ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের ভর্তুকি অনেক বেশি। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, মাথাপিছু ও প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা—সব হিসাবেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ এসব দেশের চেয়েও অনেক বেশি। এ খাতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল নীতি এবং দেশীয় উৎসের চেয়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগ। বিগত সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে বিদ্যুতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কখনো মনোযোগ দেয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক জ্বালানির স্থানীয় উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে না পারা এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগে অনিচ্ছার কারণেও খাতটিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে। যদিও এর বিপরীতে জনগণের মধ্যে বিদ্যুতের ব্যবহার সেভাবে বাড়েনি। কমানো যায়নি খাতটির অনুৎপাদনশীল ব্যয়গুলোও। বরং তা দিনে দিনে আরো বড় হয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা এশিয়ায়ই বিদ্যুৎ খাত ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ, পুরনো ক্রয়চুক্তি সংশোধন করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থানীয় উৎস থেকে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান করা সম্ভব হলেই বিদ্যুৎ খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি কমানো সম্ভব। এজন্য দরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা এবং সঠিক নীতির পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ ও পুরনো ক্রয়চুক্তিগুলো সংশোধন করা।
- উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্পের চুক্তি করা হলে একদিকে যেমন ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে লুটপাটের সুযোগও কম থাকে, বরং থাকে দায়বদ্ধতা। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিগত দেড় দশকের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোনো ন্যায্যতা ছিল না। উপরন্তু সরকার সমর্থিত কিছু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিকে এ খাত থেকে অর্থ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। আর এসব দুর্নীতি আড়াল করতে তৈরি হয়েছিল দায়মুক্তি আইন। এ আইনের আওতায় বিনা টেন্ডারে শতাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের। এতে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নষ্ট করা হয়েছে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার। উচ্চ মূল্যের এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্ধেকই কোনো কাজে না এলেও দেশ ও জনগণের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ঋণের বোঝা। দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। জনগণের পকেট থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য পরিশোধের জন্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে। বেড়েছে সরকারের ভর্তুকি দায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ফেলা হয়েছে ঝুঁকিতে।
- সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের একটি হচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি খাতটিতে। গত ১৫ বছরে এ খাতে চলেছে ব্যাপক লুটপাট। তার পেছনে কাজ করেছে বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছর এ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রেখেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। টানা চারবার সরকার গঠনে প্রতিবারই মন্ত্রণালয় বণ্টন হলেও টেকনিক্যাল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিভাগকে তিনি কখনই হাতছাড়া করেননি। এর আগে বিএনপি সরকারের শাসনামলেও এ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই ছিল। অর্থাৎ তিন দশক ধরেই রাজনৈতিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীরা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন জনগুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়কে। ফলে বিভাগটিতে সবসময়ে জন-উপযোগিতার চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়াদি প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। ভোক্তার স্বার্থ খুব কমই রক্ষিত হয়েছে। দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এ খাতে লুটপাটের ভয়ানক চিত্র। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হলে এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। বিগত সরকারের আমলে করা বড় বড় দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনাও দরকার। কিন্তু সরকারের এসব বিষয়ে তেমন তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।
- এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির সীমা চলতি অর্থবছরের বরাদ্দকে না ছাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। এরই মধ্যে সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ট্যারিফ পর্যালোচনার জন্য ২১ জানুয়ারি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। এর আগে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি পর্যালোচনা করতে পাঁচ সদস্যের জাতীয় কমিটি করে সরকার। এ কমিটি ডজনখানেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি যাচাই-বাছাই করে চুক্তি পর্যালোচনায় সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক একটি আইনি ও তদন্তকারী সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়ার সুপারিশ করে। অনেকেই মনে করেছিলেন, সুপারিশ অনুযায়ী আইনি সংস্থাকে দ্রুত নিয়োগ করা হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু কমিটির পরামর্শ অনুসারে এখনো কোনো আইনি সংস্থাকে নিয়োগ করতে পারেনি সরকার। বরং বিগত সরকারের পথেই হাঁটছে এ সরকারও।
- বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভুল পলিসির কারণে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বেড়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে বেড়েছে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়। এর খেসারত বিদ্যুতের ভর্তুকি হিসেবে দিতে হচ্ছে সরকারকে। এ খাতের ব্যয় সাশ্রয় করতে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে বিগত সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগের দেখা মেলেনি। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে উন্নত বিশ্ব এখন সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে। আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবারিত সুযোগ রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ এখন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮ অনুসারে, ২০২১ সালে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল নবায়নযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে তা ৩ শতাংশের আশপাশে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গেও তা সংগতিপূর্ণ নয়। জ্বালানি তেলসহ এলএনজির জন্য বৈদেশিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
- বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে জোর দিতে হবে। তা না হলে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমানো কঠিন হবে। সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎসগুলোর সম্ভাবনাকেও কাজে লাগতে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতাগুলোকে দূর করার জন্য দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তা না হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ও ঋণের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।










