আমি বা আমাদের বয়সী অনেক তরুণের যখন ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে, তখন থেকেই আমরা হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমাদের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়কেই আমরা ব্যয় করেছি ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে; এ লড়াইয়ে আমরা যেমন হামলা-মামলার শিকার হয়েছি তেমনি হারিয়েছি আমাদের অনেক সহযোদ্ধাকেও। জনগণের মধ্যকার বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে হাসিনা তার ফ্যাসিস্ট শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে পেরেছিল। আমরা যখন শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিস্ট শাসন হিসেবে চিহ্নিত করেছি তখন থেকেই আমরা শুধু এ লড়াইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে লড়াই করেছি। শুধু তাই-ই নয় বরং এ লড়াইকে সংগঠিত করে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই তৈরির চেষ্টা যেমন ছাত্র ফেডারেশনের ছিল তেমনি আমাদের দল গণসংহতি আন্দোলনও জাতীয় পর্যায়ে সেই লড়াই গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে জনগণের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হয়—সেই বোঝাপড়া থেকেই আমরা গড়ে তুলেছিলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য যা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একমাত্র সাংগঠনিক কাঠামো পুরো ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের কালে; যদিও এ জোট কাঙ্ক্ষিত লড়াই গড়ে তুলতে পারেনি। সেই সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও যুগপৎভাবে সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে শ্রমজীবী, পেশাজীবীসহ সব স্তরের ঐক্য গড়ে তুলে তার কমন রাজনৈতিক লক্ষ্য গড়ে তোলা হচ্ছিল; ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের দাবিতে যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল গণ-অভ্যুত্থান। কেননা আমরা বুঝতাম জনগণের অভ্যুত্থান ছাড়া ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন সম্ভব নয়। যুগপৎ আন্দোলন জনগণের মাঝে সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি করলেও তা গণ-অভ্যুত্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয় কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান তৈরির জন্য জনগণের বিভাজনকে কমিয়ে তাকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রাথমিক কাজটা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছিল যুগপৎ আন্দোলন এমনকি অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লক্ষ্যকেও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। ‘সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ ছাড়া আমাদের যে মুক্তি নেই তা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যুগপৎ আন্দোলন।

কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে ৫ জুন যখন উচ্চ আদালত রায় প্রদান করেন তখনই তা শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে; সেদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। আমরা সেই আন্দোলনে যুক্ত হই; ৯ জুন ছাত্র ফেডারেশনের ছাত্র সমাবেশ থেকে আমরা সারা দেশের নেতাকর্মীদের এ আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা প্রদান করি। জুলাইয়ের প্রথমার্ধে এ আন্দোলনে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী অংশ নিতে শুরু করেন, যা ফ্যাসিস্টদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, যদিও তখন পর্যন্ত এ আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল না। কিন্তু জনসমর্থনহীন সরকার রাজপথে মানুষের উপস্থিতি সবসময়ই ভয় পায় তাই আন্দোলন দমাতে তারা হামলা-মামলা-হত্যার পথ বেছে নেয়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, সেদিন রাতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা সারা দেশের মানুষকে হতবিহ্বল করে তোলে, সারা রাত দেশের মানুষ ঘুমাতে পারেননি, মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। ১৬ ‍জুলাই আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে নিজেকে তুলে ধরেন বন্দুকের সামনে যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। সারা দেশে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাজপথে অবস্থান নেয়; কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপান্তরিত হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে। তখন পর্যন্ত শ্রমিক-কৃষকের কোনো ‘দাবি’ না থাকলেও দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের ক্ষত আর সন্তান হারানোর বেদনা তাদের রাজপথে টেনে আনে। জনগণের মাঝে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে ওঠে; উপস্থিত হয় ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যাতে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতেও মানুষ কুণ্ঠাবোধ করে না। ৩ আগস্ট অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা’। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটে; ভারতে পালিয়ে যান তিনি।

শুরু হয় অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় পর্ব। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের গাঠনিককালে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা রক্ষা করাকেই আমরা প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করি। কেননা ফ্যাসিস্ট শাসনে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। তার পুনর্গঠন ও ক্ষমতা কাঠামোর সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠায় সেই ঐক্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের প্লাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সঙ্গে ১২ আগস্ট টিএসসির বৈঠকে আমরা এ ঐক্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ ও জুলাই অভ্যুত্থানকে গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাই। যেহেতু জুলাই অভ্যুত্থান ছাত্র নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে, তাই সম্মিলিতভাবে তার আকাঙ্ক্ষা নির্ধারণ করার আহ্বান জানাই। কিন্তু তা করা হয়নি, বরং গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা এ অভ্যুত্থানের ঐক্যকে দুর্বল করে। এমনকি এ সময়কালে গণ-অভ্যুত্থানের প্লাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ থেকেও অভ্যুত্থানের সংগঠক বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বের করে দেয়া হয় যা এ ঐক্যকে চূড়ান্তভাবে বিনষ্ট করে এমনকি ছাত্রদল-ফেডারেশনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন যাদের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাস আছে এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে সারা দেশে সংঘটিত করতে যারা ভূমিকা রেখেছেন; একটা গ্রান্ড ন্যারেটিভ তৈরি করে তাদেরকেও অভ্যুত্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘৃণিত চেষ্টা করা হয়। এ চেষ্টা থেকে এমনকি ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও বাদ পড়েনি। এ সব কিছুই তারা করেছেন অভ্যুত্থানকে কুক্ষিগত করতে; অভ্যুত্থানকে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করতে। আর সে কারণেই এ ঐক্য টিকিয়ে রাখতে তাদের কোনো মনোযোগ আমরা দেখিনি যা এ অভ্যুত্থানকে দুর্বল করেছে এবং আমরা যা অর্জন করতে পারতাম তাকে কঠিন করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের সংগ্রামের পথ ছাড়িনি; আমরা আবু সাঈদ-জুলফিকার শাকিল-মীর মুগ্ধ-রিয়া গোপসহ সব শহীদের কাছে দায়বদ্ধ। যে বৈষম্যহীন সমাজের জন্য আমাদের নিরন্তর লড়াই; আমরা সে লড়াই চালিয়ে যাব।

সৈকত আরিফ: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন