মানুষের জানমালের নিরাপত্তা মৌলিক ও মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। সে হিসেবে বলা যায়, এটি একপ্রকার মৌলিক মানবাধিকার। মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত অনেক বিষয় নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় না। কিন্তু নাগরিকের মৌলিক অধিকার বা মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। আর এ দায়িত্বের কথা দেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১১ নং অনুচ্ছেদেও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে...’। অর্থাৎ জননিরাপত্তা বিষয়টি কেবল জনগণ-সংশ্লিষ্টই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক চর্চারও অংশ। কিন্তু এর পরও দেখা যাচ্ছে, দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমনের প্রেক্ষাপটে জনগণ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছে। তাই ২০২৫-এ পা রেখে সবার প্রত্যাশা ছিল এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। যদিও তেমন কিছু হয়নি। বরং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্য বলছে যে সদ্য বিদায়ী বছরে দেশে সহিংসতার পরিমাণ বেড়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়ে গেছে।
সম্প্রতি আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর শুধু মব সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। আগের বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ১২৮। আর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এ সময় নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা ও বাউল সম্প্রদায়ের সদস্যদের হেনস্তা, মারধর এবং জুতার মালা পরানোর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য জানাচ্ছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর গত বছরের অক্টোবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূতভাবে এবং আরো ১৫৩ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে।
এসব তথ্য দেশের জনগণের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে তার চিত্রই তুলে ধরেছে। এছাড়া এটিই স্পষ্ট যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেনি। সেই সঙ্গে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি, যা অপরাধের মাত্রা বাড়িয়েছে। যদিও এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যেখানে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীকে গ্রেফতার করা ও বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো এগুলো হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়েছিল কিংবা তুলনামূলক ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠানে হামলার সঙ্গে জড়িত। অথচ দেশের সর্বস্তরে জনগণের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও বিচার বিভাগের তৎপরতা একই হওয়া প্রয়োজন। নয়তো সামাজিক বৈষম্য প্রকট হয়।
সব মিলিয়ে জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫’-এ উঠে এসেছে। জনগণকে স্বস্তি দিতে চাইলে সরকারকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও দমনে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামীতে সহিসংসতা বাড়বে বৈ কমবে না। বিশেষত এক্ষেত্রে নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন জরুরি। এজন্য আইনের যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা উচিত। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনা বা পক্ষপাতিত্ব স্থান পেতে পারে না। বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য রাজনৈতিক প্রভাবও জনগণের আস্থা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। পাশাপাশি পুলিশের মধ্যে যে ঢিলেঢালা মনোভাব ও সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয়, স্বাধীন ও পেশাদারভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও অপরাধ সংঘটিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আবার অপরাধ প্রতিরোধের তৎপরতাও যৎসামান্য। আগে থেকে সম্ভাব্য অপরাধ শনাক্ত করা ও প্রতিহত করার কৌশল অনুপস্থিতই বলা যায়। যার নজির হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা। এসব ঘটনা পুরো আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন। তা না হলে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস আরো বিস্তৃত হবে। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হবে।
অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণ ও ভূমিকা পালন করা উচিত। পুলিশ প্রশাসনকে দুষ্কৃতকারীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের নানা ধরনের দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান পরিচালনা করা উচিত। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার পেছনে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না, থাকা উচিত নয়। প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে হবে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারের আওতায় আনা গেলে সেটি অপরাধীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় সেটি মনে রাখা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকার যদি নির্বাচনের আগে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনতে না পারে, সামনে নির্বাচিত সরকারের জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেবে। কেননা এর সঙ্গে আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতার সংযোগ রয়েছে। দেশের সার্বিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং নির্বাচিত সরকারকেও এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।










