দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেসব দুর্নীতি হয় তার একটি বড় অংশ ঘটে কেনাকাটায়। সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অনিয়ম কমাতে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ইজিপি পদ্ধতি চালু হয় ২০১১ সালে। চালুর পর থেকে এ পদ্ধতিতে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০১২-২৪ সালের মধ্যে ব্যয় হওয়া বিপুল পরিমাণ এ টাকা খরচ করা হয়েছে গুটিকয়েক ঠিকাদার বা ঠিকাদার গোষ্ঠীর মাধ্যমেই। ইজিপি পদ্ধতি চালু হলেও অনিয়ম-দুর্নীতি কমেনি বরং আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সরকারি ক্রয়ের বাজার দখল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। প্রভাবশালী ঠিকাদারদের চক্র আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনৈতিক চর্চার মাধ্যমে সুস্থ প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থার উচ্চপর্যায়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্বের পরিবর্তনে শীর্ষ কার্যাদেশগুলো হাতবদল হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি এবং ইজিপি প্রক্রিয়ার যুগোপযোগী সংস্কার প্রয়োজন। তবে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও চর্চায় ইতিবাচক পরিবর্তন ছাড়া এক্ষেত্রে বাস্তব সুফল অর্জন অসম্ভব।
দেশের সরকারি ক্রয় খাত বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণহীন দখলদারত্বের হাতে জিম্মিদশায় নিমজ্জিত হয়েছে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় খাতের দুর্নীতি-অনিয়মের জন্য মোট ক্রয় বাজেটের ২৭ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হয়। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, ইজিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হবে, সরকারি ক্রয় খাতে দুর্নীতি কমবে এবং ব্যয়িত অর্থের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যাবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ইজিপির মাধ্যমে ডিজিটাইজেশন করা হলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করা হয়েছে। আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সরকারি ক্রয়ের বাজার দখল আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
ক্রয়পদ্ধতি ও বাজারমূল্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে দুর্নীতি অনেকাংশেই লাঘব করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সরকারি কেনাকাটায় আমলা, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকারি কেনাকাটায় ই-টেন্ডারেও দুর্নীতি হচ্ছে, ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে গুটিকয়েক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। টেন্ডারের প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁসের মাধ্যমে এ সুযোগ করে দিচ্ছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। ক্রয় আইনে এ অপরাধ বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলাযোগ্য। এমন বাস্তবতায় আইনটির কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে ক্রয় আইনের সংস্কার জরুরি।
এছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন সরকারি প্রকল্প লাভের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শীর্ষ ঠিকাদারদের আধিপত্যকে প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে শীর্ষ ঠিকাদারদের আধিপত্য বদলে যায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গবেষণা বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি সরকারি ক্রয় খাতে ব্যয় করেছে শীর্ষ ১০টি মন্ত্রণালয়। এর সিংহভাগ, ৬১ শতাংশ কার্যাদেশ পেয়েছে শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এ কার্যাদেশ প্রাপ্তির হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এখানে বাজারের বিশাল অংশ প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দখলে। দ্বিতীয়ত, একক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রভাবশালী ঠিকাদারদের চক্র নীতিমালার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যৌথ অংশীদারত্ব বা জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে কার্যাদেশ নেয়ার সুযোগকে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করেছে ও দখলদারত্ব আরো ঘনীভূত করেছে।
সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বেশ কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি। সেগুলো হলো, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) কর্তৃক জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, যাতে যোগসাজশের মাধ্যমে বাজার দখলে সুযোগ না থাকে; সিন্ডিকেট ভাঙতে বিপিপিএ কর্তৃক প্রতিযোগিতামূলক আইন প্রণয়ন করা এবং জয়েন্ট ভেঞ্চারের কার্যক্রম সীমিতকরণ; মার্কেট শেয়ারের ক্ষেত্রে একক ঠিকাদার ও জয়েন্ট ভেঞ্চারের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করা, যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়; বিপিপিএ-সহ ক্রয়কার্যক্রমে জড়িত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক ভালো চর্চাগুলো বজায় রাখা এবং বাজারে একচ্ছত্র বাজার ব্যবস্থার বদলে প্রতিযোগিতমূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নীতিমালা সংশোধন করা, যেন প্রতিষ্ঠান ও জয়েন্ট ভেঞ্চারের বেনিফিশিয়াল ওনারশিপের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং যে চুক্তিগুলো ই-প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় হয়নি সেগুলোকে দ্রুত ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা।
আবার ইজিপি কর্তৃপক্ষের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থার নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে শীর্ষ কার্যাদেশগুলো হাতবদল হয়েছে, কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থেকেছে, যা ক্রয় খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অকাট্য প্রমাণ। ইজিপিসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইনের অপপ্রয়োগ করে অনিয়মকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে, বিশেষত জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। ইজিপি প্রবর্তনের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতা বাড়ানো, কিন্তু সে চিত্র আমরা দেখছি না বরং আইনের ঘাটতিকে পুঁজি করে বাজার দখলের চর্চা অব্যাহত আছে। সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে দুর্বল আইনের সংস্কার প্রয়োজন।










