রাজধানীবাসী যানজট ও জনদুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না। এ অসহনীয় যানজটের মূল কারণ শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোয় রাস্তার দুই পাশে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং ও ফুটপাত দখল। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজার। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কার্যালয়। এসব ভবনকে ঘিরে রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ পার্কিং। শুধু কারওয়ান বাজারই নয়, রাজধানীর একাধিক ব্যস্ততম স্থানে ফুটপাতের ওপরও প্রাইভেট কার কিংবা মোটরসাইকেল পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িও আইন অমান্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয় সড়কগুলোয়। ব্যস্ততম সড়কের দুই পাশে দিনভর অসংখ্য পার্কিংয়ের কারণে গাড়ি চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে এসব এলাকায়। আবার ফুটপাত হকারের দখলে থাকায় পথচারী চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটছে। পথচারীরা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। ব্যস্ততম এলাকার যাতায়াতকারীদের ভোগান্তির শেষ নেই। নির্ধারিত স্থান ব্যতীত যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো সুযোগ না থাকলেও সড়কেই অবৈধভাবে পার্কিং জোন গড়ে তোলা হয়েছে। জনদুর্ভোগ কমাতে ও যানজট নিরসনে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০-২৫ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় শহরে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সড়ক আছে। দুই কোটির বেশি মানুষের একটি নগরীতে জনসাধারণের চলাচলের জন্য সড়ক প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অপ্রতুল সড়ককে যান চলাচলের জন্য আরো কঠিন করে তুলেছে রাস্তার দুই পাশে অবৈধ পার্কিং। যান চলাচলের জন্য অপর্যাপ্ত সড়কের একটি অংশ দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। ঢাকার আয়তনের তুলনায় যে সড়ক থাকার কথা আছে তার এক-তৃতীয়াংশ এবং এক-তৃতীয়াংশ আবার ব্যবহার করা যায় না। রাজধানীর সিংহভাগ ফুটপাতও দখল করে রাখে প্রাইভেট কার। রাজধানীর বেশির ভাগ রাস্তার পাশে যেসব দোকান, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন রয়েছে, তাদের নিজস্ব কোনো পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে রাস্তার অর্ধেকটা তারা দখলে নিয়ে গাড়ি পার্কিং করেন।
রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফুটপাত যা আছে তার বেশির ভাগই হয় অবৈধ দখলে, নয়তো ব্যবহার অনুপযোগী। অধিকাংশ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস যেমন নেই, তেমনি এসব অবকাঠামোর গুণগত মান এবং অবস্থান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলোও পথচারীবান্ধব নয়। প্রধান সড়কগুলোয় মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে পথচারীদের হাঁটার পথ।
রাজধানীর যেসব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অফিসের কার্যালয় রয়েছে, সেখানে অধিকাংশের নিজস্ব গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ভবন নির্মাণের সময় পার্কিং ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে কর্মী ও দর্শনার্থীর গাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন সড়ক বা ফুটপাতে পার্কিং করতে হচ্ছে। অফিসের সামনে বা আশপাশের সড়কের দুই পাশে গাড়ি রেখে দেয়া হয়, যা যান চলাচলে সরাসরি বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এছাড়া নতুন ভবন তৈরির অনুমতি দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পার্কিং স্পেস যাচাই না করেই ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোয় অফিস, শপিং মল ও সুপারমার্কেটের সামনে ও আশপাশের রাস্তার দুই পাশে অবৈধভাবে এলোপাতাড়ি গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে। এসব এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় অসহনীয় যানজট লেগে থাকে। ফলে নগরবাসীর কর্মঘণ্টা নষ্ট ও মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অসহনীয় ভোগান্তি।
সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ গাড়ি পার্কিং উচ্ছেদ ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে সবচেয়ে জরুরি কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। পথচারীদের ফুটপাত, রাস্তা পারাপারের ক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাসগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখতে হবে। সড়ক থেকে অবৈধ গাড়ি পার্কিং উচ্ছেদ করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ঢাকার সিংহভাগ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধের মাধ্যমে যানজট হ্রাস ও যানবাহন চলাচলের গতি বৃদ্ধি, পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে খসড়া নীতিমালা-২০১৯ প্রণয়ন করেছিল ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। যদিও জনগুরুত্বপূর্ণ সেই নীতিমালা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জানা গেছে, সেটি এখনো মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এ থেকে সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট। অবৈধ পার্কিং বন্ধে এ খসড়া নীতিমালা-২০১৯ দ্রুত বাস্তবায়ন ও কার্যকর করা উচিত সরকারের।
ঢাকায় যত ফুটপাত বিদ্যমান, তার একটা বড় অংশ অবৈধ দখলে। রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত না হওয়ায় হাঁটার অনুপযোগীও হয়ে আছে অনেক ফুটপাত। শুধু ফুটপাত নয়, ঢাকায় পথচারীরা বিড়ম্বনায় পড়েন রাস্তা পার হতে গিয়ে। বেশির ভাগ সড়কেই নেই প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিং। আবার যেখানে জেব্রা ক্রসিং আছে, সেগুলোও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বিলীন হওয়ার পথে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ ও বিভিন্ন পয়েন্টে আছে একাধিক আন্ডারপাস। যদিও সঠিক অবস্থানে না থাকা ও ব্যবহারজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে পথচারীদের অনেকেই এসব ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার করতে চায় না।
স্রেফ নামমাত্র নয়, নির্বিঘ্নে হাঁটার উপযোগী ফুটপাত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড হতে চাই, কিন্তু আমাদের কর্মপরিকল্পনায় তার কোনো ছাপ নেই। মেগাসিটি ব্যবস্থাপনায় বড় আকারের ব্যর্থতার কারণে সুন্দর ও বাসযোগ্য শহর উপহার দেয়ার স্থলে সবচেয়ে দূষিত, দুর্ঘটনাপ্রবণ শহর তৈরি করেছি। প্যারিস, লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোর ফুটপাতগুলোয় মানুষ বিনা বাধায় হাঁটতে পারে। উন্নত বিশ্বে বেশির ভাগ বাসিন্দাই ১৫-৩০ মিনিট কিংবা তার চেয়ে বেশি সময় হেঁটে চলাচল করে। ফুটপাত পথচারীবান্ধব হওয়ায় তারা এমনটা করতে পারে।
অবৈধ গাড়ি পার্কিং কেবল আইনই ভঙ্গ করছে না, সড়কে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করছে। এ সমস্যার সমাধানে সরকারের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ জরুরি। শুধু অভিযান নয়, দূরদর্শী পরিকল্পনাও আইনের কঠোর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। তাহলেই ঢাকাবাসী স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে।










