দেশের জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার গুরুদায়িত্ব মূলত পালন করেন চিকিৎসক ও নার্স। কিন্তু বেতন কাঠামোর দিক দিয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। এ দেশের একজন চিকিৎসক ও নার্স যা বেতন পান তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। বিষয়টি ‘স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি জনবলের বেতন নীতি: বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতি উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসকদের বার্ষিক গড় বেতন ৩ লাখ টাকা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের একজন চিকিৎ়সক বছরে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেতন পান। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের চিকিৎসকদের বার্ষিক গড় বেতন ৪ লাখ টাকার বেশি। আবার ভারতে বছরে একজন চিকিৎসক পান গড়ে ১৬ লাখ টাকার বেশি এবং নেপালের চিকিৎসক পান গড়ে ১০ লাখ টাকার বেশি। বেতন কাঠামোর এমন বড় ধরনের ব্যবধান নার্সদের বেতনের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। দেশে নার্সের গড় বেতন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ভারতে একজন নার্স বছরে গড়ে বেতন পান ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। নেপাল ও শ্রীলংকায় নার্সদের গড় বেতন যথাক্রমে ৫ লাখ ও ২ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে। যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশের তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সদের বেতনের পার্থক্য আরো বেশি। যুক্তরাজ্যের একজন চিকিৎসক বছরে প্রায় ৯৮ লাখ টাকা এবং নার্স ৫২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা উপার্জন করেন।
বেতন কম হওয়ার কারণে বেশকিছু প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য খাতে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে কর্মস্পৃহার ঘাটতি দেখা যায়। পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। স্বল্প বেতনের কারণে সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি হাসপাতালেও কর্মরত থাকেন। দেখা যায় একই চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে এক মানের সেবা দেন, বেসরকারি হাসপাতালে ভিন্ন মানের সেবা দেন। এতে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে সেবার মানে তারতম্য দেখা যায়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবার মতো বিশেষায়িত একটি খাতের বেতন কাঠামো পৃথক করা। কেননা ক্যাডারের মধ্যে থেকে চিকিৎসকদের বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। কেবল পৃথকই নয়, বেতন কাঠামো যুগোপযোগী করাও দরকার। এ দেশের সরকারি বেতন কাঠামো পদমর্যাদাভিত্তিক যা দক্ষতা বা পারফরম্যান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া পদোন্নতির গতি ধীর, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বোনাস বা প্রণোদনাও দেয়া হয় না। যে কারণে স্বাস্থ্য খাতের জন্য পৃথক ও যুগোপযোগী বেতন কাঠানো প্রণয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ, দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ ভাতা, কর্মদক্ষতা ও রোগীর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে বোনাস বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের কর্মস্পৃহা বাড়ানো ও দেশের শ্রমবাজারে ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হবে। দেশে চিকিৎসক ও নার্সের যে সংকট রয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বেতন, প্রণোদনা ও অন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরো বেশি প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, দেশের উপজেলাভিত্তিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর প্রায় ৫৯ শতাংশ চিকিৎসক পদই ফাঁকা। অভিযোগ রয়েছে, পদায়ন করা হলেও এসব অঞ্চলের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকরা বেশি দিন থাকতে চান না। চিকিৎসকসহ প্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধেই প্রধান অভিযোগ, তারা সুযোগ-সুবিধাজনিত কারণে মূলত ঢাকায় থাকতে চান। যে কারণে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদের তুলনায় বেশি চিকিৎসক কর্মরত। এর পরও ঢাকা বিভাগের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয়ও প্রায় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ পদই শূন্য পড়ে আছে। অর্ধেকেরও কম চিকিৎসক নিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এতে জনবলের ওপরও চাপ পড়ে। উপরন্তু জনবল সংকট মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়াকে দুর্লভ করেছে। এমনকি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। সেখানে জুনিয়র চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় রোগীদের জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। যে কারণে সদর হাসপাতালগুলোয় সবসময়ই সক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে প্রায়ই চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীর মৃত্যুও হয়। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স সংকটও প্রকট। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আছেন মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন। এ হিসাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, দেশে প্রয়োজনীয় নার্সের তুলনায় বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ঘাটতি রয়ে গেছে প্রায় ৮২ শতাংশ। যদিও দেশে গত দেড় দশকে নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪২১ শতাংশ। নার্স সংকটের কারণে কর্মরত নার্সদেরও সেবাদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আবার ডব্লিউএইচওর তথ্যে বলা হয়েছে, সেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কাজ করবেন তিনজন নার্স। এ অনুপাত বজায় থাকলে চিকিৎসাসেবা হবে সুষ্ঠু ও মানসম্পন্ন। এ থেকে ধারণা করা যায়, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান কোন পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশগমন প্রবণতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না গেলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। এ খাতে জনবল সংকট আরো তীব্র হবে। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে আকর্ষণীয়ে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে দক্ষ চিকিৎসকরা দেশে কর্মরত থাকার উৎসাহ পান। এজন্য এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। কেননা এ দেশ সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবায় পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগেও এশিয়ার স্বল্প ব্যয়ের দেশের তালিকাভুক্ত। সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩ শতাংশের কিছু বেশি বরাদ্দ হয় এ খাতে। নয়তো স্বাস্থ্য খাতের জনবলের বেতন ও অন্য সুযোগ-সুবিধাদি বাড়ানো কঠিন হবে।
চিকিৎসক ও নার্সরা শুধু স্বাস্থ্যসেবা দেন না, তারা দেশের মানবসম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার ভিত্তি। তাদের বেতন ও প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বেতন কাঠামো, প্রণোদনা এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়নে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের যৌথ উদ্যোগে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা গেলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেবার মান উন্নত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।










