দেশে ডলার সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় আমদানি দায় ও বিদেশী ঋণ পরিশোধের জন্য রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ক্রমে রিজার্ভ ক্ষয় হতে থাকে। এ বছরের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা সময়ের পরিক্রমায় প্রায় তলানিতে নেমে এসেছিল। ডলারের বাজার ও বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বেড়ে যায়। বিশেষত পরবর্তী বছরে ডলারের বিনিময় হার ৮৫ থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৯ টাকায় পৌঁছে যায়। ডলার সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতিও চড়া হতে থাকে। পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) নেতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। মোট কথা, ডলার সংকট দেশের অর্থনীতিকে বেশ ভঙ্গুর করে তুলেছিল।
এ ভঙ্গুর অবস্থা তিন বছরের অধিক সময় ধরে বিদ্যমান থাকলেও বর্তমানে সামগ্রিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নয়ন ঘটেছে। কেননা অর্থনীতিতে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো আয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে সদ্য শেষ হওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। এ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রেকর্ড ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর আগের অর্থবছরে ছিল ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার।
সেই সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী রফতানি আয়ও স্বস্তি এনে দিয়েছে ডলার সংকটে থাকা অর্থনীতিতে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য দেখা যায়, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) মোট ৪৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।
রফতানি ও প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বমুখিতায় ডলারের জোগান ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বিওপির ঘাটতি কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিওপি-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য জানাচ্ছে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে (জুলাই-মে) সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ডলারে। যেটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৬১২ কোটি ডলার। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে মাসে গ্রস অফিশিয়াল রিজার্ভ (বিপিএম৬ অনুযায়ী) ছিল ১৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি বছরের মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে। আর ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। বলা বাহুল্য, রফতানি ও প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রাখা গেলে শিগগিরই দেশের অর্থনীতি আরো ঘুরে দাঁড়াবে। সেজন্য সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
বর্তমানে রফতানি খাতে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত উচ্চ শুল্ক। দেশের রফতানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। যদি ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়ে যায়, বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাক খাতে। এরই মধ্যে ক্রেতাদের অনেককে প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রতি ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্কহার কম নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন ভিয়েতনামের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র আরোপ করেছে ২০ শতাংশ শুল্ক। উচ্চ শুল্কের কারণে রফতানি কমে গেলে আয়ও কমে আসবে। সরকারকে এটি বিবেচনায় রেখে এগোতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করে এবং আলোচনার মাধ্যমে শুল্কহার কমিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নয়তো দেশের রফতানি খাত বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এমনিতেও দেশের শিল্প খাত নানা সংকটে জর্জরিত। জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সংকট তীব্র এখানে। এর মধ্যে ক্রয়াদেশ কমলে সেটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে যাবে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক সংকটের সমাধান জরুরি। পাশাপাশি সরকারকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। প্রবাসী আয় ডলার জোগানের দায়বিহীন এক উৎস। এর বিপরীতে কোনো বিদেশী মুদ্রা খরচ করতে হয় না অথবা কোনো দায়ও পরিশোধ করতে হয় না। তাই রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হলে ডলারের স্থিতি তুলনামূলক বেশি বাড়ে।
রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সরকারকে প্রথমত তৎপর থাকতে হবে যেন হুন্ডির দৈরাত্ম্য না বেড়ে যায়। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, হুন্ডি ও অন্যান্য মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বড় অংকই হাতছাড়া হয়ে যায়, যার বার্ষিক মোট পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। আবার প্রবাসে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো গত ১০ বছরে ভিসার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে ১৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা লেনদেন করেছে বলে বাংলাদেশের অর্থনীতির শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। এ তথ্যগুলো বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রাপ্তির বড় প্রতিবন্ধকতাকে নির্দেশ করে। সুতরাং হুন্ডির বাজার কীভাবে পুরোপুরি বন্ধ করা যায় তা নিয়ে সরকারের কাজ করা দরকার। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার হ্রাস ও হুন্ডি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রবাসী আয়ে বর্তমানে উল্লম্ফন ঘটেছে। তাই সরকারকে এ দুই ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের সরকারিভাবে প্রণোদনা বাড়ানো আবশ্যক। ভারত, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের প্রবাসীরাও নানা ধরনের সুবিধা পান। পাশাপাশি প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে আয় পাঠাতে উৎসাহ প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জটিলতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য প্রবাসীদের সঙ্গে শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। তাদের সেবার মানও উন্নত করতে হবে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার প্রতিও নজর দিতে হবে। এছাড়া বিমানবন্দরে নানা হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এর বাইরে বৈদেশিক শ্রমবাজারের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর মূল কারণ চিহ্নিত করা ও সে মোতাবেক সমাধানের পথে হাঁটা প্রয়োজন। ব্যাপক জনশক্তি বিদেশে যাওয়ার পরও প্রত্যাশিত রেমিট্যান্স না পাওয়ার অন্যতম কারণ উচ্চ মানের কাজ না পাওয়া। সেক্ষেত্রে প্রবাসীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করা ছাড়া বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদরা প্রশিক্ষণের বিষয়টিতে জোর দিয়ে আসছেন। কিন্তু বাস্তবায়ন দেখা যায় না। আবার বর্তমানে বাংলাদেশীদের জন্য প্রায় নানা বৈদেশিক শ্রমবাজার বন্ধ হতে দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ ভিসা জটিলতা, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, অবৈধ অভিবাসন প্রভৃতি। এসব সমস্যার ইতি না টানলে ধীরে ধীরে জনশক্তি রফতানি খাতে ধস নামতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে মূলত বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে জোর দিতে হবে।










