ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা। ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নবম গভর্নর। এর আগে তিনি ছিলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের (বার্ড) মহাপরিচালক। এছাড়া তিনি যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে সিরডাপ, এডিবি, এসক্যাপ, এফএও, আইএলও, ইউএনডিপি, ইউনেস্কো ও বিশ্বব্যাংক। বণিক বার্তা থেকে প্রকাশিত ‘গভর্নরের স্মৃতিকথা’ বইয়ের জন্য এ বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম ও হাছান আদনান

গত ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হয়েছে, অনেক বিকশিত হয়েছে; একই সঙ্গে সেখানে আমাদের অনেক নীতিগত দুর্বলতাও রয়েছে, ডাটা নিয়ে সমস্যা আছে। সব মিলিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী গত পাঁচ দশকে আমাদের অর্থনীতির সবলতা-দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়ে যদি বলতেন।

বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব নব্বইয়ের আগ পর্যন্ত স্থিতিশীল সরকার ছিল না, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের সরকার এসেছে। স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধু অর্থনীতিকে সংহত করার বিভিন্ন চেষ্টা করলেও সঠিক নীতিনির্ধারণের অভাবে ও কৌশল পরিকল্পনায় ব্যর্থতার কারণে সফল হতে পারেননি। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন আইডিয়ালিস্ট; পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরোধিতা করে চেয়েছিলেন নতুন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চলবে। আবার দু-একজন দারিদ্র্য বিমোচন, পুঁজিবাদের বিকাশ নিয়ে চিন্তা করতেন। কিন্তু দুই ঘরানার ব্যতিক্রমী মতাদর্শের সমন্বয়ে শক্তিশালী কোনো চিন্তা দাঁড় করা যায়নি।

আরেকটি ব্যাপার হলো সেই সময়ে ব্যাংক, জুট মিল, টেক্সটাইল ইত্যাদি জাতীয়করণ করা হলো। আর সেই সময়ে আমলারা যে খুব প্রস্তুত ছিলেন, সেটাও নয়। আমলাদের মধ্যে অনেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের অংশ ছিলেন, আবার অনেক প্রাদেশিক আমলা ছিলেন। তারা সবাই পরিচিত ছিল পাকিস্তানের পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে। যখন বাংলাদেশ সরকার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ল তখন সেটা তারা আর ভালোভাবে নিতে পারছিলেন না। দক্ষতার অভাবে এতগুলো ব্যাংক, টেক্সটাইল কারখানা চালানোর মতো যোগ্য লোক ছিল না, ফলে যত্রতত্র অব্যবস্থাপনা দেখা দিল। এমনিতেই দেশ অবকাঠামোগতভাবে খারাপ অবস্থায় ছিল, রাস্তাঘাটের ভগ্নদশা। তার ওপর সমাজতন্ত্রে ঝোঁকার ফলে নানা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নষ্ট হতে থাকল। ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রেগুলেটরি বডি অনেকটা অকেজো হয়ে যায়। আমলাদের নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ায় আমলাতন্ত্রও দুর্বল হয়ে যায়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের যারা চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতেন তারা বেশির ভাগই রাজনৈতিক বিবেচনায় হতেন। এভাবে আমলাতন্ত্রের মান খারাপ হতে থাকে। পরের দিকে অবশ্য সেটা কাটানোর চেষ্টা করা হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে পরপর সেনাবাহিনীর কয়েকটি ক্যু, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব আমাদের আরো বিপদে ফেলে। স্বাধীনতার অল্প সময়ের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ তখন অনেকটা নেতৃত্বহীন ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশের বাইরে ছিলেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও যে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়ার কথা ছিল, তাদের মধ্যে তা পাওয়া যায়নি। এ রকম একটা প্রতিকূল পরিবেশে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি দেশের উন্নয়নের স্বার্থে বেশকিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে জনমানসে প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে আসেন। তিনি বিআইডব্লিউটিএর মতো প্রতিষ্ঠানকে বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় রাজধানীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করেন। কিন্তু সেগুলো যে খুব সফল হয়েছে তা নয়, কারণ সংশ্লিষ্টরা সহযোগিতা করেনি। সেই সময়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের কিছু গতি অর্জিত হয়।

নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশের যাত্রা কেমন ছিল?

এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার হাত ধরে বেশকিছু সংস্কার শুরু হয়। তারপর বিএনপি সরকার প্রথম দিককার সময় অনেক কিছু শুরু করেছিল। তবে বিএনপি সরকারের একটা সমস্যা ছিল, দুর্নীতি খুব একটা নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আমলাতন্ত্র থেকেও বাধার মুখোমুখি হচ্ছিল। অনেক আমলাই ডানপন্থী একটি দলের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। এর মধ্যেও বেশকিছু খাতে বিএনপি সরকার সাফল্য দেখায়। কৃষি উৎপাদন, পশুপালন, মৎস্য চাষ বাড়ল। আর্থিক নীতির উন্নয়ন ঘটল, এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও ছিল না। ব্যাংক খাতেও অগ্রগতি হলো, বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করা হলো। নতুন করে দু-একটা ব্যাংকও প্রতিষ্ঠিত হলো।

এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ এল। আওয়ামী লীগের ওই মেয়াদে আমি বলব মোটামুটি চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ছিল। তখন প্রধানমন্ত্রীর অনেক ক্ষমতা থাকলেও তিনি এতটা প্রয়োগ করতেন না। আবার জাতীয় সংসদও মোটামুটি কার্যকর ছিল। তারপর ২০০১ সালে আবার বিএনপি আসে। জনমনে দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারি নানা সেবাপ্রাপ্তি নিয়ে অসন্তোষ ছিল। মূলত দুর্নীতির ফলে যতটুকু উন্নতি হওয়ার কথা ছিল ততটুকু হয়নি। তারপর মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক নানা সংকটের জেরে এল এক-এগারো সরকার। তারা শুরুতে বেশ সম্ভাবনা জাগালেও একপর্যায়ে মূলত ব্যস্ত ছিল কাকে আটক করবে, কাকে শাস্তি দেবে, কাকে জরিমানা করবে এসবের ওপর। অর্থনীতি নিয়ে তাদের মনোযোগ সরে যায়।

এক-এগারো সরকারের সময় আপনি গভর্নর ছিলেন। সেখানে ওই সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে আপনাকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল?

না, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে একটা সুবিধা ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিজেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ছিলেন। তিনি জানতেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়গুলো। তবে ওনাদের ক্ষমতাটাও সীমিত ছিল। মূলত সেনাবাহিনীর হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। সেনাবাহিনী ব্যাংক খাতে তেমন বেশি হস্তক্ষেপ করত না। তবে মাঝেমধ্যে ডিজিএফআই অফিসে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো এমডিদের। অনেক শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের ডেকে ধমকিয়ে বা ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায় করা হতো। এর কিছু কিছু আবার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করা হতো। এর বাইরে তেমন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতো না। আমি যেহেতু শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিলাম, তাই আর্মির লোকজন আমাকে তেমন প্রভাবিত করত না। আমি এমন বার্তা দিয়েছিলাম, আপনারা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হস্তক্ষেপ করেন তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব সামলে নিতে পারলেও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব সামাল দিতে পারবেন না। তাই তারা আমার কাজে তেমন হস্তক্ষেপ করেননি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাপ প্রয়োগ না করার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল। ওদের মূল ফোকাস আসলে পলিসি ছিল না, ছিল রাজনীতি। দেশের প্রধান দুই নেত্রীকে আটক করে কারাগারে পাঠাল, দুই দলের বড় বড় নেতাকেও কারাগারে পাঠাল।

২০০৭-০৮-এর সময় বিশ্ব মন্দা চলছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কীভাবে মূল্যস্ফীতি, বাজার ও অন্য বিষয়গুলো দেখাশোনা করছিলেন?

এখানে একটি বিষয় হলো, ২০০৭-০৮-এর বিশ্ব মন্দাকে আমরা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলাম। সেজন্য ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য খাত কীভাবে তদারকি করা হবে তা নিয়ে পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেছি। আরেকটা বড় সুবিধা ছিল, আর্মির ভয়ে হোক বা অন্য কারণে হোক কমপ্লায়েন্সটা মেনে চলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ছোট-বড় সব ব্যাংকেই ক্রেডিট ফ্লো কখনো বন্ধ হয়নি। রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল থাকায় সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের তো কোনো সমস্যা ছিল না। কিছু কিছু শিল্পে একটু প্রভাব পড়েছিল। তৈরি পোশাক বা আরএমজি ও হিমায়িত খাদ্যের মতো কিছু রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে যেহেতু আমাদের আরএমজি পণ্যের দাম কম ছিল তাই বিশ্ব মন্দা থাকলেও ক্রয়াদেশ বাতিল তেমনটা হয়নি। সব মিলিয়ে কিছুটা মন্দা থাকলেও তখন বড় আকারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হইনি আমরা।

আপনি যখন গভর্নর ছিলেন তখন কতগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক ছিল। আপনারা কি তখন সবল ও দুর্বল ব্যাংকের ক্যাটাগরি করতেন? আপনার মেয়াদকালে কতগুলো ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছিলেন?

