ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দেয়ার ফাঁকে জেটেওর প্রতিষ্ঠাতা ও সাংবাদিক মেহেদি হাসানকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। জেটেওর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি বণিক বার্তার পাঠকের জন্য অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আমাদের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।
আমাদের শেষবার আলাপ হয়েছিল ২০১৭ সালে। সে সময় আপনি কেবল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ছিলেন; দেশের নেতৃত্বে ছিলেন না। এক বছরেরও কিছু আগে বাংলাদেশের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়েছেন। প্রায় দুই দশক তিনি কার্যত স্বৈরশাসকের ভূমিকায় ছিলেন এবং বহু মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তার পতন দেখে অনেকেই স্বস্তি পেয়েছে। সেদিনের কোনো কথা মনে আছে? আপনার অনুভূতি কেমন ছিল—ভয়, আশা, বিস্ময়?
রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছিল। অবশেষে একজন স্বৈরশাসকের পতন ঘটল। দারুণ খবর ছিল।
আপনি কি ভেবেছিলেন এটা ঘটবে?
না, হঠাৎ ঘটেছে। দেশে আন্দোলন হচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি এত খারাপ হয়ে যাবে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছাড়বেন, এটা আশা করিনি।
বর্তমানে দেশজুড়ে জনগণের মনোভাব কেমন? গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পেরিয়েছে। জনমনে এখনো প্রত্যাশা রয়েছে নাকি হতাশা সংস্কারের ধীরগতি দেখে?
দুটোই আছে—উত্তেজনা ও হতাশা। মানুষ স্বভাবতই অভিযোগ করে, সব প্রত্যাশা দ্রুত পূরণ হোক তা চায়। তাদের প্রত্যাশাও অনেক। তারা সবকিছু আজকেই চায়, আগামী দিনের জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। তবে জনগণের হতাশা, প্রত্যাশাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।
শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিদকে বাদ দিয়ে আপনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নিল, অবাক হয়েছিলেন?
হ্যাঁ। কেননা আমি তাদের চিনতাম না এবং কখনো আলাপও হয়নি। প্রথমে আমার প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ করে। আমি সহকর্মীদের বলি তাদের উপেক্ষা করতে। কিন্তু তারা সরাসরি যোগাযোগ করে, তিনদিন ধরে আমাকে রাজি করানোর চেষ্টা করে। আমি এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত তারা বলল—শিক্ষার্থীরা প্রাণ দিয়েছে, রক্ত ঝরেছে। এখন আপনি না এলে দেশের কী হবে? তখন তাদের আবেগ আমাকে নাড়িয়ে দেয়। আমি রাজি হই।
জাতিসংঘের হিসাবে, গত বছরের গ্রীষ্মে শেখ হাসিনার সামরিক অভিযানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করেছে। তিনি নরেন্দ্র মোদির সুরক্ষায় ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। আপনি বারবার তাকে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এতে নরেন্দ্র মোদি কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। আপনি কি বিশ্বাস করেন কোনো এক সময় হলেও শেখ হাসিনাকে ভারত বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে?
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি যদি ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাহলে ভারত তাকে নিজস্ব আশ্রয়ে রাখবে। তবে এ বিষয়ে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা এলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
ভারত কেন তাকে রাখতে চাইবে?
ভারত সবসময় শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেছে। এখনো যারা তাকে সমর্থন করেন, তারা আশা করছেন, তিনি বিজয়ী নেত্রী হয়ে বাংলাদেশে ফিরবেন।
নিউইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছিল, শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আপনি কি শঙ্কিত যে ভারত তাকে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় পুনর্বহাল করতে পারে?
হ্যাঁ, বাইরের শক্তি তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে—আমরা সবসময়ই সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
আপনি মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন?
আমি হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মোদির সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দুটি বিষয় বলেছেন। প্রথমত, তারা হাসিনাকে রাখতে চান। আমি বলেছি, আমরা আপনাদের বলব না তাকে নিয়ে কী করতে হবে। তবে নিশ্চিত করুন যে তিনি আমাদের বা বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে যেন কিছু না বলেন। এ বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষত আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার সমসাময়িক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সতর্ক করে বলেছেন যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তিই হবে। তারা বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করত। অমর্ত্য সেনসহ অন্য সমালোচকদের এমন মন্তব্যে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
এটি ভুল সমালোচনা। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তারা শুধু রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। এখন তারা নির্বাচন করতে পারছে না, কিন্তু দল হিসেবে তারা বৈধ রয়েছে। আপাতত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। যেকোনো সময় তা তুলে নেয়া হতে পারে।
কিন্তু এটি তো কার্যত গণতন্ত্রবিরোধী। লাখো সমর্থক থাকা সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হলো।
দলটির আচরণ ও নির্বাচনী পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে পারার ঝুঁকি অনুমান করে নির্বাচন কমিশন আপাতত এ ব্যবস্থা নিয়েছে।
আপনি নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না যে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে দেশে?
কোটি কোটি সমর্থক আছে এমনটা মনে করি না। তবে কতজন আছে জানি না। অনেক সময় ক্ষমতার কারণে মানুষ শক্তিশালী পক্ষকে মান্য করে। সেটি প্রকৃত সমর্থন নয়।
যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেয়া হয় তবে তাদের সমর্থকরা কী করবে?
তারা বৈধ ভোটার। অনেক প্রার্থী আছে। তারা নিজেদের মতো করে ভোট দেবে। তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে—হাজারো হত্যাকাণ্ডের জন্য এখনো কোনো দায় স্বীকার করেনি। সবসময় অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
কিন্তু শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বাইরের সমালোচকরাও নানা প্রশ্ন তুলছেন। গত নভেম্বরে প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু জনগোষ্ঠী অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, তাদের ওপর হাজারো হামলা হয়েছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, বাংলাদেশে সহিংসতা ‘বর্বরোচিত’। আপনি এসব সমালোচনার জবাবে কী বলবেন?
এগুলো ভিত্তিহীন খবর। এ ধরনের ভিত্তিহীন সংবাদে কান দেয়া উচিত নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এ খবর নিয়ে মন্তব্য করেছেন, আর আপনি বলছেন ভুয়া খবর?
হ্যাঁ, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানেন? তার কোনো ধারণাই নেই।
কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসও প্রতিবেদন করেছে যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি ভাংচুর হয়েছে। এমনকি একজন হিন্দু ভিক্ষুককে পতাকা উত্তোলনের জন্য গ্রেফতারও করা হয়েছিল। এটা অস্বীকার করা যায় না।
এগুলো অতিরঞ্জিত খবর। প্রকৃতপক্ষে এগুলো প্রতিবেশী বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত সমস্যা, যেগুলোকে ধর্মীয় সহিংসতার নাম দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে খুবই সতর্ক।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আপনার বার্তা কী?
সম্প্রতি দুর্গা পূজার আগে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আমার বার্তা হলো—আপনারা শুধু বলবেন না যে আমি সংখ্যালঘু, আমাকে সুরক্ষা দিন। বলবেন, বাংলাদেশের নাগরিক। রাষ্ট্র সুরক্ষা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখে। এতে সবার সমান সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। নিজেকে আলাদা করবেন না। আমরা একই দেশের মানুষ।
এবার সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকে আসি। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়, পুরো বাংলাদেশের মানুষ অনিরাপদ বোধ করছে। শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের ওপর প্রতিশোধমূলক আক্রমণ হয়েছে, অপহরণ বেড়েছে, সর্বোচ্চ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আপনি কি মনে করেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার আরো ভালো করতে পারত?
সবসময়ই মনে হয় আরো ভালো করা যেত। তবে মনে রাখতে হবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। পুরো সরকার পালিয়েছে। যারা অভ্যুত্থান চলাকালে গুলি চালিয়েছে, তারাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করছে। কে কার পক্ষে, বোঝা যাচ্ছিল না। তাই একটা অস্থির সময় গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল।
আপনার অন্তর্বর্তী সরকার এক বছর ধরে ক্ষমতায়। আপনি বলেছেন, নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হবে। এটা আরো পরে হওয়ার কথা ছিল। আপনি ফেব্রুয়ারিতে এগিয়ে এনেছেন। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে, তাও রমজানের কারণে।
আপনি সাক্ষাৎকারের শুরুতে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখন কাজ দেখতে চায়। সমালোচকরা বলছেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। নির্বাচনের জন্য আরো ছয় মাস অপেক্ষা করা খুব দীর্ঘ। মানুষ ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। কেন আমরা এর আগে নির্বাচন করতে পারছি না? নেপালের অন্তর্বর্তী নেতা ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেন বাংলাদেশে ১৮ মাস লাগছে?
