গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন ঘোষণা অনুযায়ী বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা। পাইকারি মূল্য ১ টাকা ৩৯ পয়সা। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১৫ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শতাংশের হিসাবে দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিদ্যুতের দাম বাড়ার এ সিদ্ধান্ত নানা কারণেই প্রয়োজনীয় হলেও এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন থেকে শুরু করে অর্থনীতির সব খাতেই প্রভাব পড়বে। লাইফলাইন গ্রাহকের বিদ্যুতের দামও ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ জনজীবনে ব্যয় বাড়াবে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতে গেলে সংগতই একটি প্রশ্ন আসে, সরকার চাইলে নতুন করে দাম না বাড়িয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করতে পারত কিনা। উত্তরটি হলো, আংশিকভাবে তা সম্ভব ছিল। বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিস্টেম লস, চোরাই বিদ্যুৎ লাইন উচ্ছেদ এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো সমস্যাগুলোকে কৌশলগতভাবে সামাল দিতে পারলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও উৎপাদন সুগম রাখা যেত। তবে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরও সরকারকে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কাজ করতে হবে। কারণ ভোক্তার ওপর বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় চাপানোর পর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চাহিদা পূরণ করতে না পারলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এটি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে দুর্বল করবে। এদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য টিকে থাকার সংগ্রাম বাড়বে। অনেকে উৎপাদন কমাতে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এ আশঙ্কা রয়েছে। বাড়তি যন্ত্রণা পড়বে পারিবারিক ব্যয়েও। কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থায় উৎপাদন খরচ বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে খুচরা পণ্যের দাম বেড়ে চাপ তৈরি করবে এবং মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাইকারি দামে বিদ্যুৎ বিক্রিতে আয়ের ঘাটতি ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এ ঘাটতি সামলানোর জন্য গড়ে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন। এ ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল আর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চড়া দামের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরো বহুমুখী। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলভিত্তিক ও আমদানীকৃত গ্যাসনির্ভর কেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অন্যদিকে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বড় অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে, যা বিপিডিবির আর্থিক সংকটকে আরো গভীর করেছে। এদিকে আইএমএফের দেয়া সুপারিশের সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয় রয়েছে। তবে এ খাতে সরকার বরাবরই ভর্তুকি দিয়ে আসছে। সংগতই প্রশ্ন জাগে, ভর্তুকি পাওয়ার পরও ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ খাত কেন লোকসান গুনছে? এক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ চুরি এ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিদ্যুৎ খাতের নির্মম বাস্তবতা হলো, চোরের বিল মেটাতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহককে। তাই বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত সংস্কারের ক্রমবিন্যাস নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

নানা দিক বিবেচনায় সরকারকে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অপচয়ের মাত্রা কমানোর জন্য কৌশলগত নীতিমালা জরুরি। সচরাচর কারিগরি কারণে যে বিদ্যুৎ অপচয় ঘটে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তবে অবৈধ সংযোগ এবং মিটার জালিয়াতির মতো সিস্টেম লস প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির ফল। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কোম্পানিতে সিস্টেম লসের হার ৮-১৪ শতাংশ বা তারও বেশি। যদি গড় সিস্টেম লস মাত্র ৩-৪ শতাংশ কমানো যেত তাহলে সেটি বিদ্যুৎ বিক্রির রাজস্ব থেকে বাড়তি আয় নিশ্চিত করত এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। অর্থাৎ সিস্টেম লস কমালে বিক্রয়যোগ্য বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ে। এও সত্য, দেশে বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি এতটাই বিশাল যে শুধু দক্ষতা বাড়িয়ে বা অপচয় কমিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান অসম্ভব। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য। তবে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ খাতে উচ্চমাত্রায় অপচয়, অস্বচ্ছ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি না থাকায় মূল্যবৃদ্ধির বোঝা ভোক্তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া নৈতিকভাবে ঠিক নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতার বদলে সংস্কারহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়েই অসন্তোষ বেশি কাজ করছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান পরিস্থিতিতে হয়তো অনিবার্য। কিন্তু এ বৃদ্ধিকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সরকারকে একই সঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিইআরসির পরবর্তী গণশুনানিতে সিস্টেম লস হ্রাসের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে হবে এবং প্রতিটি বিতরণ কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধ্য করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের সম্পূর্ণ তথ্য সরকারিভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং যেসব চুক্তি জনস্বার্থ পরিপন্থী, সেগুলো পুনর্বিবেচনার আইনি পথ খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিপিডিবির আর্থিক ঘাটতির একটি বড় উৎস হলো রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে দেয়া ক্যাপাসিটি চার্জ। বিদ্যুৎ না নিলেও কেন্দ্রগুলো বিপুল অর্থ পায়। এ চুক্তিগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং দক্ষতাহীন কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করা হলে সাশ্রয় সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনা একটি শ্বেতপত্রের আকারে প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা উচিত। এ সংস্কারে সিস্টেম লস কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা রাখতে হবে। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোকে পরিবেশ সংবেদনশীল করে আধুনিকায়ন করা জরুরি। এসব দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হলেও রিটার্ন আসবেই। এমনকি বিদ্যুৎ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালু করা যেতে পারে। বর্তমানে ভর্তুকি প্রায় সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এটি পরিবর্তন করে নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত রেখে সক্ষম ভোক্তাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য আদায় করা যায়। এতে ভর্তুকির ভার কমে, আবার দুর্বলরাও রক্ষিত হন। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এ চাপ সামলাতে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে দ্রুত হাঁটতে হবে। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দ্রুত কমছে। এ খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ালে আমদানীকৃত জ্বালানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচও হ্রাস পাবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা হারাতে পারে সরকার। এজন্য শুধু মূল্যবৃদ্ধি বা সমন্বয়ই সমাধান নয়, বরং গোটা খাতের টেকসই উন্নয়নও জরুরি।