জাতীয় পরিসংখ্যান প্রকাশকারী সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত দীর্ঘকাল ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। নানা সময় রাজনৈতিকভাবে পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করা হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যবহারকারীদের ঠিক কত শতাংশ সংস্থাটির তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করে তা জানতে এক জরিপও করেছিল বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র (বিআইডিএস)। এতে দেখা যায়, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যবহারকারী বিবিএসের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস মূল্যস্ফীতি পরিসংখ্যান নিয়ে। এদিকে সম্প্রতি রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে এক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বিবিএস। এতে আবারো নানা সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে সংস্থাটি।
বিগত সময়ে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিবিএসকে ব্যবহার করা হয়েছে, এখনো তা একইভাবে করা হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিসংখ্যানবিদরা। পাশাপাশি দ্রুততার সঙ্গে সাম্প্রতিক জরিপটি পরিচালনার ফলে কাজের মান নিয়েও ফের প্রশ্ন তুলেছেন তারা। পরিসংখ্যানের সাবেক কর্মকর্তাদের মত, সব সরকারের আমলেই বিবিএসকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখনো এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
বিবিএসের ভুল ও প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যানের নেপথ্যে থাকা নাম হিসেবে প্রায়ই উঠে এসেছে বিগত সরকারের কথা। বিগত সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিবিএসের জরিপ প্রভাবিত করা হয়েছে তথা পরিসংখ্যানের রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, সংস্থাটিকে ব্যবহার করে জনসংখ্যা, জিডিপির আকার-প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই বানোয়াট পরিসংখ্যান তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে বিগত সরকারের পতন হলে সেসব পরিসংখ্যানের নানা দিক উন্মোচিত হয়। লুক্কায়িত অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। প্রত্যাশা ছিল, সঠিক পরিসংখ্যান তৈরিতে দায়িত্ব নেয়া নতুন অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রণী হবে। এজন্য বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে। কেননা প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান সঠিক ও কার্যকর নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। তবে দায়িত্ব নেয়ার সাড়ে পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। উল্টো রাজনৈতিক বিষয়ে জরিপের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
মূলত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অনুরোধে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জরিপের কাজটি করা হয়েছে বলে দাবি বিবিএসের। এ কমিশনের ভাষ্যমতে, কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মানুষের মতামতের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রস্তাবের লক্ষ্যে ওই জরিপ করা হয়েছে। আর এসব কাজে সহায়তা করার জন্যই বিবিএস সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বর্তমান সরকার ও সংস্কারের প্রয়োজনে বিবিএস এ কাজ করতেই পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি বাধ্যও করতে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যখন বিবিএস নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ তখন বিবিএসকে দিয়ে নতুন করে জরিপের কাজ করানোর আগে তার সংস্কার হওয়া জরুরি ছিল কিনা। অথচ বিবিএসের পরিসংখ্যানের মান উন্নয়ন ঘিরে কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। এ কথা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে সংস্থাটির সূত্র থেকেই। সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় সংস্থাটির নিজস্ব সংস্কারের কাজ সেভাবে শুরু হয়নি, যা মোটেও কাম্য নয়।
সরকারের উচিত বিবিএসের মূল কাজগুলো যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সেদিকে নজর দেয়া। এজন্য এর কাঠামোগত সংস্কার করা প্রয়োজন। দেশের জনমিতি, স্বাস্থ্য, শিল্প ও শ্রম, জাতীয় হিসাব, মূল্য ও মজুরি, শিল্প উৎপাদন ও মূল্যসূচক, দারিদ্র্য, পরিবেশগত, জেন্ডার এবং কৃষিবিষয়ক পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও তথ্য পর্যালোচনা এর মূল কাজ। এসব বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া কার্যকর নীতি গ্রহণ করা কঠিন হবে। আর সঠিক তথ্য-উপাত্ত পেতে হলে বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা অত্যাবশ্যক।
বিশ্লেষকদের মতে, বিবিএসের পরিসংখ্যান প্রকাশে দক্ষতা ও পেশাদারত্বের অভাব রয়েছে। এখানে পেশায় দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। তাছাড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় সংস্থাটির জরিপের ফলাফল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। আবার সংজ্ঞাগত পরিবর্তনের ফলে আগের জরিপের সঙ্গে নতুন জরিপের তথ্য অনেক সময় তুলনাও করা যায় না। এসব কারণে বিবিএসের পরিসংখ্যানের প্রতি বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এসব অসংগতি দূর করতে প্রয়োজনে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে, যারা প্রতিনিয়ত বিবিএসের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখবে। এই কমিশনে দক্ষ পরিসংখ্যানবিদদের আনতে হবে যারা পরিসংখ্যান প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করবেন এবং প্রয়োজনীয় ইনপুট দেবেন।
বিবিএসের প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে সঠিক, নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়ন। এ লক্ষ্য পূরণে বিবিএস পরিচালিত প্রধান প্রধান জরিপসহ অন্যান্য পরিসংখ্যানগত কার্যক্রমের পরিচালনা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করা জরুরি। দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যথাসময়ে তথ্য বা রিপোর্ট প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বিবিএসের জরিপ পরিচালনা ও ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে কারচুপি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার দ্রুত করতে গিয়ে কাজের মান খারাপ হবে সেটিও কাম্য নয়। সুতরাং সময় ও কাজের মান উভয় দিকেই নজর রাখতে হবে।
কোনো বিষয়ের পরিসংখ্যান যথাযথ হলে তা সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াকেই সহজ করে তোলে। সঠিক পরিসংখ্যান জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক পরিস্থিতিকে অনুকূলে রাখতে সহায়ক হয়। আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-বিনিয়োগেও সহায়ক হয়। তাছাড়া বর্তমান সরকারের অন্যতম কার্যক্রম যেহেতু সংস্কার ঘিরে, ধারণা করা যায় যে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া সেসব কার্যক্রম সফল করে তোলা কঠিন হবে। এজন্য হলেও বর্তমান সরকারের বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বিবিএসের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে। যে ক্রান্তিকালে এ সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, ভুল পরিসংখ্যান তাদের দায়িত্ব পরিচালনা আরো জটিল করে তুলবে—এটি কখনই প্রত্যাশিত নয়। তাই চাওয়া সরকার বিবিএসের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে মনোযোগী হবে।










