সম্প্রতি আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে গিয়েছিলাম, যেখানে আমি ৪৭ বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া শেষ করেছি। আমরা প্রাক্তন ছাত্ররা, বিশেষ করে যারা উত্তর আমেরিকায় বাস করছি, আমাদের নিজেদের অর্থে ক্যাম্পাসের ভেতরে কলেজের শিক্ষকদের, কর্মচারীদের এবং গ্রামবাসীদের ছেলেমেয়ের জন্য একটি স্কুলের চারতলা একাডেমিক ব্লক তৈরি করে দিচ্ছি। আমি ডিজাইন ও নির্মাণের তত্ত্বাবধান করছি, কারণ এটি আমাকে স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব একটি ভবন বাস্তবায়নের সুযোগ দিচ্ছে। ওখানে পৌঁছে দেখলাম একটি বিরল দৃশ্য, প্রায় একশ ছেলেমেয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্লাস শুরুর আগে শপথ নিচ্ছে যে তারা তাদের দেশকে ভালোবাসবে। এটি দেখে হঠাৎ করেই ভাবলাম আমি এ সম্পর্কে কিছু লিখি।

২০০১ সাল। আমি তখন ওমানে সে দেশের প্রথম আর্কিটেকচার স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ করছিলাম। ত্রিনিদাদের লেখক ভিএস নাইপল সে বছর যখন সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন তখন মানুষ বলতে শুরু করল তিনি ‘মুসলিমবিদ্বেষী’। যদিও আমি এরই মধ্যে তার একটি বই এবং তার ছোট ভাইয়ের কিছু প্রবন্ধও পড়েছিলাম, তবে আমি ১৯৮১ সালের সেই বইটি ‘‌Among the Believers: An Islamic Journey’ পড়িনি, যা বিশেষভাবে বর্ণবাদের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল। তাই আমি সুলতান কাবুস ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে বইটি নিয়ে পড়ে শেষ করলাম।

বইটি মূলত ১৯৭৯ সালে এশীয় মহাদেশে ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে ছয় মাসের একটি যাত্রার নিবিড় বর্ণনা। মনে রাখবেন, এটি ছিল ইরানি বিপ্লবের পরবর্তী সময় এবং পাকিস্তানে ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউল হক। নাইপল একজন অন্ধ তরুণ নেতা গুস দুর (আব্দুর রহমান ওয়াহিদ), যিনি পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়ার চতুর্থ রাষ্ট্রপতি হন, তার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। নাইপল ইসলামী জাতিসত্তাগুলোর অন্তরে রাখা জীবনের অন্বেষণ করেন। তিনি সেই সময়ে মুসলিম বিশ্বে বিস্ফোরক পরিস্থিতির কারণ অন্বেষণ করেন, যেখানে বর্তমানে যাকে আমরা ইসলামী মৌলবাদ বলি তার গোড়াপত্তন হচ্ছিল। তিনি অনেক লোকের কাছাকাছি আসেন, যাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। এদের মধ্যে কিছু লোককে তিনি ভেবেছিলেন দ্বিচারী, কারণ তারা মুখে এক আর কাজে অন্য। এটি ছিল তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং আমি বিশ্বাস করি, তিনি তার নিজের ধারণা লিখতেই পারেন; তাকে এজন্য ‘বর্ণবাদী’ বলা ঠিক হবে না। বরং নিউজউইকের মতে, বইটি ছিল ‘একটি আলোক্ষেপী প্রতিবেদন...যার নির্মম সত্য ক্রমাগত উন্মোচিত হচ্ছে...।’

সবার মাঝে নাইপল মালয়েশিয়ানদের প্রশংসা করেছিলেন, যারা হচ্ছে একটি মধ্যপন্থী ও সহনশীল ইসলামের অনুসারী এবং শান্তিপূর্ণভাবে অন্য দুটি প্রধান জাতি চীনা ও ভারতীয়দের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে। তারা শাফি’ই মাজহাব অনুসরণ করে, যা নবম শতাব্দীতে একজন পণ্ডিত, আইনজ্ঞ এবং ঐতিহ্য অনুসারী, যাকে ‘মুসলিম বিচার ব্যবস্থার পিতা’ বলা হয়, সেই আল-শাফি’ইর ভাবধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নাইপল তাদের প্রকৃতি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি ভালোবাসা লক্ষ করেছিলেন; তারা প্রায়ই একটি উঁচু চাতাল এবং নদীর পাশে মসজিদ বানাত এবং কখনো অযথা গাছ কাটত না। নাইপল নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সাত বছর পর আমি ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়ায় (UTM) নগর ডিজাইনের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই, আর দেখতে পাই যে নাইপল প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সঠিক ছিলেন।

কুয়ালালামপুরে আমি খেয়াল করলাম, শতবর্ষী বিশাল মহীরুহ বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ হয়ে আছে, কিন্তু কেউ কাটবে না। শহরের মধ্যেই লক্ষ বছরের পুরনো ক্রান্তীয় বন, মনেই হবে না এক সর্বাধুনিক কসমপলিটন শহরে আছেন আপনি। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি এক বাসভর্তি ছাত্রছাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়া ভ্রমণে বেরিয়েছি, এক রিসোর্ট থেকে আর একটিতে ঘুরছি, যাতে তারা ক্লাসে রিসোর্ট ডিজাইন করতে পারে। প্রথম দিন তারা ভোরের আলো ফোটার বেশ আগে একটি মসজিদে থামল এবং আমেলিয়া (একজন চাইনিজ মেয়ে) এবং মুরু (একজন ভারতীয় ছেলে) ছাড়া সবাই বিশাল তোয়ালে আর কিছু কাপড় নিয়ে নেমে পড়ল, যা দেখে আমি অবাক। মুরু আমাকে জানাল যে তার বন্ধুরা পুরো স্নান করবে, নামাজ পড়বে এবং এটি তাদের দৈনন্দিন রুটিন।

