ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভুয়া মামলা দায়ের করে বিচারের নামে মার্কিন প্রশাসন প্রহসন করছে। একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নেয়ার ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। কী ধরনের বৈশ্বিক অব্যবস্থার মধ্যে আমরা আছি এটা তারই একটা ইঙ্গিত। আর এ প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো পাড়ার মস্তান-সন্ত্রাসীদের মতো! কোনো স্বাধীন দেশ ও নির্বাচিত সরকারের প্রতি তার সম্মান নেই! এমনকি নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও কোনো সম্মান নেই!

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নানা জটিলতায় রয়েছে। কয়েক কোটি মানুষের স্বাস্থ্য বীমা নেই, অনাহারি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং বহু লোককে ফুডকার্ড ব্যবহার করে খেতে হয়। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে, বৈষম্য বাড়ছে। বিপুল সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও সে দেশের জনগণের একটি বড় অংশের কাজ চিকিৎসা ও বাসস্থানের সমস্যা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যক্রম এসব ভোগান্তিকে আরো জোরদার করছে! যুক্তরাষ্ট্রের কতিপয় গোষ্ঠী যারা রাষ্ট্রের পুরো জনগণের এক ভাগ, যারা তেল কোম্পানি, ব্যাংকিং ও সামরিক খাতের সঙ্গে জড়িত তারা পুরো দেশের ৯০ ভাগ অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সুবিধার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়, কিন্তু বাকি ৯৯ শতাংশের জন্য কোনো দায়দায়িত্ব নেই। তেল ও সামরিক খাতের সঙ্গে যুক্ত এ ১ শতাংশের স্বার্থরক্ষার জন্যই ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ।

ভেনিজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত তৈরি হয় গত শতকের নব্বই দশকের শেষের দিকে। হুগো শাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিরোধটা শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত ভেনিজুয়েলায় বাংলাদেশের মতো পালাক্রমে দুটো দল ক্ষমতায় আসত, উভয়ই মার্কিন প্রশাসনের অনুগত ছিল। ফলে ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল। ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ বিক্রি করে দেশের মানুষের কাজে আসেনি, বরং সে দেশে একটা ধনিক শ্রেণী ফুলেফেঁপে ওঠে। এ ধনিক শ্রেণীই হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রধান অবলম্বন।

বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও ভেনিজুয়েলার ধনিক শ্রেণী উভয়ই বেকায়দায় পড়ে যখন হুগো শাভেজ তেল সম্পদের ওপর জাতীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন। তখন নানা গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয় শাভেজের বিরুদ্ধে জমায়েত করার জন্য। ২০০২ সালে তারা চেষ্টা করে শাভেজকে উৎখাত করার। তখন সামরিক ক্যু করে একটা পুতুল সরকার বসানোর চেষ্টা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গেই তাদের স্বীকৃতি দেয়, যদিও তা টেকসই হয়নি। কারণ হুগো শাভেজকে আটক করার পর কারাকাস থেকে শুরু করে সারা দেশেই ব্যাপক গণপ্রতিরোধ তৈরি হয়। ফলে দালাল গোষ্ঠী পালিয়ে যায়, মার্কিন প্রকল্প ব্যর্থ হয়। হুগো শাভেজ মুক্ত হন এবং আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন।

পরবর্তী সময়ে হুগো শাভেজ বলিভিয়া ও কিউবাকে নিয়ে লাতিন আমেরিকার একটা বিকল্প শক্তিশালী জোট করার চেষ্টা করেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ থেকে মুক্ত হওয়ার একটা পথ তৈরি করে বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তেল সম্পদের অর্থ শিক্ষা-চিকিৎসাসহ সর্বজনের স্বার্থে ব্যয়সহ শাভেজ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে ভেনিজুয়েলায় দারিদ্র্য-বেকারত্ব-অসুস্থতা কমে যায়, সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে, দেশটির গরিব মানুষেরা একটা সম্মানজনক জীবনের দিশা পায়।

কিন্তু হুগো শাভেজ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করায় এ যাত্রায় বড় এক ছন্দপতন হয়। তারপর সেই বলিভারিয়ান বিপ্লবের ধারাকে অব্যাহত রাখেন নিকোলাস মাদুরো। বিভিন্ন সময় মার্কিন মদদ নিয়ে ধনিক শ্রেণী মাদুরোকে উৎখাত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়! আশপাশের দেশের মাধ্যমে সামরিক হুমকিও বৃদ্ধি করে, তবু ব্যর্থ হয়। অন্য সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন দেশে আগ্রাসন চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রে হামলা, গণহত্যা ও দেশের প্রধানকে গুপ্তহত্যার নজির যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একেবারে নতুন নয়।

