বিষয়টি শঙ্কার এবং সেই সঙ্গে সংখ্যাগুলো অভাবনীয়। গত বছর বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ১০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়টিই ভয়ংকর। ৮০ বছর আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলেছে, তখনই সারা বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়ংকর বিধ্বংসী শক্তির পরিচয় পেয়েছে। ঘটনাটি ছিল মানবতার বিরুদ্ধে একটি ন্যক্কারজনক কাজ। কিন্তু এ অকথ্য ঘটনা থেকে বিশ্ব কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। ফলে আজ পৃথিবীর নয়টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের গর্বিত অধিকারী। নয় দেশের মধ্যে পাঁচটি আবার উন্নয়নশীল বিশ্বের, যেখানে লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে, অগণিত মানুষ বুভুক্ষার শিকার এবং বিরাটসংখ্যক মানুষ প্রান্তিক এবং নাজুক জনগোষ্ঠী। তবু পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের প্রতিযোগিতা চলছেই। বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্রধারীদের মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকা মহাদেশ নেই, সেই সঙ্গে নেই পূর্ব ইউরোপ কিংবা আরব অঞ্চল। ২০২৫ সাল নাগাদ তাই বিশ্বের মাত্র নয়টি দেশ বৈশ্বিক পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য কত অর্থ ব্যয় হয়। ২০২৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে প্রতি সপ্তাহে মাত্র ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, প্রতিদিন ২৭ কোটি ডলার ও প্রতি সেকেন্ডে ৩ হাজার ২০০ ডলারের মতো। গত বছরের পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য মোট ব্যয় ১০ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। নয় দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই সর্বোচ্চ ব্যয় করেছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা বাকি আটটি দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি এবং মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ। ২০২৪ সালে ভারত ব্যয় করেছে ২৬০ কোটি ডলার, যা পাকিস্তানের ব্যয়িত ১১০ কোটি ডলারের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। অথচ একই বছরে ভারত ও পাকিস্তানে মোট সাড়ে ১৭ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছিল। ভারতে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ অপুষ্টির শিকার এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ২ কোটি মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

২০২০-২৪ সাল পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো মোট ৪১ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। গত বছর এ দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, তা দিয়ে ২৮ বছর জাতিসংঘের বার্ষিক ব্যয় মেটানো যেত। এ পাঁচ বছরে যে ব্যয় করা হয়েছে, তার মধ্যে ২৪ হাজার কোটি (মোট ব্যয়ের ৫৭ শতাংশ) ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ৫ হাজার কোটি ডলারের ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পেছনে রয়েছে চীন। তারা পাঁচ বছরের মোট ব্যয়ের ১৩ শতাংশের অংশীদার। পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র এ খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে ১০৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ৫২ ও ফ্রান্স ৩৮ শতাংশ।

বিশ্বব্যাপী অন্ততপক্ষে ২৬টি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান আছে, যারা পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর কাজ করে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ছিল ন্যূনতম ৪ হাজার কোটি ডলার এবং সে বছর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আরো ৪৬ হাজার কোটি টাকার চুক্তি চলমান ছিল। গত বছর তাদের ২ হাজার কোটি ডলারের নতুন কাজ দেয়া হয়। পারমাণবিক অস্ত্রধারী নয়টি দেশে তাদের স্বার্থের সপক্ষে তদবিরে প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।

এ পটভূমিকে পেছনে রেখে একটি প্রশ্ন করা যাক। যদি বিশ্ব সব রকমের পারমাণবিক অস্ত্রায়ণ বন্ধ করে দেয়, তাহলে সে অর্থ দিয়ে বিশ্বে মানব উন্নয়ন, মানুষের কুশল ও কল্যাণে কী করা যেত? প্রাক্কলন করা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে বার্ষিক ৭ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি ডলারের প্রয়োজন। চালচিত্র ও অনুমানের ব্যবধানের কারণেই প্রাক্কলিত সংখ্যার ভিন্নতা বিদ্যমান। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, পারমাণবিক অস্ত্রায়ন বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি বছর যে অর্থ বাঁচবে, তা দিয়েই বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় অর্থের সিংহভাগের জোগান হয়ে যাবে। ২৬ হাজার কোটি টাকার সংস্থান হলে বিশ্বে প্রতিরোধযোগ্য সব মাতৃমৃত্যু ঠেকানো, পরিবার পরিকল্পনার অপূরণীয় চাহিদা মেটানো এবং গৃহাভ্যন্তরে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব। টিকার অভাবে বিশ্বে বহু শিশু অকালে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বে সর্বজনীন টিকার জন্য প্রয়োজন ৭-৮ হাজার কোটি ডলার। এ অর্থ দিয়ে সব টিকার ওষুধ ক্রয় এবং তার সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।

২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে বুভুক্ষা নিরসনে প্রয়োজন হবে ২৬-৩৩ হাজার কোটি ডলারের মতো। যদি শুধু চরম বুভুক্ষার ওপর দৃষ্টি দেয়া হয়, তাহলে লাগবে বার্ষিক ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। যদি অগ্রাধিকার হয় দীর্ঘস্থায়ী বুভুক্ষা, তাহলে দরকার হবে বছরে ১৪ কোটি ডলার। এ বিবেচনাগুলো আজ আরো প্রাসঙ্গিক, যেখানে বিশ্বের ১৩টি দেশে সাড়ে ১৫ কোটি মানুষ আজ চরম খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি। এ দেশগুলো হচ্ছে বুর্কিনা ফাসো, শাদ, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, গাজা অঞ্চল, হাইতি, মালি, মায়ানমার, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন। যে ১৫ কোটি মানুষ চরম খাদ্য সংকটের শিকার, তার সাড়ে আট কোটিই তিনটা দেশে বসবাস করে—নাইজেরিয়া (তিন কোটি), কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (২ দশমিক ৮ কোটি) ও সুদান (আড়াই কোটি)। এসব দেশের কোনো কোনোটিতে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা রয়েছে।

মূল কথা হচ্ছে, পারমাণবিক অস্ত্রায়ণ বন্ধ হয়ে গেলে সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে বিশ্বে মানব উন্নয়নে বেশকিছু দিকের সিংহভাগ অর্থায়ন সম্ভব। মানব বঞ্চনা রোধে পন্থা ও সম্পদ সবই মানবজাতির কাছে আছে। কিন্তু তা না করে আজ নতুন করে সামরিকায়ণের ডাক দেয়া হচ্ছে। দুভাবে এ প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এক. বিশ্বে সামরিক এবং পারমাণবিক অস্ত্রায়ণের উৎপাদন, ব্যয় ও বাণিজ্য ঊর্ধ্বমুখী। বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৭ লাখ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আসলে গত দশকে প্রতি বছর বিশ্বের সামরিক ব্যয় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে এবং ২০১৫-২৪ সাল পর্যন্ত এ ব্যয় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। আজ বিশ্বের মোট উৎপাদন মূল্যের ৩ শতাংশই সামরিক ব্যয়ে যায়। গড়ে সরকারি ব্যয়ের ৭ শতাংশ হয় সামরিক খাতে। বর্তমান বিশ্বে মাথাপিছু সামরিক ব্যয় হচ্ছে ৩৩৪ ডলার, যা ১৯৯০ সালের পর সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের ন্যাটো সদস্যরা তাদের সামরিক ব্যয় জাতীয় উৎপাদনের ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে।

দ্বিতীয়ত, সার্বিক সামরিক ব্যয়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রায়ণের অংশ বেশ উল্লেখযোগ্য। যেমন যুক্তরাজ্যের সামরিক ব্যয়ের ১৩ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য। ফ্রান্সের এ অনুপাত ১১ ও পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে তার বার্ষিক ১ লাখ কোটি ডলারের ৬ শতাংশ ব্যয় হয় এর পেছনে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র সংঘাত ও যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একটি আশঙ্কা থেকেই যায়, যখন যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রয়ে যায়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সহভাগের পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। এটা একটা কুপরামর্শ, কারণ এতে এ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা আরো বেড়ে যাবে, যদি এসব অস্ত্রশস্ত্র ভুল হাতে গিয়ে পড়ে।

এতকিছু সত্ত্বেও পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো পৃথিবীতে এখনো সংখ্যালঘু। বিশ্বে ২০০টি দেশের মধ্যে মাত্র নয়টির (মোট দেশের ৫ শতাংশেরও কম) হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। এর বিপরীতে ৯৮টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রায়ণ নিষিদ্ধ করার চুক্তিতে অংশগ্রহণ করে স্বাক্ষর করেছে ও অনুমোদন করেছে। এ চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং এ-জাতীয় অস্ত্র ধ্বংস করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এসব দেশ অঙ্গীকার করেছে তারা নিজেরা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে যাবে না, তাদের ভূখণ্ডে অন্য কোনো দেশকে পারমাণবিক স্থাপনার সুযোগ দেবে না এবং এটি দূরীকরণে কাজ করবে। বিশ্বে ১১০টি দেশের ৭০০টি সংস্থা এ লক্ষ্য অর্জনে এসব দেশের পাশাপাশি কাজ করছে, যাতে আরো অনেক দেশকে এ প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। আজ বিশ্বে পারমাণবিক উত্তেজনা যখন প্রবল এবং কখনো কখনো তুঙ্গে, তখন জনগণ, সরকার ও সুশীল সমাজকে পাশাপাশি থেকে কাজ করতে হবে, যাতে পারমাণবিক অস্ত্রায়ণের আশঙ্কাকে চিরতরে দূর করে দেয়া যায়।

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র