ইউটিএম ক্যাম্পাস, দেশটিতে ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়ার পর সবচেয়ে বড়। এখানে কৃষি বিভাগ এবং তাই পরীক্ষামূলক মাঠ ছিল। ডিজাইন স্টুডিওগুলো আমার অফিস বিল্ডিং থেকে আলাদা একটি ভবনে ছিল। আমি লক্ষ করলাম, ক্লাসের আগে আমি অফিস ও স্টুডিওর মাঝে সরাসরি লন দিয়ে যখন তথাকথিত ‘‌শর্টকাট’ নিতাম, আমার ছাত্ররা বরং ছাদওয়ালা, লম্বা, খোলা করিডোর দিয়ে স্টুডিওতে হেঁটে আসত, যদিও এতে তাদের প্রায়ই দেরি হয়ে যেত। একদিন আমি আমেলিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন তারা এমন করে এবং সে আমাকে বলল, ‘এটা তো তাদের শেখানো হয়েছে। ওরা ঘাসের ওপর হাঁটবে না। আমি তাকে কোথায় ও কীভাবে শিখেছে জানতে চাইলে সে বলল, ‘স্কুলে যখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন আমরা ১০০ বার লিখতাম, ‘‌গাছকে সম্মান করো, তাদেরও জীবন আছে’।

বাংলাদেশের একটি গ্রাম্য পরিবেশে স্কুলের ছাত্রদের আমি যা করতে দেখেছি আর মালয়েশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আমাকে যা বলেছিল, তার মধ্যে যোগসূত্র কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? যদি না পেয়ে থাকেন, তাহলে বুঝুন প্রকৃত শিক্ষা কোনটি, আর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেমন হয়।

আহ্‌ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে স্থায়ী সরকারি সনদ পাওয়া প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা এখানে একটি সংগঠনকে কাজ করতে দিয়েছি, যার নাম ‘‌এথিকস সেন্টার’, যা প্রধানত নর্থ আমেরিকান বাংলাদেশী ইসলামী কমিউনিটির অর্থায়নে চলে এবং এটি মাঝেমধ্যে আমাকে তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানায়। তারা স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ এবং আচরণ উন্নয়ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। তাদের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সময় হঠাৎ আমার মনে এল, যখন আমি একটি খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে পড়তাম, তখন আমি “সদা সত্য কথা বলিব” লিখে খাতার পাতা ভরে ফেলতাম। আর আমার ধারণা, এখন আমাদের শিশুরা এ ধরনের অনুশীলন আর করে না, বিশেষ করে ঢাকার স্কুলগুলোয়! আমি কানাডায় এক যুগ বসবাস করেছি এবং দেখেছি সেখানে তারা কল্পনাও করতে পারে না যে কেউ ‘‌স্বাভাবিক’ভাবেই মিথ্যা বলবে! আর বাংলাদেশে এ ব্যাপারটা কতটাই না সাধারণ! আমাদের নৈতিক শিক্ষাগুলো এভাবেই স্কুলগুলো থেকে উধাও হয়ে গেছে! আর এর বলি হচ্ছে আমাদের জাতিগত চরিত্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের গ্রহণ করি এবং তাদের নির্দিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করতে লক্ষ রাখি, যাতে তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি কেতাবি বিদ্যা শিখে দেশের মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে। অথচ তার চরিত্র গঠন ও কর্মোপযোগী সক্ষমতা গড়ার দিকটা খেয়াল রাখি না; ধরেই নিই সে কাজ তারা স্কুল পর্যায়ে রপ্ত করে এসেছে। পেশা চর্চাকারী বা মানবসম্পদের অংশীদারের ধারণাটি মধ্যযুগীয়, যখন মঠ ও গিল্ডগুলো ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলা শুরু করল। কারণ তাদের দরকার পড়েছিল শল্যবিদ, ধর্ম শিক্ষক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আইনজীবী, কারিগর ইত্যাদি। গ্র্যাজুয়েটের সরাসরি বাংলা পরিভাষা আমি সচেতনভাবে এখানে এড়িয়ে গেলাম, যাতে গ্র্যাজুয়েশন মানে যে একটি স্তর অতিক্রম করা এ বোধ আমাদের চিন্তায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আমরা প্রথমে একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করি, ডাক্তার বা প্রকৌশলী নয়, এ ধারণা নব্য ধ্রুপদী যুগে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছিল। আমাদের উচিত, গ্র্যাজুয়েটকে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা—একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি, যার মধ্যে অবশ্যম্ভাবী গুণাবলি হিসেবে আছে যুক্তিবাদিতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পেশাদারত্ব আর আজীবন জ্ঞানার্জনের পিপাসা ইত্যাদি। সে হবে সমস্যার সমাধানকারী, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক আর নেতা।

তাহলে আমরা শিক্ষক বা অভিভাবকরা কি সঠিক কাজ করছি? আর কীভাবে আশা করতে পারি যে আমাদের ভবিষ্যৎ দেশবাসী সবাই দেশপ্রেমিক, যুক্তিনিষ্ঠ, চিন্তাবিদ, ভালো নাগরিক এবং উচ্চ নৈতিকতার মানুষ হবে? যদি না হয়, তাহলে তারা কীভাবে অন্য আরেকজন, সমাজ এবং জাতির সেবা করতে আর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে? তাহলে আমাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন কি দরকার নয়?

ড. মাহবুবুর রহমান: উপ-উপাচার্য, আহ্‌ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়