নিশ্চয়ই! আপনি জানিয়েছেন, মানুষ বলছে কেন এত সময় লাগছে। আবার এমন মানুষও আছে যারা বলেন, ‘পাঁচ বছর থাকুন, ১০ বছর থাকুন, ৫০ বছর থাকুন। সুতরাং মানুষ সব ধরনের কথাই বলছে।’ তারা বলছে, আপনি থাকুন। নির্বাচনের দরকার কী? নির্বাচন কার দরকার?
এমন কথা যারা বলছেন, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা বলেন, কেন আমরা তাড়াতাড়ি নির্বাচন করতে পারছি না? এই বিলম্ব কিসের জন্য?
যখন তারা এই কথা বলে, তখন তা গণতন্ত্র নিয়ে নয়, সুশাসন নিয়ে কথা বলে। আমরা দুর্নীতিমুক্ত শাসন দেখতে চাই। সেজন্যই তারা বলে, আপনি থাকুন! কারণ নির্বাচনের পর আমরা বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে চাই না। আপনি এক ধরনের মতামত তুলে ধরেছেন, আমিও আরেক ধরনের মতামত তুলে ধরলাম। কোনটি বেশি শক্তিশালী?
কিন্তু আপনি কি আজ বলবেন, নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছতে এত সময় লাগার কারণ কী?
আমরা অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা কতদিন থাকব তা কেউ নির্ধারণ করে দেয়নি। আমরা কতদিন থাকব সে সিদ্ধান্ত আমাদের। তবে আমাদের তিনটি কাজ করতে হবে। একটি হলো সংস্কার, একটি বিচার এবং শেষটি নির্বাচন। আমরা সংস্কারের এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছি। এটি একটি বিরাট এজেন্ডা। আপনি যদি শুধু নির্বাচন করেন, তবে সেই পুরনো বিষয় আবার ঘটবে। কারণ আইন, নিয়ম, পদ্ধতি একই রয়ে গেছে। তাই ছাত্রদের নেতৃত্বে জনগণের একটি দাবি হলো সংস্কার করা। সুতরাং আগে নিশ্চিত করতে হবে ফ্যাসিবাদের সব শিকড় উপড়ে ফেলা হয়েছে, যাতে ভিন্ন ধরনের কাঠামো তৈরি হয়; যাতে আগের মতো সরকার আবার ফিরে আসতে না পারে। সেটাই আমাদের এজেন্ডা।
কিন্তু আপনি কি এ যুক্তিটি বোঝেন, যেহেতু আপনারা অন্তর্বর্তী সরকার, তাই আপনাদের ন্যূনতম মৌলিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত এবং বড় সিদ্ধান্তগুলো একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নেয়া উচিত?
এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। আমরা শুধু বলেছি, তিনটি কাজ আমাদের দেয়া হয়েছে। আমরা সেটা করব।
গত মে মাসে শোনা যাচ্ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে আপনার সরকারের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে জেনারেল ওয়াকার নির্বাচনের তারিখ ডিসেম্বরের মধ্যে চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি বলেছেনও যে মিয়ানমারের মানবিক করিডোর তৈরির মতো বড় সিদ্ধান্ত শুধু নির্বাচিত সরকারই নিতে পারে।
করিডোরের কোনো প্রশ্নই আসে না। এ বিষয়ে কেউ কিছু বলেনি। আর নির্বাচন সরকারের উদ্বেগের বিষয়, সেনাপ্রধানের নয়।
গুঞ্জন ছিল আপনার পদত্যাগ ঘিরে। ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, আপনি সরে দাঁড়ানোর চিন্তা করেছিলেন। এটা কি সত্য?
