অপরিকল্পিত আবাসন, অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, অসহনীয় যানজট, পরিবেশ দূষণ, মৌলিক সুবিধাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে ঢাকা বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী। পরিকল্পিত নগরী হিসেবে রাজধানী ঢাকাকে গড়ে তুলতে একের পর এক পরিকল্পনা আর মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেগুলোর প্রায় সবই থেকে গেছে নিষ্ফল। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকা হারিয়েছে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ প্রকাশিত ‘‌প্রকৃতিবিহীন ঢাকা? প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নগরটির জনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ। ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন ২১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। শহরের ৬০ শতাংশ জলাধার এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। জলাধার অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকায়। দখল হয়ে যাওয়া বন, জলাধার, খাল-বিলের জায়গায় গড়ে উঠেছে দালান-কোঠা। যার কারণে ঢাকার ভূতাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক উপাদানগুলো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাধার বিলুপ্ত, সবুজ আচ্ছাদন হারানো ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো তথ্যগুলো চরম উদ্বেগজনক। এ অবস্থাকে কেবল পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি অপরিকল্পিত নগরায়ণের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে গাছপালা, জলাশয় ও প্রাকৃতিক স্থানগুলো কোনোভাবেই ধ্বংস করা উচিত হয়নি। গবেষণায় যেভাবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যূনতম সবুজ আচ্ছাদন ও জলাধার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। এ বাস্তবতা শুধু নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শহরে মানুষের বসবাসের পাশাপাশি বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করাও অপরিহার্য।

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ-সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উচ্চ হারে। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়েছে। সীমিত জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস হওয়ায় নগরীর আবাসন, যোগাযোগ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আনুষঙ্গিক সব অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাস করছেন ঢাকার বাসিন্দাদের অনেকেই, যেগুলোয় নাগরিক পরিষেবা পেতে পদে পদে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। তীব্র যানজটে কমেছে শহরের মানুষের গতি। ঢাকার ফুটপাতও পথচারীবান্ধব নয়, স্বাস্থ্য অবকাঠামো অপ্রতুল। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও অপর্যাপ্ত; নেই খেলার মাঠও। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টের কারণে এক সময়ের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকাগুলোও এখন উষ্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের মতো শহরের পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা অনুসরণ করে ঢাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা যেতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সিঙ্গাপুর। ১৯৬৫ সালে গার্ডেন সিটি"ধারণা দিয়ে যাত্রা শুরু করে দেশটি আজ পরিণত হয়েছে এক উদ্যানঘেরা শহরে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের মোট ভূখণ্ডের ৫০ শতাংশেরও বেশি সবুজে আচ্ছাদিত। শহরের সবুজ পরিসর পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে স্যাটেলাইট চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মাধ্যমে নগরাঞ্চলের সবুজ আচ্ছাদন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন নজরদারি করা ও গোটা বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ডাটাভিত্তিক এ পদ্ধতি শহরের নির্মিত অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণ সংস্থাগুলোকে টেকসই ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, সবুজ এলাকা ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করছে। রিয়েল টাইম ডাটার সাহায্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন আগেভাগেই পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারছে। জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো রক্ষা করছে এবং এক প্রকৃতিবান্ধব নগর পরিবেশ নির্মাণে এগিয়েছে। শহর ও প্রকৃতির সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব—তার বাস্তব উদাহারণ সিঙ্গাপুর।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো জলাধার রক্ষা করে নগরায়ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইতালির ভেনিস, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এর জীবন্ত উদাহরণ। কিন্তু আমাদের দেশে যেখানে নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়, সেখানে জলাধার দখল করা হয়তো তুচ্ছ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু এতে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, উষ্ণতা বাড়ছে, তার ফলাফল মোটেও ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। তাই জলাধার যত ছোট আয়তনের হোক না কেন, সেটি রক্ষায় অবহেলা কাম্য নয়।

বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজ এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ক্যান্সারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ঢাকা আশপাশের নদীগুলোয় বর্জ্য ও শিল্পবিষাক্ত পদার্থ ফেলা হচ্ছে নিয়মিত। স্যুয়ারেজ ও অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় দূষিত হচ্ছে পানি। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে এবং বিশুদ্ধ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ ও জনবহুল এলাকার কোলাহলে শব্দদূষণ মারাত্মক মাত্রায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ঢাকায় শব্দদূষণ অনেক বেশি। ফলে মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও শিশুদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ঘরোয়া, বাণিজ্যিক ও চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পরিবহন বা নিষ্পত্তি করা হয় না। বর্জ্য স্তূপে জীবাণু ছড়ানো, মশা-মাছির বিস্তার এবং পচা গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অধিকাংশই উন্মুক্ত মাঠ, বৃক্ষ, জলাধার ও উদ্যান দখল হয়ে গেছে। এটি শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাতাসের বিশুদ্ধতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

একটি শহর তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন তার ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সমান গুরুত্ব পায়। ঢাকার পরিবেশ এখন যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতির আমূল সংস্কার দরকার। উন্নয়ন মানে শুধু দালান-কোঠা নয়, বরং তা হওয়া উচিত মানুষের স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য জীবনধারার নিশ্চয়তা। পরিবেশ ও প্রকৃতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ছাড়া সেই লক্ষ্য কখনই পূরণ হবে না। তাই ঢাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পরিবেশ রক্ষা জরুরি। এজন্য ঢাকার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান গ্রহণ করা যেতে পারে। সবুজ বিনিয়োগের জন্য নিম্ন আয়ের এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। শহরের তাপমাত্রা কমাতে জলাভূমি পুনরুদ্ধার করাও জরুরি। অতএব এখনই সময় ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগরীতে রূপান্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ। এ সংকট মোকাবেলায় দেরি হলে তার খেসারত আগামী প্রজন্মকেও বহন করতে হবে।