নিরাপদ সড়ক ও স্বাভাবিক মৃত্যু সবারই কাম্য। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাংলাদেশের মানুষের নিত্যদিনকার অভিজ্ঞতার অংশ। সড়কে বছরে যে প্রাণহানি হয় যুদ্ধরত অনেক দেশেও এত প্রাণহানি হয় না। দেশে ফুটপাত দখল, অদক্ষ চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো, সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার জাতীয় যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক আইন না মানা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার এবং সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতাসহ নানা কারণে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৪ সালে দেশে প্রাণহানি হয়েছে ৫ হাজার ৩৮০ জনের, যা গত চার বছরের চেয়ে সর্বোচ্চ। তবে বেসরকারি সংস্থার হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরো বেশি। অভিযোগ আছে, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও মৃত্যুর জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষই (বিআরটিএ) অনেকাংশে দায়ী। তাদের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে প্রতিনিয়ত সড়কে হতাহতের ঘটনা ঘটছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে সংঘটিত হয়েছিল ছাত্র আন্দোলন। এর পরই দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও সড়ক নিরাপদ করার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করে। যদিও পরবর্তী সময়ে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা আর গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি।
চব্বিশের আন্দোলনের ফলস্বরূপ অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলে জনমানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল শৃঙ্খলা ফিরে নিরাপদ হবে সড়ক, কমে আসবে প্রাণহানি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো সড়কে প্রাণহানি
কমানো ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এখনো অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সড়কে যানবাহনের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি নীতিমালা করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত সেটি কার্যকর করা যায়নি।
দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করে ট্রাফিক পুলিশ। দায়িত্বে অবহেলা ও দক্ষতার অভাবসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জনবল সংকটও প্রকট। ফলে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালনে দেখা যায় না। জনবল সংকট থাকায় অতিরিক্ত সময় দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। এতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না। জনবল সংকট নিরসন করে দক্ষ ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ নিশ্চিত করা উচিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। অর্থের বিনিময়ে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করা হয় সেখানে। ফিটনেসবিহীন গাড়িকে ফিটনেস লাইসেন্স প্রদান এবং অদক্ষ চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানসহ সব কাজ সেখানে অর্থের বিনিময়ে সহজেই করানো যায়। বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা ও এক শ্রেণীর দালাল মিলে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের পদে পদে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার এ সিন্ডিকেটের মাধমে অবৈধ অর্থের লেনেদেনে সহজেই সেবা মিলছে। সড়কে দক্ষ চালক ও ভালো যানবাহন নিশ্চিত করতে হলে বিআরটিএকে একটি সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংস্থাটিতে সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তাহলে দালালমুক্ত হয়ে গ্রাহক হয়রানি কমবে। তবে শুধু মৌসুমি অভিযান পরিচালনা করে এ শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা দুরূহ কাজ। সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারিতে রাখতে হবে বিআরটিএকে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়বেন তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
বর্তমানে নিরাপদ সড়ক বিশ্বব্যাপী একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর পরিণতি ও বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে সমাজে জনসচেতনতা বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মোটরযানের ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে ভিন্ন। ২০০৩-১৩ পর্যন্ত সময়ে সড়ক নিরাপত্তার তথ্য বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জনসংখ্যাপ্রতি মৃত্যুহার অনেক বেশি। ইইউ দেশগুলো সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে শূন্য মৃত্যুহারের লক্ষ্য অর্জনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে মৃত্যুহার বাড়বে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশের বেশি, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। উন্নত দেশগুলোয় সড়ক নিরাপত্তায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে উন্নত দেশগুলো সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় একই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশই বসবাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় (নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ) এবং বিশ্বের মোট যানবাহনের ৫৪ শতাংশই চলাচল করে সেখানে। বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশ হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। আর বাকি ১০ শতাংশ হয় উন্নত দেশগুলোয়। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে উগান্ডা। আর ঘানা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পথচারীরা সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মোটরযানের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিও দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং মৃত্যুহার বাড়াতে অবদান রাখছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তাকে সরকার কম অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ায় তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে। গত দুই দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভবিষ্যৎ সড়ক নিরাপত্তা কৌশল বিকাশ এবং কার্যক্রমকে সহজতর করার জন্য গবেষণা শুরু করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি বিভিন্ন দেশের মোট জিডিপির গড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ (যেখানে অমূল্যায়িত প্রভাব যেমন ব্যথা ও যন্ত্রণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি)। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি বিভিন্ন দেশের মোট জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে থাকে। এর সমস্যার ব্যাপকতা, বিস্তৃতি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব উদ্বেগজনক। এজন্য সমস্যা, কারণ, আর্থিক ক্ষতি ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবর্তনের বিস্তারিত বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়নে অনেক বাধা রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য কম সম্পদ বরাদ্দ এর প্রধান বাধা। এরপর রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য, কর্মক্ষমতার পরিমাপ এবং নীতির অভাব। তবে ডব্লিউএইচও বলছে, উন্নত দেশগুলোর সফল নীতিমালা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় চালু করা উচিত। উন্নয়নশীল দেশে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে এবং সড়ক নিরাপত্তার প্রতি সাধারণ মনোভাবের কারণে সড়ক ব্যবহারকারীদেরও আচরণ মানসম্পন্ন নয়। যেমন উচ্চ গতিতে গাড়ি চালানো দুর্ঘটনা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। তাই পুলিশের মাধ্যমে যথাযথ ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ট্রাফিক পুলিশ উন্নত দেশগুলোর মতো প্রশিক্ষিত বা সজ্জিত নয়। দুর্ঘটনার সময় সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো বাস বা গাড়ির যাত্রীদের জন্য সিটবেল্ট বাঁধা এবং মোটরসাইকেলচালকদের জন্য হেলমেট পরতে বাধ্য করা। উন্নত বিশ্বে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করার ফলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার উন্নতি সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে।
ইউরোপের উন্নত দেশসহ অন্য উচ্চ আয়ের দেশগুলো ২০০০-২০ সালের মধ্যে সড়ক মৃত্যুহার ২৭ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করেছে। ইউরোপীয় কমিশন (ইসি) সড়ক দুর্ঘটনার বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হলো এক. অতিরিক্ত গতি, যা এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যু ও গুরুতর দুর্ঘটনার জন্য দায়ী; দুই. দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান (ব্ল্যাক স্পট); তিন. সিটবেল্ট বা হেলমেট ব্যবহার না করা, যা দুর্ঘটনার তীব্রতা বাড়াতে পারে; চালকদের ড্রাইভিং নীতিমালা না মানা। ‘ভিশন জিরো’ ও ‘সেফ সিস্টেম’-এর মতো নতুন পদ্ধতি সড়ক ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ করতে পারে। সুইডেন ‘ভিশন জিরো’ পদ্ধতি চালু করেছে, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুহীন বা আজীবন যন্ত্রণাহীন থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশও সুইডেনের মতো পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুহার কমবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুহার অনেক বেশি। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতিও বাংলাদেশে অনেক বেশি। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিক। অন্তর্বর্তী সরকার সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুহার কমাতে উন্নত দেশগুলোর সফল নীতিমালা ও উদ্যোগগুলো অনুসরণ করতে পারে।