আমি কিছুটা হতাশ ছিলাম। কাজগুলো যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হচ্ছিল না। সবসময় বিলম্ব ঘটছিল। তখন মনে হয়েছে, যদি আমাকে কাজ করতেই না দেয়া হয়, তবে থাকার প্রয়োজন কী? সেজন্য আমি পদত্যাগের কথা বলেছিলাম।
কিন্তু আপনি এখনো আছেন। কীভাবে মত বদলালেন?
সবাই এসে বলল, আপনি থাকুন। আপনি না থাকলে দেশ আবার সংকটে পড়বে। অনুরোধ করল, কিছুটা দেরি হলেও কাজ হবে।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এলে আপনি কি বিদায় নেবেন?
হ্যাঁ, আমি বিদায় নেব। তবে অবসর নিচ্ছি না। আমি বলি, অবসর শব্দকে অবসর দেয়া উচিত। মানুষ কোনোদিন অবসর নেয় না। আমি রাজনৈতিক জীবন থেকে বিদায় নেব, কিন্তু সক্রিয় থাকব।
গত ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলনের তরুণ নেতারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন—ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)। নাহিদ ইসলাম নামের ২৭ বছর বয়সী এক নেতা এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি আপনার সরকারেও ছিলেন। এ দল নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আমি কোনো মন্তব্য করব না। করলে পক্ষপাতিত্ব মনে হবে।
সমালোচকরা বলছেন, আসলে আপনি এরই মধ্যে দলটিকে আশীর্বাদ দিয়েছেন।
এটা তাদের অনুমান। নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারে আমার সহকর্মী ছিলেন। আবার ছাত্রনেতা হিসেবে তিনিই আমাকে ডাকেন। তাই সম্পর্ক আছে। কিন্তু দলীয় ইস্যুতে আমি কিছু বলিনি। তাদের নিজেদের দল, নিজেদের নীতি-ঘোষণা দিতে হবে।
আপনি অর্থনীতিবিদ। এখন এক বছরের জন্য দেশ চালানোর সুযোগ পেয়েছেন। আপনার অর্থনৈতিক ভিশন কী?
বাংলাদেশ সৌভাগ্যবান দেশ। এখানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যা রয়েছে, আর এর বেশির ভাগই তরুণ। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীর গড় বয়স ২৬। এ প্রজন্ম প্রযুক্তি হাতে নিয়ে জন্মেছে, নতুন ভিশন নিয়ে এসেছে। তারাই সরকারের পতন ঘটিয়েছে। সৃজনশীল তরুণ প্রজন্মকে কাজের সুযোগ দিলে যেকোনো সমস্যার সমাধান করবে।
বাংলাদেশের আরেকটি সৌভাগ্য হলো ভৌগোলিক অবস্থান। শুধু ভূমি নয়, সমুদ্রপথও আছে। আমরা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলকে নিয়ে ভাবতে পারি—নেপাল, ভুটান, ভারতের সাতটি রাজ্য। সবাইকে সমুদ্রপথের সুযোগ দিতে পারি। এখানে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ রয়েছে।
আগের সরকারের সময় অনেক সমস্যা, অনেক জটিলতা ছিল, কিন্তু বহু বিদেশী পর্যবেক্ষক স্বীকার করেছেন যে শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে দেশের অর্থনীতি ভালো করছিল, প্রবৃদ্ধি ছিল এবং দারিদ্র্য হ্রাস হয়েছিল। একজন স্বাধীন বিশ্লেষক হিসেবে আপনি কি এ বিষয়টি স্বীকার করবেন? তার প্রতি আপনার ব্যক্তিগত ধারণা একপাশে রেখে বলুন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতি কি আসলেই ভালোভাবে বাড়ছিল?
হাসিনা শাসনামলের যত তথ্য-উপাত্ত পান সেগুলো ভুয়া, বানানো। তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারতেন। তাকে মোকাবেলা করা কারোর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আপনারা তাহলে ওই ভুয়া পরিসংখ্যান ঠিকঠাক করতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?
আমরা চেষ্টা করছি। এভাবেই আমরা পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
শেখ হাসিনা অন্য যে বিষয়টি নিয়ে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছেন, তা হলো মুক্ত গণমাধ্যম, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর তার কঠোর দমনপীড়ন। আপনারাও বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর দমন চালাতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ বলছেন আপনারা বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক পথে হাঁটছেন। তার জবাবে আপনি কী বলবেন?
