ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের অনেক মেয়র, চেয়ারম্যান পর্যন্ত পালান। তিনদিন প্রায় সরকারবিহীন পার করার পর ৮ আগস্ট শপথ গ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার মধ্যে সরকার কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারলেও নাগরিক জীবনে স্বস্তি আনতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি সাধারণের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বাগে না আসা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটা। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে নেয়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ব্যবসা, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কোনোভাবেই কাজে আসেনি। সংস্থাটির প্রেসক্রিপশনে রাজস্ব বাড়াতে জরুরি বেশকিছু খাতে আরোপ করা হয়েছে ভ্যাট। তাতে রাজস্ব না বাড়লেও মূল্যস্ফীতির নাভিশ্বাস আরো চেপে বসেছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বিগত ছয় মাসে গণমুখী কোনো সংস্কার ঘটেনি। বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতি পদক্ষেপগুলো আইএমএফের প্রেসক্রিপশননির্ভর রয়ে গেছে।

অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গ্যাস খাতে বিগত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে ভর্তুকি ছিল ৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ভর্তুকির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এক বছরের ব্যবধানে গ্যাস খাতে ভর্তুকি এত বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত উচ্চ দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়িয়ে দেয়া। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যয়সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করে এ খাতের ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হতে গেলেও গ্যাসের আমদানি, সরবরাহ সংকট, বকেয়া, ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বরং বিগত সরকারের দেখানো পথে হেঁটে এ খাতে আরো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা।

ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া দলগুলো এবং সরকার জাতীয় ঐকমত্যের কথা বললেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। সরকারের কাজে গতিহীনতার জন্য একাধিক উপদেষ্টাসহ অনেকেই দায়ী করছেন জনপ্রশাসনের স্থবিরতাকে। গত ছয় মাসে অন্তত দেড় শতাধিক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারকে। যৌক্তিক-অযৌক্তিক দাবি নিয়ে সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন সাধারণ মানুষকে ভোগালেও তা নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জুলাই গণহত্যা ও আওয়ামী লীগ শাসনামলের অনিয়মের বিচারের গতি ধীর বলে অভিযোগ অভ্যুত্থানের অংশীজনের। রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ সংস্কারের গতিও ধীর।

ছয় মাসেও পুলিশ-র‍্যাবের কার্যক্রমে আশানুরূপ গতি আসেনি। অপরাধ দমন বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শক্ত ভূমিকা চোখে পড়ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে খুন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে সর্বমোট ৫ হাজার ৮৬২টি। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯২টি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩২৯টি। খুনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৫৪৫টি। সেই সঙ্গে ছিনতাই ও চুরির মতো অপরাধও বেড়েছে এ সময়ে। এ সময়ের মধ্যে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে ৩ হাজার ১৫৩ ও ৬২৩টি। পলাতক শেখ হাসিনা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের আয়োজনে ভাষণ দেয়ার ‘প্রতিবাদে’ গত বুধবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া শুরু হয়। সারা দেশে অন্তত ৫০ আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িঘরে হামলা হয় পরের দুই দিনে। এতে দেশে অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক সংকটে পড়েছে।

ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ নানা রকম অপরাধে জড়িত অনেকে জামিনে মুক্ত হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা আবারো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করে। চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতে জড়ায়। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম করে সন্ত্রাসীরা। গত সপ্তাহেই গ্রেফতার আওয়ামী লীগ নেতাকে ছাড়িয়ে নিতে গোপালগঞ্জসহ তিন জেলায় পুলিশের ওপর হামলা করে ক্ষমতাচ্যুত দলটির কর্মী-সমর্থকরা। গত মঙ্গলবার আটক তিন নেতাকর্মীকে ছাড়িয়ে নিতে উত্তরা পশ্চিম থানায় হামলা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

রফতানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্বস্তি দিলেও মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায়, বেসরকারি বিনিয়োগ, পুঁজিবাজার ও বিদেশী বিনিয়োগের অবনতি হয়েছে। পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের কাছ থেকে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, শ্রীলংকার চেয়েও খারাপ অবস্থায় চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ১২টি ব্যাংক ছিল অকার্যকর। আমানতকারীর টাকা নিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি হতো ভয়াবহ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। সাত মাসে রফতানি হয়েছে মোট ২ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বর শেষে রিজার্ভ বেড়ে ২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে রিজার্ভ প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন ডলার করে কমছিল।

অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এলেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বেকারত্বের মাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। প্রথম চার মাসে সার্বিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ১৮ শতাংশ। এ সময়ে উন্নয়ন ব্যয় রেকর্ড পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরিকল্পনা বিভাগের পর্যবেক্ষণ, বাজেট বাস্তবায়নের হার এত নিম্ন পর্যায়ে থাকলে আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

এরই মধ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। চলতি মাসে এসব প্রতিবেদন নিয়ে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের মতো সংস্কার নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। সংস্কারের ব্যাপারে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐক্য আসবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

পদোন্নতি, পদায়নসহ নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ব্যস্ত জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা। পদায়ন ও আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্বে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা কাটছে না। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর বিবৃতিতে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ডিসিদের মামলা নেয়ার প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রশাসনে বিশৃঙ্খলার আরেক উদাহরণ হলো কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করে আবার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে। প্রজ্ঞাপন, অফিস আদেশ জারি করেও তা টেকাতে পারছে না সরকার।

বিশেষ করে ৪৩তম বিসিএসের নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ছয় সদস্যকে নিয়োগ দিয়েও বাতিল করা হয়। ডিসি পদায়নে দফায় দফায় আদেশ বদল হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতিবঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বঞ্চনা নিরসনে গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রস্তাব গত ২৪ ডিসেম্বর অনুমোদন দেয় সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে যেসব কর্মকর্তা সচিব হতে পারেননি, কিন্তু চাকরি করেছেন তারাও বাড়তি সুবিধার জন্য তদবির করছেন। এতে আটকে গেছে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সুবিধা দেয়ার প্রজ্ঞাপন জারি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসেও গতি আসেনি জনপ্রশাসনে। পতিত বিগত সরকারের সময়কার মতোই এখনো মাথাভারী প্রশাসন (যেখানে শীর্ষ পর্যায়ে অতিরিক্ত জনবল আর নিচের দিকের পদগুলোয় লোকবল ঘাটতি), পুরনো আমলাদের ওপর নির্ভরতা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আধিক্য ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ নানা সংকটকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে জনপ্রশাসন। এ জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সম্প্রতি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। যদিও এসব সুপারিশের কতটা আসলে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

সরকারের মন্ত্রণালয় আছে ৪৩টি। আর বিভাগ ৬১টি। পুরনো পথ অনুসরণ করে এখনো এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ চলছে মাথাভারী প্রশাসন দিয়ে। বিগত সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও এ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে সচিব পদে কর্মরত আছেন ৭৬ জন। তাদের মধ্যে ১৫ জন কর্মরত আছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ভিত্তিতে। বিশেষ করে মন্ত্রিপরিষদ, মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর শীর্ষ পদগুলোয় চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পারা সফলতা বলা যায় বৈকি। বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সম্মানের জায়গা পাচ্ছে সেটাও আশাবাদের। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা বড় প্রাপ্তি। বাজার নিয়ন্ত্রণে আরেকটু সাফল্য দেখানো, অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা, জনপ্রশাসনকে আরো কার্যকর করা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে মানুষ স্বস্তি পেত। প্রয়োজনীয় ও জরুরি সংস্কারের পাশাপাশি একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ সামনে রেখে রাজনৈতিক রূপান্তরের দিকে অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রসর হবে এমনটাও কামনা করছে তিনটি নির্বাচনে ভোটবঞ্চিত মানুষ।