জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি হচ্ছে। ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটে এ জাতির জীবনে। অবশ্য ঘটনাটি অভূতপূর্ব হলেও অভাবিত নয়। কেন অভূতপূর্ব, আর কেনই বা অভাবিত নয় তার একটু ব্যাখ্যা হাজির করা যাক।

অভূতপূর্ব এ কারণে যে বাংলাদেশের জনগণ বা এ ভূখণ্ডের মানুষ অভ্যুত্থানের সঙ্গে পূর্ব থেকে পরিচিত হলেও ঠিক এ রকম অভ্যুত্থান তারা দেখেনি কখনো। বদরুদ্দীর উমর ২০২৪-এর ২৮ জুলাই দৈনিক পত্রিকা বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এ ভূখণ্ডে পাঁচটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সেগুলো হলো ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৫ ও ১৯৯০। তখনো ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হয়নি। সর্বজনে গণ-অভ্যুত্থানের কথা বললেই ১৯৬৯ ও ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানই হাজির হয়। গবেষক বদরুদ্দীন উমরের কথামতো ওই পাঁচ গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে যুক্ত করলে এ ভূখণ্ডের সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের সংখ্যা হয় ছয়টি। তার পরও আমরা বলছি, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এ অঞ্চলে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানগুলোর মধ্যে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

আমরা মনে করি, এর কারণ ২০২৪-এর বা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গঠন ও তাৎপর্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া অন্য সব গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে যদি বদরুদ্দীন উমরের কথা অনুযায়ী অভ্যুত্থান বলে মান্যতা দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে সেই অভ্যুত্থান ছিল একটা অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। সেই সরকার আদতে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নির্বাচিত কোনো সরকার ছিল না। কেন্দ্রে তো ছিলই না। উপরন্তু সেদিনের পূর্ববঙ্গে যে সরকার ছিল তাও ছিল ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের একটা ধারাবাহিকতা।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ১৯৭১-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল সেই সময়ের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে। বদরুদ্দীন উমরের কথামতো ১৯৭৫-এর ক্ষমতার পটপরিবর্তনকে অভ্যুত্থান বলা যায়। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানও ছিল সামরিক শাসক এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে।

কিন্তু ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, শেখ হাসিনা কিন্তু সামরিক শাসক ছিলেন না। কিন্তু তিনি স্বৈরতান্ত্রিকতা বা স্বৈর আচরণকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা ছিল সামরিক সরকারের চেয়েও ভয়ংকর ও প্রাণসংহারী। কোনো রাজনৈতিক দল যদি স্বৈরাচার হয়ে ওঠে তাহলে যে দেশ ও জাতির কতটা জগদ্দল পাথর হয়ে বসতে পারে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৫ বছরে তা নগ্নভাবে প্রকাশ হয়েছে। সামরিক সরকারের অনেক সীমবদ্ধতা থাকে, কারণ তাদের আগমন ঘটে ক্যান্টনমেন্টের মতো একটা বদ্ধ জায়গা থাকে। ব্যারাকই তাদের দুনিয়া। ফলে শাসন ক্ষমতায় তারা রূঢ় হলেও সর্বত্র নিজেদের ছড়িয়ে দিতে পারত না। কিন্তু শেখ হাসিনার জন্য বিশেষ সুবিধার জায়গা হলো, তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মতো দেশের প্রধানতম একটা রাজনৈতিক দলের প্রধান। ফলে সেই দল যখন ভোট হরণকারী, মানবতা লুণ্ঠিত, দুর্নীতিসর্বস্ব একটা স্বৈরশাসকে পরিণত হয়, তখন জনগণের পক্ষে অভ্যুত্থান ঘটানো ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। যেমনটা দেখলাম আমরা ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যেভাবে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিল তাদেরকে পরাস্ত করা রীতিমতো দুরূহ একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা আমরা ১৫ বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছি। আগের অভ্যুত্থানগুলোর অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি, রাজনৈতিক দলগুলো সংঘটনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের সবারই ছিল রাজনৈতিক পরিচয়। তারা নিজ নিজ ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেই গণ-অভ্যুত্থানকে এগিয়ে নিয়েছেন—নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের বৈশিষ্ট্য একেবারেরই ভিন্নধর্মী। এ আন্দোলনে নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের কারোরই সেই অর্থে রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না, থাকলেও সেটা উচ্চকিত নয়। তারা কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কিংবা কোনো ছাত্র সংগঠনের তরফে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি কিংবা যুক্ত হননি। আমরা মনে করি, এ আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছাত্রদের তরফে স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্ব দেয়া এবং যার যার জায়গা থেকে যুক্ত হওয়া। বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে, কোটাকে অপসারণের দাবিতে এ আন্দোলন ছাত্রদের দ্বারা সংঘটিত হলেও দ্রুতই তা জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তির জায়গা ছিল, ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ স্পৃহা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকি সব দলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এভাবে সংঘটিত হয়েছিল বলেই ৩৬ জুলাই একজন রাজনৈতিক স্বৈরাচারের পতন ও পলায়ন দেখেছে বাংলাদেশ, দেখেছে গোটা বিশ্ব। আমরা মনে করি, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে সংঘটিত এ অভ্যুত্থান আক্ষরিক অর্থেই এ দেশের জন্য অভূতপূর্ব একটা ঘটনা।