প্রথমত, আমি বলব—যদি আপনি মনে করেন যে পরবর্তী সরকার ধীরে ধীরে একই পুরনো পরিস্থিতিতে ফিরে যাবে, ঠিক সেই কারণেই আমরা নির্বাচন দিতে চাইছি। যাতে তারা থামাতে বাধ্য হয়। যাতে পরিস্থিতি আর খারাপ না হতে পারে।
আপনারা এ সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি বাতিল করছেন না, যা শেখ হাসিনা অপব্যবহার করেছিলেন এবং এখন মানুষ বলছে আপনার সরকারও ব্যবহার করছে?
শেখ হাসিনার করা আইনের মতো কোনো সন্ত্রাসবিরোধী আইন আমাদের নেই। আমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য কাজ করছি। সেদিক থেকে আমরা খুব ভালো অবস্থায় আছি।
আপনারা অনেক সংস্কারের কথা বলছেন। বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমকে রক্ষা করার জন্য আরো কিছু করা দরকার বলে কি আপনি মনে করেন না?
আমরা সবচেয়ে স্বাধীন গণমাধ্যম দেয়ার চেষ্টা করছি। আমরা ২৪ ঘণ্টা আক্রমণের মুখে থাকি। আমরা এমন কোনো গণমাধ্যমকে পৃষ্ঠপোষকতা করিনি, যা আমাদের রক্ষা করবে।
বাংলাদেশ একটি রফতানিনির্ভর দেশ, যেখানে পোশাক শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পশ্চিমে যারা বাংলাদেশের পোশাকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি আপনাকে কতটা উদ্বিগ্ন করে?
শুল্ক আলোচনার বিষয়টি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। হ্যাঁ, ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। সুতরাং এটি ততটা বেশি নয়, যতটা আমরা আশঙ্কা করেছিলাম। ভারত আরো বেশি শুল্ক পেয়েছে। এমনকি আমি বলছিলাম যে হয়তো শিগগিরই ভারতীয় শিল্পগুলো বাংলাদেশে এসে তাদের শিল্প স্থাপন করবে, কারণ এখানে উৎপাদন করা এবং পাঠানো অনেক সস্তা। ফলে এটি উৎপাদনের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হবে।
আপনারা কীভাবে ২০ শতাংশ পেলেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন?
দেখুন, আমরা আমাদের যুক্তি তুলে ধরেছি। আমরা এটা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর যে বাণিজ্য ঘাটতি সম্পূর্ণরূপে হ্রাস পায়, কারণ আমেরিকানরা বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। আমরা এ উদ্বেগ পূরণ করতে চাই।
শেষ করার আগে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বলছি—এ গ্রীষ্মে আপনারা ঘোষণা করেছেন যে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার মতো সংস্থান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে নেই, যারা মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে এসেছেন। আপনারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান খুঁজতে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করেছেন। আপনার কাছে সেই সমাধানের রূপরেখা কী?
আমরা চাই তারা যেন নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব গত রমজানের সময় রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন। তিনি সেখানে বাংলাদেশের সবার মতো রোজা রেখেছিলেন। তিনি ক্যাম্পে এসেছিলেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে পাহাড়ে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী তাকে ঘিরে ধরেছিলেন। সেখানেই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করাই হবে তার লক্ষ্য। আমি আমার বক্তৃতায় তাদের বলেছিলাম: এটি রমজান মাস, শিগগিরই ঈদ আসছে। এ বছর আপনাদের ঈদ এখানেই করতে হবে, কিন্তু আশা করি পরের বছর যখন ঈদ আসবে, তখন আপনারা নিজেদের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করবেন।
আমরা সবাই সেটাই আশা করি, কিন্তু বাস্তবতা যদি ভিন্ন হয়, মিয়ানমার যদি তাদের জন্য নিরাপদ না হয়, যদি তাদের জীবনের নিরাপত্তা না থাকে তাহলেও কি পাঠিয়ে দেবেন?
