রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনের পরিধি ছিল তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত, বায়ান্ন বছরের। জীবনের এ ছোট্ট পরিসরে তার চিন্তা ও কর্মে প্রাধান্য পেয়েছে শিক্ষা-সাহিত্য-সমাজ। তবে সর্বাগ্রে ছিল নারী স্বাধীনতার অভিপ্রায়-নারী শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন অবরোধ প্রথা ও ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে নারী শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নারীরা জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শিক্ষার অভাবে নারীরা আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রত্যয় অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা তাদের অগ্রগতির অন্তরায়। তাই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নারী শিক্ষার প্রসারে। তার কাছে ‘শিক্ষাই’ নারীর মুক্তির প্রথম ধাপ।
নারী জাগরণের প্রতীক বেগম রোকেয়ার প্রয়াণের পর ‘রোকেয়া স্মরণে’ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে তৎকালীন মাসিক মোহাম্মদী। এ ক্রোড়পত্রের শেষের দুই লাইন ছিল এমন—‘যে-লোকে প্রয়াণ আজিকে তোমার—এই কোরো ফরিয়াদ/ধরার ধূলায় ভিত্ গড়িলে-পাকা হয় বনিয়াদ’। বর্তমানে দাঁড়িয়ে অন্তত বলা যায়, বেগম রোকেয়া নারী মুক্তির যে ভিত গড়েছিলেন, কালক্রমে সেই ভিত অনেকটাই মজবুত হয়েছে। তিনি যে সুলতানার স্বপ্ন বইয়ের পাতায় চিত্রায়িত করেছেন তা আজও নারী মুক্তির অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। অবরোধবাসিনীদের আলোর পথ চিনিয়েছেন।
যদিও এ পথ এখনো সেভাবে মসৃণ হয়নি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নারীদের সংগ্রামের গল্প যুগে যুগে একই রয়ে গেছে। তবু নারীর সমঅধিকার আদায়ের যে আন্দোলন আজও চলছে, তার ভিত্তি রোকেয়ার ধ্যানধারণায় প্রতিষ্ঠিত। নারী শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার অর্জনের সংগ্রামে তাই বেগম রোকেয়া চিরকাল প্রাসঙ্গিক। একই কথা প্রযোজ্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। বর্তমান বাংলাদেশ রোকেয়ার ‘লেডিল্যান্ড’ হয়ে উঠতে না পারলেও নারী অগ্রগতির যে চিত্র আমরা দেখি, তা তার স্বপ্নেরই একটি প্রতিফলন। এ স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে নারীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত ও কৌশলী পদক্ষেপ দরকার। কারণ দেশের মোট জনসংখ্যা হিসাবে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা ৩১ লাখ ৯০ হাজার বেশি বলে ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’-এ উঠে এসেছে। সুতরাং মোট জনসংখ্যার এত বিপুল একটা অংশকে আর্থসামাজিক দিক থেকে এগিয়ে নিতে না পারলে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠবে। এর পূর্বাভাস গত অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়ন হালনাগাদ তথ্য থেকে কিছুটা পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে অগ্রগতি সত্ত্বেও বৃহত্তর উৎপাদন খাতে নারী-পুরুষের ব্যবধান অনেক বেশি। যদি শুধু উৎপাদন খাতে আরো বেশিসংখ্যক নারী কাজ পান, তাহলে বাংলাদেশে উৎপাদন ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এছাড়া আরো বলা হয়েছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৭ শতাংশেই স্থির হয়ে আছে। সুতরাং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হারটি বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা প্রয়োজন।
নারীদের শ্রমবাজারে নিযুক্ত হওয়ার অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হলো একটা বড় অংশই নিম্ন মজুরির অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। যেমন কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজে সম্পৃক্ত। আরেকটি বড় অংশ পোশাক শিল্পে কাজ করে। শ্রমিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণের হার সীমিত। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আছেন মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। উপসচিব ও সচিব পর্যায়ে এ হার ১ শতাংশ বা তারও কম। যদিও দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারী ও পুরুষের অবদান প্রায় সমান।
এর বিপরীতে রয়েছে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সুযোগের অসম বণ্টন। বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ সালের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশে নারী-পুরুষের বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে বলে সে প্রতিবেদনে উঠে আসে। ফলে ডব্লিউইএফের বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে চলতি বছরে বড় পতন হয়েছে বাংলাদেশের। বার্ষিক এ সূচকে গত বছরের তুলনায় ৪০ ধাপ পিছিয়ে ১৪৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ৯৯তম।
স্বাভাবিকভাবেই লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে না পারলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিযুক্ত হওয়ার প্রতি আগ্রহ হারাবেন অদূর ভবিষ্যতে। তাছাড়া বাস্তবতা হলো অধিকাংশ শ্রমবাজারে কর্মরত নারীদের ‘ডাবল শিফটে’ কাজ করতে হয়—ঘরেও এবং বাইরেও। অতিরিক্ত কাজের চাপও নারীদের উৎপাদনশীল সক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা। এসব কারণে আবার দেখা যায় অনেক সময় নিয়োগদাতারা নারীদের কাজে নিয়োজনের বিষয়ে দ্বিধা পোষণ করেন। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নেই। তার চেয়েও বড় কথা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথেই নারী সুরক্ষিত নয়। এমনকি চার দেয়ালের মধ্যেও নারীরা অরক্ষিত। প্রকৃতপক্ষে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে এসব সমস্যার গোড়া চিহ্নিত করতে হবে। তারপর সে মোতাবেক সমাধানের পথে এগোতে হবে।
তবে সবকিছুর আগে নারীর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধ করা প্রয়োজন। নারী শিক্ষিত না হলে, সচেতন না হলে নারীর যে ঐতিহ্যগত ভূমিকা পরিবারের প্রতি, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাও সেটিও যথাযথভাবে পালনের অন্তরায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে নারীকে সচেতন করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি জরুরি বিষয় হলো সমাজে নারী ব্যতীত যে বড় অংশটি রয়েছে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। তাদের নারীর প্রতি মর্যাদাশীল ও সহনশীল হতে হবে। কর্তৃত্ববাদী মনোভবের জায়গা থেকে অনেক সময় নারীরাও নারীদের পথে বাধা সৃষ্টি করে। সেসব নারীকেও সহনশীল হতে হবে।
বেগম রোকেয়ার প্রকৃত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে হবে এবং নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আজকের বাংলাদেশ বেগম রোকেয়ার সেই স্বপ্নের আলোকেই গড়ে উঠছে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এখনো অনেক পথ বাকি।