সেদিন ছাত্র-জনতা জীবনবাজি রেখে এ আন্দোলনে যদি শরিক না হতো তাহলে বাংলাদেশ আজ যে নতুন আকাঙ্ক্ষার পথে হাঁটছে তা আদতে কোনো দিন সম্ভব হতো কিনা তা বলা দুরূহ। কারণ ক্ষমতায় ছিল রাজনৈতিক স্বৈরাচার। তারা সহজেই দেশব্যাপী জারি রাখতে পেরেছিল স্বৈরতন্ত্রের কলকব্জা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পদে বসিয়েছিল তল্পিবাহকদের। সেখানে থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব ছিল বৈকি। এ জাতি নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান যে ছাত্রসমাজ তাদেরকে নিরাশ করেনি, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সেই সময় ২০২৩-এর শেষাশেষি এবং ২০২৪-এর মধ্যবধি দেয়ালে কান রেখে এমন কথাও শোনা গেছে, যা রীতিমতো শিহরিয়ে ওঠার মতো। শাহবাগ-কাঁটাবনের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ও আলাপে উক্ত হয়েছে যে দেশ দ্রুত একদলীয় গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। ২০২৪-এর জাতীয় নির্বাচনকে যদি গত দুই নির্বাচনের মতো কোনোভাবে করে ফেলা সম্ভব হয়, তাহলে ২০৩০-এর শেষাশেষি চীনের রাজনৈতিক মডেলের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ। আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজ, দেশপ্রেমিক জনতা সেই বিপদের হাত থেকে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে এটা অভূতপূর্ব ঘটনা বলে আমরা মনে করি।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অভূতপূর্ব হলেও অভাবিত নয়। কেন বলেছিলাম এ কথা, কারণ আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের অতীত গৌরবের। এ জাতি—এ মাটির মানুষ হয়তো অন্যায় সহ্য করে কিন্তু সেটা মেনে নেয় না। দীর্ঘ সময় ধরে সেটা সহ্য করে না। সে অন্যায়কারীকে, শোষককে, জালিমকে শোধরানের সুযোগ দেয়। কিন্তু না শোধরালে ছুড়ে ফেলে যেমনটা আমরা অতীতে দেখেছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও যেটা দেখা গেল আক্ষরিক অর্থেই স্পষ্ট করে। এ কারণেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বৈশিষ্ট্যে ও বিশিষ্টতায় অভূতপূর্ব হলেও অভাবিত নয়।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের এ রকম সোনালি অতীত থাকার পরও কেন আমাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না? কেন আমরা গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাই? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদেরকে নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা কি সেই কাজটা যথাযথভাবে করতে পারব, নিদেনপক্ষে সূচনাটুকু? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বছর পূর্তিতে আমরা কি আশাবাদের কোনো জায়গা দৃশ্যমানভাবে হাজির-নাজেল হতে দেখছি?

আমাদের সংকটটা আসলে কোথায়, সেটা চিহ্নিত করা এবং দূর করার লক্ষ্যে কাজ করা কি, নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি নয়? আমরা মনে করি, আমাদের সংকটটা আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায়। সেখানে আমরা কার্পেটের তলায় সব আবর্জনা (পড়ুন সংকট) লুকিয়ে রেখে সমাধানের পথে হাঁটছি, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছি।

আমরা এমনই একটি জাতি, যারা নিজেদের নবজাগরণকেই চিহ্নিত করেনি, যাপিত জীবনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে আমাদের স্পার্কের মতো-হঠাৎ আলোর বিকিরণের মতো অর্জন থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চর্চা ও যাপনে সেই আলোকায়ন নেই। যে আলোকায়ন আমাদেরকে গণতন্ত্রী করবে, সুশাসন দেবে, সামাজিক সুরক্ষায় রাখবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে হাঁটােব, মানবিক বাংলাদেশকে সর্বাবস্থায় দৃশ্যমান রাখবে। আর এসবে নিশ্চিতে নবজাগরণ হতে পারে আমাদের আশ্রয়, বাঙালি মুসলমানের কোড অব লাইফ। এ কারণে বোঝা দরকার বাংলাদেশের নবজাগরণকে।

দুই.

বেঙ্গল রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণ যখন নানা সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপে অস্তায়মান তখন শুরু হয় বাংলাদেশের নবজাগরণ, যার ভরকেন্দ্র ছিল ঢাকা। পরিধি ছিল ১৯০৫-এর বঙ্গ বিভাজন কালের পূর্ববঙ্গ। যে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে লর্ড কার্জন চেষ্টা করেছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বেরিয়ে পৃথক একটা প্রদেশ গঠনের। যে চেষ্টা রহিত হয় ১৯১১ সালে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনা কখন শুরু হয় তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। আমরা মনে করি, এর উন্মেষ ঘটতে থাকে ঊনিশ শতকের শেষাশেষিতে। বঙ্গ বিভাজনের চেষ্টা ও রদ করার ঘটনা এর উন্মেষকে দ্রুততর ও অনিবার্য করে তোলে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও বিকাশের দিকটা এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগ্রত হতে থাকে। এ জাগ্রত হওয়ার সময় ১৯২১-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যা বাংলাদেশের নবজাগরণের যথার্থ উন্মেষ ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আমরা মনে করি, সেদিনের পূর্ববঙ্গের ঢাকায় খ্রিস্টাব্দ ১৯২১ থেকে বাংলাদেশের নবজাগরণ শুরু হয় এবং তিন পর্বে সেটা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়।

প্রথম পর্ব ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত।

দ্বিতীয় পর্ব ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত।

তৃতীয় পর্ব ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১।

প্রথম পর্বে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ নবজাগরণকে শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে যথাযথ নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের প্রথম পর্বের নায়করা সংগঠিত হন ‘শিখা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সাহিত্য সমাজকে ভরকেন্দ্রে রেখে। দ্বিতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, বাংলা ভাষার ন্যায্য মর্যাদার প্রশ্নে। তৃতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন ছয় দফাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষায়।

মধ্যযুগে বা চতুর্দশ শতকে ইতালীয় বা ইউরোপের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপজুড়ে অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অবশ্য সেই সময়ের ঘটনাবলি ও বাস্তবতা ছিল একেবারে ভিন্ন। এ কারণে মোটাদাগে বিষয়টিতে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হলেও বাংলাদেশের নবজাগরণের সার্থকতা ও বিরল-ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো, এ জাগরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে তৃতীয় বিশ্বের একটা ভূখণ্ডকে সিকি শতাব্দীর মধ্যে দুইবার এবং দ্বিতীয়বার সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনারহিত। বাংলাদেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁকে যদি ইতালীয় বা ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোকে অন্বেষণ করা হয়, তাহলে এ রেনেসাঁ সম্পর্কেও সংশয় ও বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ হাজির-নাজেল হতে পারে। প্রত্যেকটা রেনেসাঁয় স্বতন্ত্র ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। কোনো রেনেসাঁয় অন্য কোনো রেনেসাঁর সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে সাযুজ্য ও সংগতিপূর্ণ হবে এমন কোনো কথা নেই। কেননা স্থান, সময়, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মের প্রভাব, ঐতিহ্যচেতনাসহ সবকিছুই ভিন্নধর্মী ও তাৎপর্যবাহী। আমরা শুধু তার গড়ন, গতি-প্রকৃতি, লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার ওপর আলোকপাত করতে পারি।

ইতালীয় রেনেসাঁ যেমন পুরো ইউরোপকে আলোড়িত করেছিল। বঙ্গীয় রেনেসাঁ কলকাতায় সংঘটিত হলেও তার ছোঁয়া লাগেনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। ভারতীয় ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার বেঙ্গল রেনেসাঁর যে তিনটি দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে এটিকে অন্যতম জ্ঞান করেছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের শক্তি হলো, এটি ঢাকায় সংঘটিত হলেও তার ঢেউ ছড়িয়ে প্রড় প্রথম পর্বে পুরো পূর্ববঙ্গে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে তদানীন্তন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে। আমাদের স্মরণে রাখা জরুরি যে আমাদের আজকের যে বাংলাদেশের মানচিত্র, সেটা পাকিস্তানের সময়ে পূর্বপাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ নামে একই রকম ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময় বঙ্গ বিভাজনের মধ্য দিয়ে যে পূর্ববঙ্গকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই পূর্ববঙ্গ কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে হুবহু এক নয়। ফলে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনায় বা উন্মেষ পর্বে শুধু বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানরাই যুক্ত হননি, অবিভক্ত বঙ্গের বাঙালি মুসলমান মাত্রই যুক্ত হয়েছিলেন, বিশেষ করে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা।

হাসান হাফিজুর রহমানের এক লেখায় এ কথার কিছুটা ইঙ্গিত মেলে। তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকা প্রকাশের কারণ সম্পর্কিত এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘পাকিস্তানের আগে বাঙালি মুসলমান স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় উত্তেজিত ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পরেই দেখা গেল স্বাতন্ত্র্যই মুক্তি নয়। দুর্বল বাঙালি ন্যাশনালেটি প্রবল পাঞ্জাবি ন্যাশনালেটির বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জায়গায় নতুনভাবে দেখা দিল আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।’

এ ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’ই হলো বাংলাদেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রতিপাদ্য বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মানবতাবাদ, ইহজাগতিকতা, উদারনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় কুসংস্কার মুক্তি, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার চর্চা, ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ ও সম্পদের সুষম বণ্টনের প্রত্যাশা পূরণ।

বাংলাদেশের নবজাগরণের শুরু ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। এ সূত্রে সেই সময়ের বিদ্বৎসমাজের একট বড় অংশের এখানে বসবাস ও একত্র হওয়ার সুযোগ ঘটে। যার কল্যাণে ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। এর মুখপাত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। যাদের স্লোগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। উল্লেখ্য, মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ছিল ‘ইউরোপের নবজাগরণ-ইতালীয় রেনেসাঁ, উনিশ শতকের নবজাগরণ-বঙ্গীয় রেনেসাঁ, তুরস্কের নবজাগরণ-কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে সংঘটিত মুসলিম রেনেসাঁ।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর নেতেৃত্বে ছিলেন আবুল হুসেন। সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন অনেকেই। উল্লেখযোগ্যরা হলেন: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ প্রমুখ।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জানাচ্ছেন, বয়সে ও শরীরে বড় হয়েও কোনো কোনো মানুষ শিশু থেকে যেতে পারে। শুধু মানুষ না, কোনো কোনো জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এ সত্য। তারা হাজার বছরের হয়েও জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, চিন্তা-চেতনায় শিশু থেকে যায়। সায়ীদ স্যারের এ কথার নির্যাস নিয়ে কী বলা যায়, আমরা যদি প্রকৃতার্থেই সাবালকত্ব অর্জন করতে চাই তাহলে আমাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশকে নবজাগরণের পথে হাঁটতে হবে। যে আকাঙ্ক্ষার বীজ রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার গভীরে।

তিন.

রাজা যায় রাজা আসে, জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না—এ রকম একটা সংলাপে কার্টুনিস্ট এমএ কুদ্দুস একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে, জনগণের পক্ষে একজন জ্যোতিষী হাত দেখাতে গিয়ে উপর্যুক্ত সংলাপটা আওড়িয়েছেন। এর উত্তরে জ্যোতিষী বললেন, রাজা কী করবে, তোমার তো হাতের রেখাই নেই। অর্থাৎ হাতে রেখা নেই বলে জনগণের ভাগ্যেও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। জ্যোতিষীও যে ফ্যাসিস্ট হতে পারে ওই সংলাপে কুদ্দুস সেটা দেখিয়েছিলেন।

ঠিক একইভাবে আমরা তো এ কথাও বলতে পারি, ‘স্বৈরাচার যায় স্বৈরাচার আসে, জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।’ মাঝখানে অভ্যুত্থান নিয়ে যায় আমাদের সোনার ছেলেদের। শহীদের সংখ্যা বাড়ে। তবুও গণতন্ত্র থেকে যায় ‘সোনার পাথরবাটি’ রূপে। আমাদের গণতন্ত্র যেন ‘সোনার হরিণ’। তাকে পাওয়ার জন্য আমরা জীবন দিই, মিছিলে নামি। তবুও সে অধরা থেকে যায়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আমরা কায়মনো এ প্রার্থনা জারি রাখতে চাই, আমাদের সব আশঙ্কা দূর হোক। আমরা সত্যসত্যই নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণের পথে হাঁটি। এ মাটির সব শহীদের আত্মাকে শান্তি দিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ ছাড়া এ মুহূর্তে আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই।

‘এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা/ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আছে যত সব আশা।’ আমাদের আশা, এখন একটা নবজাগরণের আলোয় নতুন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণ। যেখানে ধ্বনিয়া উঠিবে-দৃশ্যমান হবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার মন্ত্র—সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মুক্ত এক বাংলাদেশ।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: চিন্তক, গবেষক ও সাংবাদিক।