আবুল কাসেম ফজলুল হক, শিক্ষাবিদ ও চিন্তক। বর্তমানে বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। বণিক বার্তায় কথা বলেছেন একুশে ফেব্রুয়ারি ও বাংলা ভাষার বিভিন্ন দিক নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির আধিপত্য নিয়ে আপনার মতামত কী?
বাংলা ভাষার প্রতি, বাঙালি জাতির প্রতি যাদের অনাস্থা তাদের কাছে শাসনক্ষমতা থাকায় ভালো সম্ভাবনাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ইংলিশ ভার্সন শিক্ষা ব্যবস্থা কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? যারা বাংলাদেশে থাকবে না, তাদের প্রস্তুতির জন্যই এ ইংলিশ ভার্সন। আমরা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে যে ইংরেজি জ্ঞান নিয়েছি তাতে কি আমাদের চলেনি? ইংলিশ মিডিয়াম থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে ইংলিশ ভার্সন আনা কাদের প্রয়োজনে? ইংলিশ ভার্সনে পড়া অনেক শিক্ষার্থীকে দেখছি তারা ইংরেজি বই পড়ে বুঝতে পারে না, বাংলাতেও পুরোপুরি দক্ষ নয়। যদি বাংলায় কোনো বই থেকে দু-চার পৃষ্ঠা পড়িয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বলা হয়, অনেকেই সেটি করতে পারবে না। এ থেকেই বোঝা যায়, যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ভাষা শিক্ষায় সফল হয়নি।
বাংলা আমাদের প্রথম ভাষা। এটাকে জানতে, বুঝতে ও চর্চা করতে হবে। ইংরেজি আমাদের দ্বিতীয় ভাষা—এটাকে শিখতে হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবহার করতে হবে। তবে ইংরেজি ভালো বই বাংলায় অনুবাদ করা জরুরি।
তাহলে কি ইংলিশ ভার্সন শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করা উচিত? বা আমাদের করণীয় কী?
যদি এটি বাতিল করা হতো, তাহলে আমাদের আপত্তি থাকত না। কিন্তু একদিকে ইংরেজি ভার্সন চালু রেখে আবার বাংলা ভাষার গুরুত্বের কথা বলা—এটি আত্মবিরোধী। ফলে সুস্থ চিন্তার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে সম্ভাবনার দ্বারগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে।
প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বেশ জৌলুসের সঙ্গে আয়োজন হয়। কিন্তু এখনো দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষাচর্চা নিশ্চিত করা যায়নি। বিশ্বায়নের দুনিয়ায় ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা জানাও প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার না হওয়ার কার্যকারণ আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় অনেক বই অনেকেই লিখেছেন এবং জনসংখ্যা যত বেড়েছে বই প্রকাশের হার তার থেকে অনেক বেশি বেড়েছে। সবই যে ভালো হয়েছে সেটা বলা যাবে না। সব বই কিন্তু লেখার অধিকার প্রকাশ করার অধিকার থাকবে, সেটা না দিলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। এই যে উন্নতি করেছে, যেমন সরকারি অফিসে ১৯৭২ সালেও ঠিকমতো ফাইলপত্র লিখতে পারত না। সিভিল সার্ভিসে যারা ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু এখন তো সবাই বাংলা ভাষায় লিখছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কে, সেখানে ইংরেজি ব্যবহার করছে। কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মূলত বাংলা ভাষায় লিখেছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার ফলেই স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে এবং সে কারণেই তারা বাংলা ভাষার গুরুত্ব দিয়ে এটা করেছেন। সরকার বারবার বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতেন। আমরা দেখতে