারত্ব, ময়লা-আবর্জনা ফেলার কেন্দ্র বলে অভিযোগ রয়েছে। নাগরিক প্রবেশযোগ্যতা ও নান্দনিকতার নিরিখে কিছু পার্ক থাকলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা দুর্বল। এসব সংকট সমাধানের রূপরেখা যে কঠিন নয় তা রমনার ব্যবস্থাপনা থেকে স্পষ্ট। পার্কটির তুলনামূলক পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা প্রমাণ করে, সম্পদের অভাবে দেশে ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হয় না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা থাকলে পরিবেশ সংবেদনশীল কার্যক্রম সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব। এ বিষয়টিকে স্বীকার করে সমাধানের রূপকল্প দেয়ার কাজটি তাই করতে হবে।
গবেষণাপত্রের তথ্য বলছে, ঢাকায় মাথাপিছু সবুজ স্থানের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় ২০ গুণেরও কম। বিস্তৃত আবাসিক এলাকায় উন্মুক্ত সবুজ স্থান মোট জমির মাত্র ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সবুজায়নের ক্ষেত্রে নগরীর পার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ভূমি সংকট এবং জনসংখ্যার নিরিখে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পার্কের সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কিন্তু যে পার্কগুলো রয়েছে সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন ও নাগরিকদের চাহিদা পূরণের মতো করে গড়ে তোলার কাজ করা কঠিন নয়। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে উদাহরণও আছে। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি হংকংও প্রতি হাজার মানুষের জন্য গড়ে শূন্য দশমিক ৭১ একর সবুজ স্থান বরাদ্দ রাখে। এগুলো পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হয়ে উঠছে। বিশ্বের বায়ুদূষিত নগরীর একটি ঢাকা। শহরের বায়ুতে ধূলিকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার চেয়ে প্রায় ১৪-১৫ গুণ বেশি। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ দূষণের ফলে দেশের মানুষের আয়ুষ্কাল গড়ে ৬ দশমিক ৮ বছর কমছে। বেশকিছু পরিবেশবাদী সংস্থার তথ্য, বিগত কয়েক দশকে মানবসৃষ্ট কারণে ঢাকার তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ চক্রের বিরুদ্ধে সবুজ এলাকা প্রাকৃতিক প্রতিরোধক। আদর্শ সবুজ পার্ক অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধূলিকণা শোষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব কমায়। এছাড়া নিয়মিত সবুজ পার্ক বা উন্মুক্ত স্থান শিশুদের মনোজগতের বিকাশ ঘটায়, বয়স্কদের শরীর ও মনের সুস্থতা নিশ্চিত করে। কিন্তু কোটি মানুষের এ শহরে যখন সবুজ জায়গার এমন দুর্ভিক্ষ, তখন শিশুরা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আশ্রয় নিচ্ছে এবং বৃদ্ধরা ঘরবন্দি হয়ে পড়ছেন। দখল বা অব্যবস্থাপনায় পার্ক হারানোয় সমাজের সংযোগসূত্র ছিঁড়ে পড়ছে।
ঢাকায় উন্মুক্ত স্থানের সংকোচন সমস্যাকে উপলব্ধিতে সীমাবদ্ধ না রেখে পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানকে আইনি সুরক্ষায় আনতে হবে। ভবন নির্মাণ বিধিমালায় নির্দিষ্ট আয়তনের আবাসিক প্রকল্পে বাধ্যতামূলক সবুজ স্থান ও খেলার মাঠের বিধান সংযুক্ত করা জরুরি। এমনকি এ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি। বর্তমান ড্যাপে প্রস্তাবিত উন্মুক্ত স্থানের নিম্নমান পুনর্বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের কাছাকাছি নিয়ে আসার কাজ শুরু করতে হবে। রাজধানীর কিছু বড় পার্ক দখল হয়েছে এবং কিছু পার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুন্নত। ব্যবস্থাপনাগত সংকট সমাধানে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করে একটি কেন্দ্রীয় পার্ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বৃহত্তর আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের বাইরে এনে কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নে সক্ষম করে তুলতে হবে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কার্যকলাপের তথ্য সামনে আসা উচিত।
ঢাকার ভূমি সংকট বাস্তবতা বিবেচনা করেই কমিউনিটিভিত্তিক পার্ক ব্যবস্থাপনার মডেল চালু করতে হবে। সিঙ্গাপুর, সিউল বা কুয়ালালামপুরের মতো শহরে স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো পার্ক রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের অংশীদার। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নেতৃত্বে বিভিন্ন মহল্লার সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় এ মডেল কার্যকর করা যেতে পারে। খালি জমি ও অব্যবহৃত সরকারি স্থানকে ছোট ছোট"পকেট পার্কে রূপ দেয়া যায়। এক্ষেত্রে ব্যাংককের ১৫ মিনিট পার্ক একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। সড়কের পাশের ফুটপাত ও মধ্যবর্তী বিভাজক (আইল্যান্ড) সবুজায়নে জোর দিতে হবে। ছাদ বাগান প্রসারে কর প্রণোদনা দিতে হবে। ছাদ বাগানকে একটি নির্মল বিনোদন ও স্বস্তিদায়ক কার্যক্রম হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করার জন্য নিয়মিত প্রচারণা চালানো জরুরি। বেসরকারি আবাসন প্রকল্পকে সবুজ আচ্ছাদনের বিপরীতে কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পার্ক ও খেলার মাঠ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। খেলার মাঠের নান্দনিকতা বাড়াতে গেলে অনেক সময় মাঠের আয়তন সংকুচিত হতে পারে। সেজন্য খেলার মাঠের আশপাশে ভার্টিক্যাল ফরেস্ট্রির পরিকল্পনা বিবেচনায় রাখা যায়। রমনার জন্য যে মানের যত্ন নিশ্চিত করা হচ্ছে, একইভাবে শহরের অন্যান্য পার্কের ক্ষেত্রেও নীতিসিদ্ধান্ত নিতে হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে আগে সবার নিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে হবে। এটি শুধু নগর পরিকল্পনার দাবি নয়, এটি নাগরিক ন্যায়বিচারের দাবি।