সবল ব্যাংক, দুর্বল ব্যাংক—এ রকম ক্যাটাগরাইজেশন বা শ্রেণীবিভাগ ছিল না। খুব সম্ভবত ৩২টা ব্যাংক ছিল এবং আমার মেয়াদকালে নতুন কোনো ব্যাংক চালু হয়নি। এখন তো দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬২। আমরা তখন নতুন ব্যাংক কিংবা ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও চালু করিনি। আরেকটি কথা বলতে হবে, সে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা যথেষ্ট দক্ষ, পেশাদার ও সৎ ছিলেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কৃতি ও দক্ষতায় ভাটা পড়েছে। আর ব্যাংকগুলোর এমডিরাও তখন মোটামুটি পেশাদার ছিলেন, পরে যারা আসছেন তাদের ব্যাপারে তো আমরা জানিই।

আপনি তিনজন অর্থমন্ত্রীর (এর মধ্যে একজন অর্থ উপদেষ্টা) সঙ্গে কাজ করেছেন—এম সাইফুর রহমান, এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাদের সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন কী?

এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে তো দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া সাহেবের সময়ে পিকেএসএফে কর্মরত ছিলাম। সঙ্গে কাজ করেছি। আমি মনে করি, অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমান সাহেব সবচেয়ে সেরা ছিলেন। উনি নিজে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। তার নিজের স্বনামধন্য সিএ ফার্মও ছিল। সুতরাং অর্থনীতি নিয়ে তার সম্যক ধারণা ছিল। কোন ট্যাক্সের প্রভাব কেমন হবে, কোনটাতে ভর্তুকি দিতে হবে এবং কোনটাতে বাতিল বা কমাতে হবে—এ ব্যাপারে তার মোটামুটি পরিষ্কার ধারণা ছিল। এনবিআরকে তিনি গতিশীল রেখেছিলেন। যেহেতু একটু কড়া মেজাজের ছিলেন, অনেক সময় বড় বড় আমলার ওপর রেগে যেতেন। তবে তাকে ভালো করে কোনো কিছু বোঝালে উনি বুঝতেন। তিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ইচ্ছামতো ব্যাংকের ওপর চাপাতেন না।

আর এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ছিলেন একেবারে পেশাদার লোক। উনি নিয়মনীতি, তথ্য-উপাত্তের বাইরে সিদ্ধান্ত নিতেন না। বিভিন্ন খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার ব্যাপারে সজাগ ছিলেন। পলিসির ব্যাপারে উনি তেমন কিছু প্রভাব বিস্তারও করতেন না, কিন্তু সবসময় তিনি ইতিবাচক পরামর্শ যুক্ত করতেন। তিনি অনেক কিছুই আমাদের ওপর ছেড়ে দিতেন। তিনিও রাজনৈতিক অভিলাষে ব্যাংক হতে দেননি।

আর মুহিত সাহেব সজ্জন লোক কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে একটু মুডি ছিলেন। শিল্প-সাহিত্যসহ সব ব্যাপারেই উনার আগ্রহ ছিল। তবে মাঝে মাঝে উনি একটু চটে যেতেন, কিন্তু পরে আবার এসব মনে রাখতেন না। তিনি অনেক কিছু করতে চাইতেন, ঘোষণাও দিয়ে ফেলতেন; এটা করে দেব, ওটা করে দেব। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন করা উনার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যেমন তিনি পুঁজিবাজারে সরকারি নিয়ন্ত্রণ একেবারে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। পরে আবার যখন তাকে বলা হয়েছে এটা করা যাবে না, তিনি চুপচাপ ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের প্রভাব তেমন ছিল না। কেউ উনাকে এসে বলতে পারতেন না যে এটা করেন, ওটা করেন। তাছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীও সাইফুর রহমানের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না।