না, না। আমরা তাদের জোর করে ফেরত পাঠাচ্ছি না। আমরা বলছি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরে জীবনযাপন করতে পারে। রোহিঙ্গারা বলেছেন, আমরা এখানে অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল ভিক্ষুক নই। আমরা কৃষক, আমাদের পশুসম্পদ আছে, জমি আছে। আমরা পেশাজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক। আমরা সবাই এখানে আটকে আছি। আমরা শুধু নিজেদের বাড়িতে ফিরে গিয়ে নিজেদের কাজ করতে চাই। আমরা কারো ওপর বোঝা হতে চাই না।
২০১৫ সালে হাসিনার সরকার বাংলাদেশী পাসপোর্টে থাকা ‘এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ’—এই লাইনটি অপসারণ করেছিল। এ বছর আপনার সরকার সেই লাইনটি পুনরুদ্ধার করেছে। এর মাধ্যমে আপনারা কী বার্তা দিতে চাইছেন? আপনারা কি ইসরায়েলকে বলতে চাইছেন যে আমরা আমাদের নাগরিকদের আপনার দেশে যেতে দিতে চাই না?
যখন পূর্ববর্তী সরকার এ কাজটি করেছিল, তখন পুরো বাংলাদেশ এর বিরোধী ছিল। কেউ এটি পছন্দ করেনি। আমরা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিইনি এবং আমরা চাইনি যে এটি আবার পাসপোর্টে তাদের ভ্রমণের সুযোগ নিয়ে আসুক। তাই প্রথম কাজটিই আমরা করেছি—লাইনটি পুনরুদ্ধার করা, কারণ এটি জনগণের ইচ্ছা।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে গাজায় বর্তমানে যা ঘটছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ভয়াবহ। এটি বলার জন্য আপনাকে নোবেল বিজয়ী হতে হবে না। একজন মানুষ হিসেবে আপনি তা সহ্য করতে পারেন না।
এটাকে আপনি গণহত্যা বলবেন? এটি থামাতে কী করা যেতে পারে বলে মনে করেন?
হ্যাঁ। আপনি বলতে পারেন। এ গণহত্যা থামাতে পুরো বিশ্ব একত্র হওয়া উচিত। এমন একটি ভয়াবহ ঘটনা সবার চোখের সামনে ঘটছে, আর আমরা শুধু নীরব থাকি এবং প্রতিদিন স্ক্রিনে দেখি কী হচ্ছে। কীভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে এবং বোমা হামলায় ছিন্নভিন্ন হচ্ছে, আর মানুষ সামান্য খাদ্যের সন্ধানে ছুটছে। খাদ্য আসছে, কিন্তু তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। এমন একটি ঘটনা দেখতে হচ্ছে এবং আমরা কিছুই করতে পারছি না—এটি পুরো বিশ্বের জন্য লজ্জাজনক।
গত এক বছরে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কোন অর্জন নিয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি গর্বিত?
আমার মনে হয়, সবচেয়ে ভালো কাজটি যা আমরা করতে পেরেছি, তা হলো—আমরা আমাদের নিজেদের ওপর আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি। আমরা একটি স্বাধীন দেশ। আমরা নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমাদের কেউ ধমকে বা চাপ দিয়ে কাজ করাতে পারে না। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে, কিন্তু আমরা তা করতে পারি। সেই সক্ষমতা আমাদের আছে। সেই আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। সেই আত্মসম্মানবোধ ফিরে এসেছে এবং মানুষের মনে স্বাধীনতার সেই ধারণা ফিরে এসেছে।
গত বছর বাংলাদেশের ছাত্ররা যা অর্জন করেছে, তা থেকে অন্য দেশগুলো শিখতে পারে বলে কি আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি, তাদের শেখা উচিত, কারণ বাংলাদেশ যা করেছে, তা ইতিহাসে বিরল। আরো অনেক বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে সেই বিপ্লবগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। তরুণরা একত্র হয়েছিল। তারা জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন তারা এগিয়েছে এবং অবশেষে তারা বলেছে, যথেষ্ট হয়েছে। আমাদের শুধু একটি শর্ত: আপনার চলে যেতে হবে। আর কোনো শর্ত নেই। আপনি দেশকে আমাদের হাতে তুলে দিন। আমরা আর আপনাদের চাই না। শুধু একদিন সময় পেয়েছে এবং তাকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।










