এবার বাজেটের আকার বড় হলেও এর ধরন ও প্রস্তাবে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। করহার বাড়ানোকে কেন্দ্র করেই পরিবর্তন হতে পারে। এজন্য বেসরকারি খাত ও স্থির আয়ের চাকরিজীবী থেকে শুরু করে স্বল্প আয়ের টিআইএনধারীরাও উৎকণ্ঠায় ভুগছেন। সরকারের ইশতাহার এবং সেখানে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এ বছরের বাজেট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মিলছে।

সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থনীতিকে দ্বিগুণ হতে হবে। সমন্বিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার (সিএজিআর) সূত্র অনুযায়ী, এক্ষেত্রে প্রতি বছর ৯ শতাংশ হারে নমিনাল জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। অন্যদিকে শুধু প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৬-৭ শতাংশ হারে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। থাকতে হবে মধ্যম মাত্রার মূল্যস্ফীতি এবং স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো রোডম্যাপ রয়েছে বলে জানা যায়নি। একই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যদিও আয়কর আদায়ে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের সময় কোন কোন খাতে ব্যয় কমানো হয় সে বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। ব্যয় সমন্বয় সম্পর্কে সীমিত তথ্য প্রকাশ জবাবদিহিতা কমায় এবং আর্থসামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন কঠিন করে তোলে। বাজেট সংশোধন এখন একটি নিয়মিত চর্চা তবে কোন খাতে ছাড় দিয়ে কোন খাতে বরাদ্দ সঠিক অবস্থানে থাকল তা সাধারণের কাছে ওইভাবে পৌঁছে না। সরকারকে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ সম্পর্কে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং কোন কোন খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। এতে জবাবদিহি ও জনআস্থা দুটোই বাড়বে। কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যয় যৌক্তিকীকরণ এবং প্রকল্প পর্যবেক্ষণ জোরদারের মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এভাবে সাশ্রয় হওয়া অর্থ উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন খাতে পুনর্বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

রাজস্ব আয় বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি করদাতাদের ওপর করহার বাড়ানোর আভাস মিলেছে। সম্পদ কর প্রবর্তনের কথাও জানা গেছে। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি বেশি কর দেবেন এটাই যৌক্তিক। তবে নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলে তারা কর দেয়ায় অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। প্রায় ২৩ হাজার অধিক আয়ের ব্যক্তি যাদের উচ্চ হারে ব্যাংক ডিপোজিট রয়েছে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বৃহৎ করদাতা ইউনিটে কর প্রদানকারীর সংখ্যা মাত্র ৪০০। প্রত্যক্ষ করের সবচেয়ে বড় অংশ এরাই প্রদান করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যেহেতু তথ্য রয়েছে তাই ক্রমান্বয়ে করজাল বাড়িয়ে যারা কর দেয় তাদের ওপর বাড়তি কর না চাপিয়ে কর-রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে নতুন করহার বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।

সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প উৎপাদন সূচকগুলো কমেছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বদলে কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে উৎপাদন খাতের সাধারণ সূচক ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এটি শিল্প খাতের কার্যক্রমে ধীরগতি ও ব্যবসায়িক উদ্যম কমে যাওয়ার প্রতিফলন। এছাড়া নতুন সরকারের প্রাথমিক নীতিগত উদ্যোগ সত্ত্বেও ব্যবসায়িক আস্থা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বিনিয়োগ পরিস্থিতি দুর্বল, বাড়ার তেমন লক্ষণও নেই। এ লক্ষ্যে বাজেটে কী কী সুযোগ তৈরির ঘোষণা আসবে তার প্রতীক্ষায় রয়েছে বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যদিও সমপরিমাণ উন্নয়ন ব্যয় লক্ষ করা যায়নি। সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ সুদ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে পেনশন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধার পেছনে উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাওয়ায় উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য আর্থিক পরিসর সীমিত হয়ে পড়ছে। এ কারণে নতুন কর্মসংস্থান হয়নি বললেই চলে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট, এপ্রিল ২০২৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাড়ার অনুপাতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি পর্যাপ্ত নয়, নতুন কর্মসংস্থানের বেশির ভাগই কৃষি খাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ১ কোটি ৪০ লাখ বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। এর মধ্যে প্রতি ১০টি নতুন চাকরির প্রায় সাতটি কৃষি খাতে হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী কাঠামোগত রূপান্তরের বিপরীত চিত্র। আমদানির পরিমাণ হ্রাসের কারণে কাস্টমস খাতে রাজস্ব পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অবশ্য এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অথবা অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির প্রতিফলন হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতা ও কর-আনুগত্যের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। যদিও আয়কর খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামো এখনো পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ বেসরকারি খাতের দীর্ঘদিনের অর্থায়ন, জ্বালানি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতার কোনো সুরাহা হয়নি। সরকার আগামী দুই বছর সময় চেয়েছে। এর মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, বৃহৎ রফতানি বাজারগুলোতে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তৈরি হওয়া নীতিমালা বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশকে আরো দুরূহ করে তুলেছে। এ বিষয়ে নীতিমালার ইঙ্গিত এ বাজেটের ক্ষেত্রে এখনো পাওয়া যায়নি। স্থানীয় এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উদ্যোক্তাকে সহায়তা এবং ব্যবসায়ের গতি ফিরিয়ে আনতে জাতীয় বাজেটকে একটি স্থিতিশীলতামূলক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সুরক্ষা পায়, উৎপাদনশীল খাত সহায়তা পায় এবং অর্থনৈতিক আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।

