বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ অভিবাসনের পথ বেছে নেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সম্ভাবনাময় এ খাত দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে জনশক্তি রফতানির নিরিখে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় গত বছরের ৩১ মে বন্ধ হয়েছে। এর আগেও একই অভিযোগে দুবার তা বন্ধ হয়েছিল। একই অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বড় বড় শ্রমবাজার থেকেও একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এর পরও অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি দেয়ার সময় অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন মাঝ সমুদ্রে। অথবা সেসব দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা পাচারকারী চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রভাব পড়েছে বৈধ অভিবাসীদের ওপরও। তাদের অনেকেও দালালদের প্রতারণার কারণে গন্তব্যে পৌঁছে কাজ পাননি। অর্থাৎ সিন্ডিকেট চক্র ও দালালদের দৌরাত্ম্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবন যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি বিশ্বের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
এসবের কোনো কিছুই অপ্রকাশিত নয়। গণমাধ্যমগুলোয়ও প্রায় এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। তথ্যপ্রমাণসহ এর সঙ্গে জড়িতদের নামও সেসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো সরকারের আমলেই মানব পাচার সিন্ডিকেট ও দালালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। অথচ মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। সরকারের পক্ষ থেকে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয় না তা বোধগম্য নয়। সরকারের এমন নিস্পৃহা বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রফতানি খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যা মোটেও কাম্য নয়। সরকারের উচিত এ খাতে বিশেষ মনোযোগ দেয়া। মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন রোধ করে সরকারের বিদেশী শ্রমবাজার ধরে রাখায় সচেষ্ট হতে হবে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদেরও মত, রেমিট্যান্সের বড় উৎস প্রবাসী আয়। তাই জনশক্তি রফতানি খাত সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ব্যাপক মনোযোগের দাবি রাখে। তাদের মতে, বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য যেমন কমিশন গঠন করা হয়েছে, সরকারের উচিত টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল শ্রমবাজার গঠনে প্রয়োজনে কমিশন গঠন করা, যাতে খাতটির সংস্কার করা যায়।
বৈশ্বিক অভিবাসীর উৎস তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি দেন গড়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। দালাল চক্র যেন অবৈধ পথে কর্মী পাঠানো, মানব পাচারের মতো অপরাধ করতে না পারে সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ঘটতে দেখা যায়। সুতরাং সিন্ডিকেট, রিক্রুটিং এজেন্সি, দালাল—সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে মানব পাচারের নতুন কোনো সক্রিয় দল না তৈরি হয়। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে অভিবাসন খাতে দেশের ভাবমূর্তি ফেরানো প্রয়োজন।
ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা বা মানব পাচার রোধে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগের আমলে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে খোদ সরকারি দলের নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। কেউ কেউ বিদেশে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এ সরকারের পতন ঘটেছে। দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ছয় মাস অতিবাহিতও হয়ে গেছে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত না হওয়াটা বেশ হতাশাজনক। তবে প্রত্যাশা রয়েছে, সরকার এসব চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবে।
এক্ষেত্রে শুরুতেই অনুমোদনপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করা জরুরি। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শ্রমবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিগত সরকারের আমলের শেষ চার বছরে (২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) ১ হাজার ৩১টি রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। যেখানে এর আগের ৩০ বছরে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল ৯৯১টির। এসব রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে বিপুলসংখ্যক মানব পাচার করা হয়েছে। সুতরাং জরুরি ভিত্তিতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা ও প্রমাণ সাপেক্ষে সিদ্ধান্তে আসতে হবে সরকারকে।
পাশাপাশি মানব পাচারের যেসব রুট তৈরি হয়েছে, সেসব রুট বন্ধে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব রুটে তদারকি জোরদার করতে হবে। গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ ও যশোর মানব পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। সুতরাং এ রুটগুলো কীভাবে একেবারে বন্ধ করা যায় সেদিকে সরকারের নজর দেয়া আবশ্যক।
মানব পাচারের ক্ষেত্রে প্রতারক চক্র যেমন দায়ী, তেমনি অভিবাসন প্রত্যাশীদেরও খানিকটা দায় রয়েছে। তাদের দায়টা অবশ্য সচেতনতা না থাকা কেন্দ্রিক। অবশ্য এ অসচেতন হওয়ার পেছনে আবার আর্থসামাজিক অবস্থান বড় ভূমিকা পালন করে। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনওডিসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রথম জাতীয় মানব পাচারবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, মানব পাচারের শিকার মানুষের বেশির ভাগই অত্যন্ত গরিব ও জীবিকার তাগিদে অবৈধ পথে পা দেয়। তাছাড়া বৈধভাবে বিদেশে গমনের ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এ সুযোগটাই মূলত কাজে লাগায় মানব পাচারকারীরা। কয়েক বছর ধরে বিদেশে অভিবাসনের নামে মানব পাচারকারীদের বড় একটি সক্রিয় চক্র জনপ্রতি ২০-২৫ লাখ টাকা নিয়ে এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে আমেরিকা ও ইউরোপে পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এ চক্র এতটাই সক্রিয় যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এজেন্ট নিয়োগ করে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশ নিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সরকারিভাবে ও বৈধ পথে কীভাবে জনশক্তি রফতানি করা যায় সে বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে এবং নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে এমন ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন যাতে অভিবাসন খাতে শৃঙ্খলা আসে এবং সুনাম বজায় রাখা যায়। নয়তো কয়েক বছর ধরে যেভাবে মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন ঘিরে বিদেশী শ্রমবাজার বন্ধ হচ্ছে, তাতে জনশক্তি রফতানি খাত মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।