পারি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শেষ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি বাংলা ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আইন জারি করেছেন। নানাভাবে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তারপর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা ওই ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেননি। এতে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে যে একটা স্পিরিট ছিল সে স্পিরিটটা স্তিমিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ তুলনামূলকভাবে অন্য দেশের থেকে বেশি। কিন্তু বাংলা ভাষা উন্নতির জন্য যে সরকারি কার্যক্রম দরকার সেই সরকারি কার্যক্রম এখন প্রায় নেই বললেই চলে। ভাষার উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত যে একটা প্রতিষ্ঠান মানে বাংলা একাডেমি আছে। সেটাকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার ব্যবহার করে। আর প্রকৃত ভালো কাজ করার জন্য চিন্তা হয়তো কোনো কোনো সরকার করে, কিন্তু স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহারটা অনেক বেড়ে গেছে এবং আমাদের গোটা জাতির মধ্যে দুর্নীতি ক্রমাগত বাড়ছে। ন্যায়নীতির দিক দিয়ে উন্নতি হচ্ছে না। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দিয়ে দুর্নীতি কমানো যায় না। অল্পদিনের জন্য হয়তো দুর্নীতি সীমিত করা যায়, কিন্তু স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায় না। মানুষের সত্তায় যেমন দুর্নীতির মনোভাব আছে তেমনি ন্যায়নীতির মনোভাবও কিন্তু আছে। একটা জাতির জীবনে কখনো কখনো দুর্নীতির প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে, বিশেষত যারা ক্ষমতাসীন ও সমাজের উচ্চশালী তাদের মাঝে। আবার কখনো কখনো যাদের অ্যাবসুলেট ক্ষমতা থাকে না তাদের একটু বিবেকবুদ্ধি এবং সংযম এগুলো থাকে। আমাদের দেশের সেই সংযম অথবা একটা উন্নত লক্ষ্য এবং ভালো কিছু করার আগ্রহ জনজীবনে নেই। নেই কেন—সাধারণ মানুষ তো অনেক কিছুই জানতে পারে না, বুঝতে পারে না। যারা শিক্ষিত লোক, যারা ক্ষমতাবান তারা যদি মানুষকে দেখাতে চায়, জানাতে চায় তাহলে সাধারণ মানুষ ভালোটা বুঝতে পারে, মন্দটা পরিহার করতে পারে সেই ধরনের নেতৃত্ব তো আমরা পাইনি।
আমাদের উচ্চশিক্ষায় বাংলায় ভালো পাঠ্যবই পাচ্ছি না, ইংরেজি বইয়ের ভালো অনুবাদ পাই না। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি কী ভূমিকা রাখতে পারে?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছেলেমেয়েরা পড়ছে—লেখাপড়ায় ভালো, উদ্যোগী ও পরিশ্রমী। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের মনোভাব—বাংলাদেশটা অত্যন্ত খারাপ, এটার কোনো উন্নতি হবে না। তারা ইউরোপ-আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিতে পারলে জীবনকে সার্থক মনে করে। এটা আজকে না, এটা অন্তত ৪০ বছর ধরে বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে চলছে। দেশের উচ্চ পর্যায়ের মানুষ নিজের দেশকে ভালোভাবে এ রকম আস্থায় রাখে না। নিজের দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব—বাঙালি তো মানুষ নয়, মানুষের জাত থাকলেও মানুষ হবে না—এ রকম ধারণা পোষণ করে এবং ছেলেমেয়েদের বিদেশী নাগরিকত্ব নেয়ার জন্য উৎসাহিত করে। ছেলেমেয়েরা এ রকমভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব এবং বাবা-মা এ চিন্তাকে কোনোভাবেই সংযত করেন না, সাপোর্ট দেয় সেখানে একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠবে কীভাবে?
বিদেশমুখিতার পেছনে বা এ ধরনের মানসিকতার পেছনে কারণ কী?
বাইরের সংস্কৃতি বিচার-বিবেচনা ছাড়াই গ্রহণ করার প্রবল মনোভাব আমাদের জাতির ভেতরে আছে। শিক্ষিত লোকদের মধ্যে আছে, বিত্তশালীদের মধ্যে আরো বেশি আছে। এ মনোভাব আমাদের জাতি গঠন, রাষ্ট্রগঠন পরিপন্থী। আমাদের কয়েকজন আইজিপি ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা দেখেছি, যারা বিদেশে বিপুল সম্পত্তি করেছেন। যদি বাংলাদেশের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণ ভালোবাসা থাকত তাহলে তারা এটা করতে পারতেন না। আবার তাদের আশপাশের লোকজন, আত্মীয়-স্বজনও এটি বন্ধে কিছু করেননি। এক সময় কেউ যদি এ প্রশ্নের চেষ্টা করতেন, একটা পর্যায়ে তার পাশের লোকেরা নিষেধ করত। এটা করবেন না। তার অফিসে নিচে যারা চাকরি করতেন, অনেকে বলছেন, স্যার এটা করলে কিন্তু দেশের মানুষ আপনাকে ভালোভাবে নেবে না। এ কথা বলার এখন কেউ নেই। অনেক মন্ত্রীর বিরাট অংকের টাকা বিদেশে চলে গেছে, পাচার হয়েছে। এগুলো শেখ হাসিনা জেনেও কিছু করেননি। এ রকম নেতৃত্ব রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবে না।
আমাদের এখন করণীয় কী এবং সরকার কী করতে পারে? বাংলা একাডেমির দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
জাতির জন্য সবচেয়ে দরকারি সে রকম পরিকল্পনা আমার চোখে পড়ছে না। যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা বলেন, সেক্ষেত্রে বলব, অভিধান, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করার মতো কিছু কিছু কাজ করছে বাংলা একাডেমি। সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটা প্রকল্প করেছে বা আগামীতে হয়তো করবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান সংকট রাজনীতি নিয়ে এবং নানা তথ্য বিচার করে কোনটা রাখবে কোনটা নিষিদ্ধ করবে—এসব ব্যাপারে কোনো চিন্তাভাবনা বা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। একটা ব্যাকরণের বই খুব ভালো হলেও এটা মানুষের ওপর ভালো প্রভাব কমই ফেলে। একটা অভিধান যত ভালোই করুক, তার গুরুত্ব আছে। বাংলাদেশে এসব অভিধান প্রকাশ করা হয়েছে, লোকে কিনছেও, কিন্তু এত টাকা ব্যয় করে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে যে আয়োজন সে অনুযায়ী কাজ হয়নি।
সামনে এ কাজ শুরু হওয়ার প্রয়োজন কতটুকু এবং এক্ষেত্রে সরকার কী করতে পারে?
রাজনীতি যদি সঠিক ধারায় চলে তাহলে এসব প্রশ্নের সমাধান রাজনীতিবিদরাই দিতে পারবেন। আমরা কিছু বিষয়ে অনুমান করতে পারি, কাজ করার মতো বক্তব্য তো আমরা দিতে পারি না বা দিলেও কেউ করে না। তার পরও আমরা কিছু লিখি এজন্য যে যদি পাঠক দাঁড়ায়, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা দাঁড়ায়। তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ মঙ্গল হবে। আমরা এটা বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করছি। অনেকে মিলে চিন্তা করাটাও কঠিন বাংলাদেশে। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারে না। সবাই আমি তো এক নম্বর বুদ্ধিজীবী—এ মনোভাব নিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠুক—এটা এখন আগের মতো কোনো নেতার মধ্যে দেখা যায় না। শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল, মওলানা ভাসানীর মধ্যে ছিল, শেরেবাংলা ফজলুল হকের মধ্যে ছিল। এ লিগ্যাসিটা সামনে আসলে এগোয়নি। আমাদের ও অন্যদের মধ্যে যে মনোভাব ছিল, পরবর্তী রাজনীতিবিদের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামনে যাওয়া উচিত ছিল। কিছু নেতা অন্যদের বাতিল করে ‘আমি সব করেছি’ এ রকম মানসিকতা নিয়ে সামনে আসছেন। এটা আমাদের রাষ্ট্র ও জাতি গঠন এবং বাংলা ভাষার উন্নতিতে সহায়ক নয়। তারপরও বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রেখেছেন অনেকে, অনেকে অনুবাদ করেছেন বই। এক দল অত্যন্ত দরদ দিয়ে যোগ্যতা দিয়ে অনুবাদ করছেন। অনূদিত বই পড়তে ভালো লাগে না সর্বত্রই। একটা পৃষ্ঠা পড়েই ধারণাটা করতে পারেন। এতে ভুলত্রুটি থাকলেও, বাক্যের ধরন ভিন্ন হলেও বুঝতে পারেন। আর গুরুত্বপূর্ণ বই একবার একজন অনুবাদ করবেন, ১০ বছর পর আরেকবার এই একই বই নতুন করে অনুবাদ উন্নয়নের চেষ্টা করবেন—এভাবেই একটা বই একজন অনুবাদ করেন, তারপর আরেকজন করেন। এর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ভুল থেকে শুদ্ধতার দিকে উন্নতির সুন্দর দিকে মানুষ এগিয়েছে।
অন্য ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ কিংবা বাংলা ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদে আমরা কত দূর এগিয়েছি?
বাংলা একাডেমি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তার প্রথম পরিচালক ছিলেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক। তার উদ্যোগেই ইউরোপে রেনেসাঁ কালের যে আধুনিক নতুন চিন্তা, বড় চিন্তাবিদ-দার্শনিক, বড় বিজ্ঞানী, তাদের চিন্তা অবলম্বন করে অনেক বইয়ের তালিকা তৈরি করেছিলেন। একটি কমিটি গঠন করে শদুয়েক বই বাছাই করেছেন। এ বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে হবে, এগুলো ক্ল্যাসিক, কালজয়ী রচনা এবং বাংলা ভাষায় কেউ অনুবাদ করলে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হবে, বাঙালির চিন্তাভাবনা উন্নত হবে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর একদম শুরু থেকেই সেই বইগুলো অল্প সময়ের মধ্যে অনুবাদ করে ফেলা হয়েছিল। সেই বইগুলো রচনা করতে ইউরোপে অন্তত এক হাজার বছর সময় লেগেছে। কিন্তু অনুবাদের সংকট হলো, অনেক ক্ষেত্রেই অনুবাদ ভালো হয় না কিংবা অনুবাদ পড়তে ভালো লাগে না। কোনো বই কয়েক দফায় অনুবাদ হলে তা উন্নত হতে পারে। যেমন প্লেটোর রিপাবলিক কিংবা অ্যারিস্টোটলের পলিটিকস ইংরেজিতে ডজনখানেক বার অনুবাদ হয়েছে। এতে প্রতিবারই উন্নতি হয়েছে। বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য মোটামুটি সে ধরনের প্রস্তুতি ও কর্মযজ্ঞ হাতে নেয়া দরকার।
আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব কতটুকু?
ভাষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনের সঙ্গে ভাষা অঙ্গীভূত। মানুষ জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা শেখে না, এটি ধাপে ধাপে আয়ত্ত করে। প্রথমে পারিবারিক পরিমণ্ডলে বাবা-মা, ভাই-বোনদের কাছ থেকে শেখে, পরে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাধ্যমে। এরপর স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচির মাধ্যমে ভাষাকে আরো গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায়। ভাষা চিন্তা ও ভাবনার বাহন—চিন্তা ছাড়া ভাষা হয় না, আর ভাষা ছাড়া চিন্তাও সম্ভব নয়।
আমাদের জাতির ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। মধ্যযুগের বাংলা ভাষাতেও আমরা সে ছাপ দেখব ভাষাচর্চা-চিন্তাচর্চার। তখন কিন্তু অন্য ভাষা থেকে অনেক মহৎ সৃষ্টিকর্ম বাংলায় অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজ শাসনামলেও রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, রামমোহনের মতো বড় মাপের লেখক-চিন্তক ছিলেন, যারা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বপরিমণ্ডলে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোনো ভাষার উন্নতি বোঝা যায় সে ভাষায় কী লেখা হয়েছে তা দিয়ে। বৈষ্ণব ধর্মের বিকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে, ঠিক তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে ভাষার প্রসার ঘটেছে। তবে এশিয়ার অন্যান্য জাতির তুলনায় বাংলার সাহিত্যিক বিকাশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনকাল আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে কী প্রভাব ফেলেছে?
ব্রিটিশ শাসন না থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো, তবে সেটি অনুমান করা কঠিন। তবে এটা নিশ্চিত যে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত থাকলে আমরা আরো ভালো করতে পারতাম। এখন সেটি বদলানো সম্ভব নয়, তাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে হবে।










