আজ বিজয় দিবস। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে অবসান ঘটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় এক স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মদানকে ও নিবেদিত জাতীয় নেতাদের। এ যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্যমুক্ত ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে নিজেকে পরিণত করা। তাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় উদযাপনের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বপ্ন কতটা পূরণ হলো তা মূল্যায়ন করা।

সূচনালগ্নে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পশ্চাৎপদ। সম্পদের প্রাচুর্য তেমন ছিল না। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের পুঁজিপতি ও শোষক শ্রেণী দেশ থেকে সম্পদ পাচার করেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। উপরন্তু যুদ্ধকালীন এক ধরনের ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছে যায় দেশ। সে অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। এরপর পেরিয়েছে ৫৩ বছর। ২০২৪ সালে এসে আমাদের বলার মতো অনেক অর্জন, সফলতা ও উন্নয়নের গল্প রয়েছে। কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, যে সমঅধিকারের রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় দেশ মুক্ত হলো, আজও তা অপূরণীয় রয়ে গেছে। এখানে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাও বারবার ব্যাহত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিশেষত সর্বশেষ বিদায়ী সরকারের আমলে। আইন-শৃঙ্খলার স্থান দখল করেছে দলীয় শাসন, অপশাসন ও অনিয়ম-দুর্নীতি যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রের সর্বত্র। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাভোগী হয়েছে মুষ্টিমেয় ধনকুবের। এর সুবিধার ন্যায্য ও সুষম বণ্টন হয়নি। টানাপড়েনের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক কষ্টে দিন যাপন করছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এ বিজয়ের দিনে তাই অঙ্গীকার হোক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির নিরাময়। তাছাড়া ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সূত্রপাত হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। এখনই সময় নতুন অঙ্গীকারের পথে হাঁটার।

বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২৮ মাস ধরে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশে। আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে। এদিকে যে হারে দাম বেড়েছে, সে হারে বাড়েনি মানুষের আয়। ফলে দেশে প্রকট হয়েছে আয়বৈষম্য। এতে স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যপণ্যের তালিকা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে শিক্ষিত ও উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যানুসারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন। মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। বাকি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার থাকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট চাকরির প্রতি ঝোঁক এবং কৃষি বা শিল্প খাতে কিংবা স্ব-উদ্যোগে কাজ করার অনীহা ও দক্ষতাহীনতা শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে।

এদিকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়নি। বিবিএসের হিসাবে, এক দশক ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বিনিয়োগ ২২-২৩ শতাংশেই আটকে আছে। এ সময় রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে যাদের রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এসব ব্যবসায়ী দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে এবং পাচার করেছে বিপুল অংকের অর্থ। লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তীব্র হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। উপরন্তু গত ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের মতো ঘটনায় অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এখনো পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়নি। এরূপ রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্তরায়। আর কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনই টেকসই হয় না। বরং দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বাস্তবতায় অর্থনীতির নিরাময়ের পথে হাঁটতে না পারলে তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরো কঠিন হবে।

দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বিবিএসের তথ্য অনুযাযী, ২০১৯ সালে দেশে ৫০-৬৫ বছর বয়সের মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এ জনগোষ্ঠী যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির অনুকূলে থাকবে, জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাদের উন্নত স্বাস্থ্য সুবিধা দিতে হবে। কারণ বয়স বাড়লে সাধারণভাবেই রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। এছাড়া প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবন সুরক্ষায় পেনশন, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে কর্মপরিবেশ ও পরিবেশগত সূচকের অগ্রগতি নিয়েও। কারণ বর্তমানে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো বায়ুদূষণ। আবার ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই আমাদের। আর এ বছরও ডেঙ্গুর পিক সিজন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়াই পার হয়েছে। অথচ একদিকে যেমন সুচিকিৎসার অবকাঠামোর অভাব রয়েছে, চিকিৎসাও হয়ে ‍উঠেছে বেশ ব্যয়বহুল। মানুষের স্বাস্থ্য খাতে পকেট ব্যয় বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ। অথচ বিজয়লগ্নে বাংলাদেশ হতে চেয়েছিল একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র যা এত বছর পরও সম্ভব হয়নি। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প করা হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনমান ও পরিবেশ এখানে উন্নত হয়নি। বরং চলমান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী। প্রতিদিন সড়কে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অবৈধ ভবনে আগুনে মানুষ পুড়ছে। উচ্চ মূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ হারাচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস হারিয়েছে দেশের চিকিৎসা খাতের ওপর। আবার বর্তমান ভিসা জটিলতায় পাশের দেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে যখন অর্থনীতির ক্ষত সেরে উঠবে। দেশের মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে পৌঁছে দেয়া যাবে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের বিজয় দিবসে এ প্রত্যয় জাগ্রত হোক—এটিই প্রত্যাশা।