১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রই পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের জন্য হামলা গণহত্যা দখলদারত্ব এগুলোর ওপরই তারা ভর করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইরাককে ছিন্নভিন্ন করা হয়। বারাক ওবামার শাসনামলে লিবিয়াকে ছিন্নভিন্ন করা হয়। তারও আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা ছিলেন, তারাও এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার নানা দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে। ভিয়েতনামে ১০ লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াতেও তাই। এছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) প্রকাশ্য মদদে বহু খুনি, মাদক ব্যবসায়ী ও স্বৈরশাসকদের বিভিন্ন দেশের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চিলির কথা বলা যায়। চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে মার্কিন মদদে সামরিক বাহিনী ক্যু করে উৎখাত করে। আলেন্দে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হন। এরপর জেনারেল অগাস্টো পিনোশে নামের এক কুখ্যাত স্বৈরশাসক ১০ বছর ক্ষমতা দখল করে রাখে। খুন, গুম, নির্যাতনের ভয়ংকর কাল সৃষ্টি হয়।

গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকরা যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক-বেসামরিক ও আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র বহু বছর ধরে চলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত হচ্ছে।

নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রহীনতা বলে যেসব প্রচার চালানো হচ্ছে এগুলো পুরোটাই প্রহসন। বরং এযাবৎকালে পৃথিবীর সব কুখ্যাত স্বৈরাচার যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়েই সেসব দেশের জনগণের সম্পদ লুট এবং দমন-পীড়ন স্বৈরশাসনের ভয়াবহ পর্ব তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী বলয়ের বাইরে গিয়ে যারাই স্বাধীনভাবে নিজস্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি তৈরি করার প্রচেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই তখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নানা অজুহাত দেখিয়ে আক্রমণ করেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারের আমলে দেখা গেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় এটা চরম আকার ধারণ করেছে এবং বর্তমানে কোনো রাখঢাক ছাড়াই এটা করা হচ্ছে।

নিকোলাস মাদুরোকে মাদক পাচারের অভিযোগে আটক করা হলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ভিত্তি নেই। অথচ সম্প্রতি হন্ডুরাসের মাদকসম্রাট খ্যাত ও দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, যাতে সেখানকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি বামপন্থীদের মোকাবেলা করা যায়। একুয়েডরেও মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনিজুয়েলার মাচাদোর মতো যে বিষাক্ত পুতুলগুলো তারা তৈরি করছে, সবই করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তথাকথিত শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও বলেছেন যে ভেনিজুয়েলায় যে সুযোগ-সুবিধা আছে তা থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রচুর আয় করতে পারবে। তিনি ক্ষমতায় এলে সব সুযোগ-সুবিধা মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেবেন! মারিয়া কোরিনা মাচাদো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এমন এক ব্যক্তি যিনি তার নিজের দেশে মার্কিন বাহিনীকে আক্রমণ করতে বলছেন ও আক্রমণ করার কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন!

মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে এসব চালানো কখনই সম্ভব হতো না যদি বিশ্বে আইনের শাসন ও ন্যায়-নীতি বহাল থাকত। সারা বিশ্বে মাদক ব্যবসায়ীদের বিশ্বজোট ও আগ্রাসন এবং গণহত্যার বিচার করতে হলে সবার আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদেরই বিচার করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার হওয়া দরকার যুদ্ধাপরাধ, সহিংসতা বৃদ্ধি, অপহরণ ও বিভিন্ন দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন উল্টো বিচার করছে মাদুরোর এবং এর ভেতর দিয়ে পুরো বিশ্বে একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো জাতিসংঘ একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যেখানে তাদের উচিত ছিল তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার, কিন্তু তারা ব্যর্থ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটা মেরুদণ্ডহীন সংঘ, যুক্তরাষ্ট্রের তল্পিবাহকে পরিণত হয়েছে। আশার বিষয় হলো সারা বিশ্বে এর প্রতিবাদে অসংখ্য মানুষ নেমে এসেছেন রাস্তায়। এটাই বর্তমান বিশ্বের ভরসার মূল জায়গা। এটা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এখানেও সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের নীলনকশা ও ফাঁদ পাতা আছে। এ লড়াইটা বৈশ্বিক। ফলে সবাইকে চোখ-কান খোলা রেখে এ লড়াইয়ে শামিল হতে হবে।

আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক