দেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা অন্যতম কৃষিপণ্য আলু। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ৭৫-৮০ লাখ টনের মতো এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর উৎপাদনও ঊর্ধ্বমুখী। আলু উৎপাদনে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে রংপুর। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের জমি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বর্তমানে দেশে মোট উৎপাদিত আলুর ১৫ শতাংশ রংপুরে হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রংপুরে সর্বোচ্চ ১৩ লাখ ৪ হাজার ৩১৭ টন আলু উৎপাদন হয়। এর পরের অর্থবছরে আলু উৎপাদন হয় ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৭৬ টন। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে কিন্তু আবাদ হয়েছে ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টরে। সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৭২৪ টন। কৃষি বিভাগের এসব তথ্যে টানা তিন অর্থবছর আলু উৎপাদনে রংপুরের এগিয়ে থাকার চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে এটি মুদ্রার এক পিঠ। এর বিপরীতে কিছু সংকটও রয়েছে।

উৎপাদনে শীর্ষে থাকা রংপুরে মোট উৎপাদনের প্রায় ৭৮ শতাংশ আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। এতে কী ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় এ অঞ্চলের কৃষকের সেটিও অজানা নয়। রংপুর কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ জন আলুচাষী রয়েছেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি মিলে হিমাগার রয়েছে মাত্র ৪০টি। এসব হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব মাত্র ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টন আলু। ফলে উৎপাদিত আলুর বেশির ভাগই সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এতে মাঠ পর্যায়েই নিরুপায় কৃষকরা কম দামে আলু বিক্রি করে লোকসানের মুখে পড়েন।

কিন্তু কেবল আলু সংরক্ষণ নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন না এ অঞ্চলের কৃষকরা। অভাব রয়েছে বীজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগারেরও। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দুটি বীজ সংরক্ষণাগার রয়েছে রংপুর ও কুড়িগ্রামে। ১৯৭১ সালের পর নির্মাণ করা প্রতিটি সংরক্ষণাগারের ধারণক্ষমতা এক হাজার টন, যা কৃষি অঞ্চলে বীজ সরবাহের জন্য পর্যাপ্ত নয়। মানসম্পন্ন আলুবীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণের লক্ষ্যে রংপুরে দুই হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আরো একটি হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিএডিসি। তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হলেও সেটি শেষ হয়নি। তাই বিএডিসির ডিলারদের আশঙ্কা রয়েছে, আগামী মৌসুমেও কৃষক পর্যায়ে বীজ সংকট দেখা দিতে পারে।

যদিও বিএডিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, এরই মধ্যে হিমাগার নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আরো তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমের আগেই নির্মাণকাজ শেষ হবে। কিন্তু একটা হিমাগার নির্মাণে এতটা কালক্ষেপণ বিএডিসির মনোযোগের অভাবকে নির্দেশ করে। রংপুরের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। চলমান হিমাগারের নির্মাণ শেষ না হওয়া নিয়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা বিএডিসি (নির্মাণ) রংপুর জোন থেকে জানানো হয়েছে যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে হিমাগার নির্মাণ করতে পারেনি। সুতরাং ঠিকাদার নিয়োগের আগে তাদের কাজের সম্ভাব্যতা যাচাই করাও জরুরি।

আবার আলু রোপণ মৌসুমে বিএডিসির বিদ্যমান এক হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারের বীজ দিয়ে কৃষকের ব্যাপক চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আলু উৎপাদনখ্যাত রংপুরে মানসম্পন্ন বীজ বাইরের জেলায় অবস্থিত হিমাগার থেকে সংগ্রহ করতে ডিলার ও কৃষককে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। ডিলার ও কৃষকদের প্রত্যাশা রয়েছে হিমাগার নির্মিত হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে।

রংপুরের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে বীজ বা আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকাটা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকিও বটে। কয়েক মাস পরই আবার আলুবীজ রোপণ শুরু করবেন কৃষকরা। কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় বীজের চাহিদা বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ টন। সেখানে সরকারিভাবে সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার টন। ডিলারদের মাধ্যমে এসব জেলায় কৃষক পর্যায়ে আলুবীজ সরবরাহ করবে বিএডিসি। এটিও অপর্যাপ্ত।

গত বছর চাষের মৌসুমে আলুবীজের সংকট ছিল। আবার আলুবীজ সংগ্রহের জন্য বাড়তি দাম গুনতে হয়েছিল কৃষককে। রংপুরে ২০২৩-এর তুলনায় ২০২৪ সালে দ্বিগুণ দামে বীজ সংগ্রহ করতে হয়েছিল। গত বছর ১০০-১১০ টাকায় আলুবীজ কিনতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকরা যেটি এর আগের বছর ছিল ৫০-৬০ টাকা কেজি। উপরন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সার-কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সব মিলিয়ে গত বছর আলুর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর বাজারদর কমে যায়। এ কারণে কৃষকদের ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছিল। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলুর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১০ লাখ টনের কাছাকাছি। এ হিসাবে চাহিদার চেয়ে আলু উৎপাদন হয় ৩০-৩৫ লাখ টন বেশি। চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদনের পরও গত বছর চাষের মৌসুমে আলুবীজের তীব্র সংকট দেখা দেয়ায় চড়া দামে কিনতে হয়েছে কৃষককে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কৃষকরা জানিয়েছিলেন, সরকারিভাবে বরাদ্দ কম থাকায় ইচ্ছামতো আলুবীজের দাম বাড়ানোর সুযোগ পায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। দেশের একমাত্র সরকারি বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ বরাদ্দের পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করলে কৃষকদের এ অভিযোগের সত্যতা মেলে। বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, রংপুর কৃষি অঞ্চলে আলু চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ২০২ হেক্টর। উল্টো গত ছয় বছরে বীজের সরকারি বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১ হাজার ৪২৮ দশমিক ৭৫৯ টন। গত মৌসুমে এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আলুবীজের সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন। সেখানে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ২ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৩২ টন। আবার বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, গত বছর আলুর উৎপাদন মৌসুমে কৃষক ও মজুদকারীরা প্রতি কেজিতে তুলনামূলক বেশি টাকা লাভ করায় আগামী বছরের জন্য ব্যাপক হারে আলু চাষ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেড়েছে কৃষকের আগ্রহ। চাষের চাহিদা বাড়ায় আলুবীজের সংকট তৈরি হয়েছে এবং দামও বেড়েছে। সুতরাং একদিকে চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে বরাদ্দ কমেছে। এ সুযোগ অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের জন্য কাজে লাগিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ আবশ্যক। নয়তো আলুবীজের সংকট, বীজ ও আলু সংরক্ষণের অভাব এবং চড়া দাম ও সরবরাহ সংকটের অভাবে কৃষক আলু চাষে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।