এ প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পুনরুজ্জীবনে একটি শক্তিশালী ও দৃশ্যমান নীতিগত ঘোষণা অত্যন্ত জরুরি। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে ‘এসএমই পুনরুজ্জীবনের বছর’ ঘোষণা করতে পারে। এটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হবে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বরাদ্দ যেন মধ্যবর্তী সময়ে কমানো না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও আয় হ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহায়তামূলক কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে যুব ও স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন শ্রমঘন প্রকল্পে সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। এসএমই ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহার হচ্ছে না। বছরে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার আয়করমুক্ত হলেও অনেক নারী উদ্যোক্তা এ সুবিধা সম্পর্কে অবগত নন বা ব্যবহার করতে পারছেন না। অন্যদিকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ভ্যাটমুক্ত, যা আগে ৫০ লাখ টাকা ছিল। কিন্তু গো সেভেন্টিনের মাধ্যমে প্রায় ১৫০ ধরনের ব্যবসাকে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা থেকে বাদ দেয়ায় এ সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।

আয়কর ও ভ্যাট—উভয় ক্ষেত্রেই সমপরিমাণ অব্যাহতি সীমা নির্ধারণ করলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত হবেন। এছাড়া অর্থ আইন অনুযায়ী নারী উদ্যোক্তাদের কর নির্ধারণের সময় অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সুবিধাও রয়েছে, যা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশের বর্তমান ভ্যাটনীতি এসএমই-বান্ধব নয়, বর্তমানে ১১টি ভ্যাট স্তর রয়েছে। কেবল ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত খাত থেকেই মোট ভ্যাটের ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ সংগ্রহ হয়, বাকি প্রায় ৫০ শতাংশ আসে ট্রাংকেটেড উৎস থেকে। ফলে এসএমই ব্যবসাগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা পাচ্ছে না। একটি একক ভ্যাট হার এবং দ্রুত ক্রেডিট ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভ্যাটের মূল উদ্দেশ্য ক্যাসকেডিং কর এড়ানো, যা বাংলাদেশে এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।

বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার অভাব দীর্ঘদিন ধরে এসএমই রফতানিকারকদের অন্যতম দাবি ছিল। সরকার সম্প্রতি আটটি খাতের জন্য ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দিয়েছে। তবে এ খাতগুলোর অধিকাংশই প্রকৃত এসএমই নয়। উপরন্তু ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান কঠিন, আবার ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ করাও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তাই এসএমই রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন এসআরও পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

আয়কর ব্যবস্থায় উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) এবং ন্যূনতম কর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে নিয়মিত করদাতাদের প্রকৃত করভার প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে যাচ্ছে। ন্যূনতম কর অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক, আর টিডিএস ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিল্ডের একটি সিমুলেশন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সমন্বয়যোগ্য নয় এমন টিডিএস জিডিপির প্রায় দশমিক ৯ থেকে ২ দশমিক ১ শতাংশ সমপরিমাণ কার্যকর মূলধন আটকে রাখছে, যা বিনিয়োগকে বছরে দশমিক ৩৬ থেকে দশমিক ৮৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়ে দিচ্ছে। ভুল করনীতির কারণে করজাল সম্প্রসারণ সম্ভব হচ্ছে না এবং কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রয়েছে।

বাজেট একটি নিয়মিত বার্ষিক কার্যক্রম, যা প্রণীত এবং বাস্তবায়ন কিছু নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকারের ইলেকশন মেনিফেস্ট অনুযায়ী ফিসক্যাল এবং মনিটারি পলিসি হারমনাইজেশন করা হবে বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার এ বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকগুলো থেকে ধার নিয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। পলিসি রেট ১০ শতাংশে রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে এবং মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিতে একদিকে তারল্য বেড়েছে, অন্যদিকে মনিটারি পলিসি কন্ট্রাকশনারি রয়েছে। বাজেটে প্রাক্কলন এবং মানিটরি পলিসি সমন্বয় থাকা দরকার। কিছু করনীতি পুনর্গঠন রাজস্ব আহরণ বাড়াতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, তবে কাঠামোগত সংস্কার বিশেষভাবে জরুরি।

ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড