আজ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’। চব্বিশের আজকের দিনে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এটি বাঙালি জাতির স্মরণীয় একটি দিন। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় গত বছরের জুলাইয়ে, যা ধীরে ধীরে সরকার পতনের আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। এ ঘটনায় আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। আন্দোলন দমাতে সরকার ইন্টারনেট বন্ধসহ কারফিউ জারি করে। সরকার শিক্ষার্থীদের ধর পাকড় শুরু করে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্রলীগের নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি নারী শিক্ষার্থীরাও। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পিছু হটেনি। শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারের নির্যাতন ও হতাহতের ঘটনা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মনে গভীর নাড়া দেয়। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে থাকে। সারা দেশের নাগরিক শক্তির এক অসাধারণ ও দুঃসাহসী ঐক্য গড়ে ওঠে। এ রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। হাত-পা, চোখ হারানোসহ আহত হয়েছেন অন্তত ২০ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা। অবশেষে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আজকের দিনে পতন ঘটে বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের। সেদিনই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে, বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরে আসবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে। মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে উঠবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হবে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে, যাতে আর কখনো কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গত এক বছরে এ জায়গাগুলোয় তেমন লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়নি।
বিগত দেড় দশকের শাসনে ছিল অর্থনৈতিক নানা সংকট ও অনিশ্চয়তা। কয়েক বছর ধরেই স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, বিনিয়োগ খরা, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনাসহ অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে নিমজ্জমান ছিল। একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও শূন্যের কোটায় নেমে এসেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। বিগত সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। ফলে বর্তমান সরকারের গত এক বছরে বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও অর্থনীতিতে তেমন গতি ফিরে আসেনি, যা অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকে কঠিনতর করে তুলছে। ক্রমান্বয়ে গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা বেড়েছে। আমরা আশা করছি, এ সরকার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে এবং ক্ষত নিরাময় করে অর্থনীতিতে গতিশীলতা ও জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে যে ঐক্য গড়ে ওঠেছিল, সেই ঐক্যে ফাটল দৃশ্যমান। যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে তরুণরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, গত এক বছরে তার কতটা বাস্তবায়ন হলো তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বৈষম্য ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে তরুণরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গত এক বছরে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। এমনকি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী তরুণরা নানা গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্তও হয়ে পড়েছেন। বিগত সরকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়াটি ধ্বংস করে ফেলেছে। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা না থাকায় দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজমান থাকলেও আশা হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় আমরা এখনো উপনীত হইনি। তাই অর্থনীতিতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা অব্যাহত থাকুক।
ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণে ভর করে রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে। তবে দেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। গত জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। গত মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ শতাংশের বেশি। দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ এখনো স্বস্তির বার্তা পায়নি। সরকারের অন্যতম মূল কাজ ছিল মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া। কিন্তু এ কাজে সরকার এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী কষ্টে আছে।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় এক অংকের এ লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। নিকট অতীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এতটা ভাটা দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে আর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে অনেক আগ থেকেই আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটও কাটেনি। সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাত বিনিয়োগে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি এভাবে কমছে। অর্থনীতির মতো বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে রাজনীতিও। জাতীয় নির্বাচন ও আগামীর রাষ্ট্রক্ষমতার ধরন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন ক্রমে বাড়ছে। সচিবালয়ে বিক্ষোভ, আন্দোলনের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও (এনবিআর) নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি দেখা গেছে।
বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাল্টা শুল্ক’ শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য। পাল্টা শুল্ক আরোপের পর কয়েক মাস ধরে দেশজুড়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদসহ সচেতন মহলে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটি কমেছে। বাংলাদেশী পণ্যে নতুন করে যে পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর সমান বা কাছাকাছি। যদিও চীনের পাল্টা শুল্কহার এখনো চূড়ান্ত করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। তার পরও বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক কমানোর ঘোষণা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রফতানি পণ্যের তুলনামূলক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুল্কহার কমিয়ে আনার ব্যাপারে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রফতানি পণ্য ও গন্তব্যে বৈচিত্রকরণ জরুরি।
এ অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন নয়, এটি একটি ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূচনা। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন এ রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলব। বৈষম্যমুক্ত দেশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বৃহত্তর ঐক্য হোক জুলাইয়ের অঙ্গীকার।