কিন্তু মুহিত সাহেবের বেলায় দেখলাম তিনি রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে সরাসরি কিছু বললে তা ফেলার ক্ষমতা তার ছিল না। তবে আমার পরবর্তী গভর্নর আতিউর রহমানের ব্যাপারে উনি শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। আতিউর উনাকে অনেকভাবে বাইপাস করার চেষ্টা করেছেন, সেটা উনি পছন্দ করতেন না। আবার কিন্তু সরাসরি কিছু বলারও সুযোগ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যখন রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটল তখন তিনি আর সুযোগ দেননি। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু মনে মনে চাননি তাকে সরাতে, কারণ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে আতিউর বলতে গেলে ম্যানেজই করে ফেলেছিল। আতিউরের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।

২০০৯-এ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও আপনি গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী মুহিত আপনার কাজে হস্তক্ষেপ করেছিলেন?

না, তেমনটা হয়নি। শুরুতে উনি (শেখ হাসিনা) ও মতিয়া চৌধুরী বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছেন বিদেশীরা কেন বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তখন মুহিত সাহেব বোঝাতেন যে তারা সেটা পলিসির মধ্য থেকেই করছেন। আমিও বললাম, বিদ্যমান আইনেই তারা তাদের মুনাফা নিয়ে যেতে পারবে। আইন না পাল্টালে অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। তখন মতিয়া চৌধুরী বললেন, এগুলো বন্ধ করেন, বিদেশীরা সব টাকা নিয়ে যাচ্ছে। উনার কমিউনিস্ট মনোভাবটা তখন কাজ করছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কোনো হস্তক্ষেপ করেননি, এমনকি নিয়োগ নিয়েও হস্তক্ষেপ করেননি। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদের একটা সুবিধা ছিল যে তখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি সাধারণ পর্যায়ে ছিল। যেটা পরবর্তী সময়ে খারাপের দিকে যেতে থাকে। প্রথম মেয়াদেও আওয়ামী লীগ যেমনটা ছিল সে রকম থাকলে এত অজনপ্রিয় হতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে দুর্নীতি বাড়তে শুরু করে, ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য ও দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ীরা বড় বড় রাজনৈতিক পদে গেল, তারা এমপি হলো, বড় বড় টিভি চ্যানেল, সংবাদপত্র, মিডিয়া, ব্যাংকে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো। সেই সময়টা থেকেই তারা সুবিধা যেমন নিত অন্যদেরও পাইয়ে দিত। পুরোপুরি খারাপ সময়কালের শুরু হয় ২০১৪-পরবর্তী সময়ে। একতরফা নির্বাচনে সরকার গঠন করে যখন তিনি দেখলেন, রাজনৈতিকভাবে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো আর কেউ নেই। বিএনপির আন্দোলনও তখন সফল হচ্ছিল না, এতে আওয়ামী লীগ আরো বেপরোয়া হয়। তবে বলতেই হয়, এত খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও বিএনপি কিন্তু ভাঙেনি। এটা প্রশংসা করার মতোই ব্যাপার। আওয়ামী লীগ তো অনেকবার ভেঙে গেছে। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ তো কয়েকভাবে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। গত এক দশকে বিএনপিকে ভাঙার অনেক চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ কিন্তু পারেনি।

২০১৪-এর পর থেকে শেখ হাসিনার কাছে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত হলো, কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। আর সবচেয়ে বেশি যেটা ক্ষতি করলেন, সেটা হলো খাঁটি রাজনীতিবিদ বলতে উনি কিছু রাখলেন না। যারা একদম প্রান্তিক পর্যায় থেকে রাজনীতি করে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসে সেই সংস্কৃতি আর থাকল না। আগেকার দিনে এসব রাজনীতিকই দেশ চালাতেন। এখনো তো ভারতের বেশির ভাগ রাজনীতিবিদেরই স্থানীয় রুটটা বেশি কাজ করে। আমাদের রাজনীতির দখল একে একে নিতে শুরু করলেন ব্যবসায়ীরা। সংসদে জাতীয় পলিসি নিয়ে কোনো বিতর্ক হতো না, তারা ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে লাগল। শেখ হাসিনা মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী ও এমপির সঙ্গে কাজ করতেন।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

বিভিন্ন অন্যায়-অবিচার, অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের পর থেকেই মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ আর আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে সরকার চলছিল। অর্থনৈতিক সুবিধা বিবেচনা না করে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হলো, বৈদেশিক ঋণ নেয়া হলো। কর্ণফুলী টানেল করা হলো, অনেক ব্যয় করে রেল সেতু করা হলো। হাওরের ওপর হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা করা হলো। এগুলো কোন অর্থনৈতিক বিবেচনায় করা হলো? বড় বড় প্রজেক্ট নেয়ার উদ্দেশ্য কী, তার ব্যয় কী হবে, সেখান থেকে আমরা কী পাব, সেগুলো ঠিকভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার পেছনে প্রধান প্রণোদনা ছিল কিছু লোকের টাকা বানানো। ধরুন ৫০০ কোটি টাকার একটা প্রকল্প নিলেন। দেখা যাবে, ৩০০ কোটি টাকা হয়তো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে। বাকি টাকা বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, কনট্রাক্টর এবং অন্যদের পকেটে গেছে। পদ্মা সেতুর দিকে যদি তাকান, সেটা ঠিক সময়ে শেষ করা হয়নি এবং পরিকল্পিত ব্যয়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি ব্যয় হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়েও কনট্রাক্টের কাজ পেত দলীয় লোকজন, প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও সীমিত ছিল। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় রাজনৈতিক বিবেচনা স্থান পেয়েছিল। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য তেমন সুবিধা ছিল না। যাদের লিংক ভালো ছিল, সে রকম বড় কিছু প্রতিষ্ঠান ঋণ পেত।

ছাত্র-জনতা দীর্ঘদিন ধরেই টের পাচ্ছিল দেশ ঠিক পথে যাচ্ছে না। একদিকে সীমাহীন অনিয়ম, অন্যদিকে সীমাহীন বৈষম্য। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছিল। সম্পদের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছিল। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকজনের কারো কারো অনেক বাড়ি, আবার অনেকের ভাড়া বাসায় থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সাবেক এক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী একজনেরই কয়েক শত বাড়ি। এ রকম আরো অনেক রাজনীতিবিদ ও আমলারও প্রয়োজনের অধিক বাড়ি-গাড়ি আছে। এতে মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ছাত্ররা দেখছিল তাদের পড়াশোনার মান খারাপ, তারা ভালো চাকরি পাচ্ছে না, সরকারি চাকরিতে আবার কোটার বাধা। রাজনীতি করে করে শিক্ষকদের মান নিম্নমুখী। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ভিসি এলেন যারা ওই পদের যোগ্য নন।

যেমন একজন ভিসি ১০ টাকা দিয়ে চা-চপ-শিঙাড়া নিয়ে খুব গর্ব করলেন! একজন ভিসির মুখে এ ধরনের কথা একেবারেই বেমানান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক আছেন খুব ভালো। তাদের শিক্ষক বা ভিসিরা এগুলো করেন না। এসব দেখে বিদেশীরা তুলনা করে। অথবা তারা পুরনো দিনের যারা শিক্ষক আছেন তাদের দেখেছে। বর্তমান অনেক শিক্ষক যেসব কথাবার্তা বলেন তা আমার আমলের শিক্ষকদের সঙ্গে মেলে না। অধিকাংশ শিক্ষক ছাত্রদের উসকানি দেন, ছাত্রনেতাদের কাছে পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করেন। এসব কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা হলগুলোয় ঢুকতে পারত না। আমাদের সময় আমরা হলে ছিলাম, এ রকম শুনিইনি যে কাউকে বাধা দেয়। আমাদের সময় ছাত্রলীগ ছিল, ছাত্র ইউনিয়ন ছিল, ইসলামী ছাত্র সংঘ ছিল, আর এনএসএফ ছিল সরকারি। কেউ তো বলত না যে কাউকে হলে ঢুকতে দেবে না, সবাই ছিল হলে। একটা সহাবস্থান ছিল। আমরা স্লোগান দিতাম, হলের এক কোনায় মিটিং করতাম। কেউ বাধা দিত না। কিন্তু ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি কোন দিকে গেল, আর গত কয়েক বছরে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছিল? চাকরি, সুযোগ-সুবিধা, বিদেশ গমন সব ব্যাপারেই রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

৫ আগস্ট বিগত সরকার পতনের পর ৮ তারিখ অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলো। এ সরকারে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন। এ সরকারের সঙ্গে আপনার যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটা জানতে চাই।

বিগত সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া ঘিরে জনমনে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ জন্মায়। আমরা যা বলতে চেয়েছি বা ছাত্ররা যা বলতে চাইত, কোনো কথাই সেভাবে প্রকাশ করা যায়নি। পত্রিকাগুলো মাঝে মাঝে কিছু সাহসী আর্টিকেল প্রকাশ করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ লেখকই কোনো ফলোআপ লেখার সাহস পেতেন না। টিভিতে সাজানো টক শো হয়েছে। এসব সাজানো বিষয় ছাত্ররা টের পেত। গণমাধ্যম পুরোপুরি শাটডাউন অবস্থায় ছিল। সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে।

সেই সময়ও ছাত্রদের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি তখন অনেক বক্তব্য দিয়েছিলাম। কিন্তু সেবারের আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছিল, যা এবার হয়নি। কারণ এবার কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি বৈষম্যমুক্ত সমাজের দাবিও যুক্ত ছিল। আর এসবের মূলে ছিল বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের অবিচার, অন্যায়, দুর্নীতি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এটাই ছিল গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট।

৩ আগস্ট আন্দোলন তীব্র রূপ নেয় এবং একদফায় গিয়ে ঠেকে। আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী গণভবন ঘেরাও কর্মসূচি ৬ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল। ছাত্ররা তা একদিন এগিয়ে নিয়ে আসে। কারণ তারা বুঝেছিল যে সেদিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রতিহত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে। অতীতের বেশ কয়েকটি আন্দোলন থেকে ছাত্ররা অনেককিছু শিখেছে। ছাত্ররা সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করত। তাই আন্দোলন চলাকালীন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকা পরও তাদের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। আমরা শুনছি তারা অন্য রকমভাবে যোগাযোগ করত। মেসেজ পাঠাত এক জায়গায়, তারপর সেখান থেকে তা ছড়িয়ে যেত সবার কাছে। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে। যেমন শাহবাগে ৫ তারিখের আগেই রাত ১২টা-১টার মধ্যে ছাত্ররা চলে আসে। ভোরবেলা এলে যদি বাধা দেয় সেটা ভেবে। তাদের পরিকল্পনায় এটা ছিল।

তারা গণভবনের দিকে, বছিলা, শ্যামলী, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় জমায়েত করেছে। এটা ছিল থ্রেট টু শেখ হাসিনা। তাছাড়া আর্মির নীতি ছিল অসংখ্য ব্যক্তি যদি চলে আসে তাহলে তারা কিছু করতে পারবে না। ওদিকে শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আর্মিকে কাজে লাগিয়ে টিকে থাকতে, যা সম্ভব ছিল না। ততদিনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ পেতে থাকে। এ আন্দোলনে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। আমি দেখলাম, গৃহবধূদের অনেকেই এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল যারা কোনোদিন কোনো আন্দোলন করেনি। ঢাকার চতুর্দিক থেকে জনস্রোত দেখে শেখ হাসিনা দ্রুত রিজাইন দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু তখনো কীভাবে নতুন সরকার গঠন হবে তা ঠিক হয়নি। কারণ বহু আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। এরশাদের পতনের পর রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সাহেবকে রাজি করানো হলো একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য।

কিন্তু এবার যেটা হলো, ছাত্ররা ঠিক করল যে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। তারা অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করল। সর্বপ্রথম তারাই আলাপ করেছে কারা দায়িত্বে আসবে। তারপর বঙ্গভবনে গেল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলাপ করতে। সেখানে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে, প্রায় ৪ ঘণ্টা। নাম সাজেস্ট করেছে, কী হবে কী না হবে, কারা আসবে। সেখানে মতামত হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম সামনে এসেছে। পরে মোটামুটি একটা লিস্ট করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তিনি তার মতামত দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ছাত্ররা যেহেতু চাইছে হয়তো সম্মত হবেন। এবার অনুরোধ তিনি ঠেকাতে পারলেন না। তিনি দেখেছেন কীভাবে রাজনীতিতে না গিয়েও রাজনীতির শিকার হলেন। তাকে আইন-আদালত ব্যবহার করে হেনস্তা করা হলো। শ্রম আদালতে হাজিরা দিতে গেলে দেখেন লিফট বন্ধ, ৮২ বছর বয়সে তাকে ছয়তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হলো। রাজনীতি করতে না চাইলেও তিনি যে রাজনীতির শিকার হতে পারেন তা নিয়ে উপলব্ধি অবশ্যই হয়েছিল। এ কারণে এবার ছাত্র নেতৃত্বের কাছ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি রাজি হলেন।