খাদ্যদ্রব্যের বাড়তি দামের চাপ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে গড়ে তোলা হয়েছিল ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সংস্থাটি খাদ্যপণ্য ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করে এর উপকারভোগীদের কাছে। বর্তমানে শুধু ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেই সরাসরি উপকারভোগী হিসেবে সংস্থাটির তালিকাভুক্ত রয়েছে এক কোটি পরিবার। তবে সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টার এক বক্তব্যে উঠে এসেছে টিসিবির এক কোটি কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের কথা। এরই মধ্যে ওই এক কোটি কার্ডের মধ্যে ৫৭ লাখ কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এত বিপুলসংখ্যক কার্ড বিতরণে অনিয়মের ঘটনা টিসিবি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি স্পষ্ট করে যে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। এতে একদিকে প্রকৃত অভাবী জনগোষ্ঠী তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম স্বাভাবিকভাবেই দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থার সংকট তৈরি করে।

এর আগেও বহুবার টিসিবির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সংস্থাটির বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি ৬ লাখ টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণের তথ্য পাওয়া গেছে। কেবল দুর্নীতি নয়, টিসিবির রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও অভাব। যেমন ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সংস্থাটির কেনাকাটায় প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। পর্যাপ্ত নগদ তহবিল না থাকায় সংস্থাটিকে কেনাকাটা চালাতে হয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। এ ঋণের সুদহার পরিশোধ করতে গিয়ে টিসিবির পণ্যের দামও কিছুটা বেড়ে যায়। এতেও দেখা যায় টিসিবির প্রকৃত উদ্দেশ্য পুরোপুরি পূরণ হয় না। এ অবস্থায় টিসিবির কার্ডধারীদের তথ্য পুনরায় যাচাই-বাছাই করা যেমন দরকার, তেমনি পুনর্বণ্টনেও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সংস্থাটিকে কার্ড বিতরণের বিষয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।

সাধারণত টিসিবির উপকারভোগী নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি সরকার নির্ধারিত কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে শুরুতেই মাসিক আয়ের সর্বোচ্চ সীমা বিবেচনায় নেয়া হয়। প্রাথমিকভাবে উপকারভোগীর তালিকা প্রস্তুতকরণের দায়িত্বে থাকে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন তথা স্থানীয় প্রশাসন। প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে অধিকাংশ সময় মূলত প্রশাসনের এসব জায়গায় অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনাগুলো ঘটে। স্থানীয় নেতাদের নৈতিকতার অভাবে উপকারভোগীর নাম সুপারিশের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মানদণ্ডের পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিই মূল প্রভাবক হয়ে ওঠে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতকৃত তালিকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তারাও দুর্নীতিগ্রস্ততার কারণে এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। এভাবে অনেক সময় দেখা যায়, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি টিসিবির সুবিধাভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। আবার উপকারভোগীদের ডাটাবেজেও নানা বিভ্রান্তি থাকে। উপকারভোগীর তথ্যও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। আর এসব কারণে টিসিবি এক ধরনের অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য কমানোয় এর দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব লক্ষণীয় নয়। টিসিবির সুবিধা প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং এটিকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে একে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

সঠিকভাবে এর কার্যক্রম পরিচালনায় একটি সমৃদ্ধ ও হালনাগাদকৃত ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে এসব তালিকা সংশোধন ও সমন্বয় করা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী বাছাইয়ে তাই সবচেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সেক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্মকর্তারা যেন মনগড়া তালিকা তৈরি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সমাজের প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায় যে কর্মসূচি নেয়া হয়, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এক্ষেত্রে জালিয়াতি ও দুর্নীতি রোধ করা কঠিন হবে না। দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে, যাতে প্রকৃত গরিব-অতিগরিব ব্যক্তিরাই এ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে টিসিবির সফলতা নির্ভর করবে এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এ প্রকল্প যাতে সঠিকভাবে তার উদ্দেশ্য পূরণ করে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ টিসিবি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে এটি। তবে এর জন্য টিসিবিকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।

দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় টিসিবির পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও বিপণনের আওতা সেভাবে বাড়েনি। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকায় এ মুহূর্তে টিসিবির সক্ষমতা ও কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে টিসিবির মজুদ সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাসহ পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কেননা ব্যক্তি উদ্যোগের এ যুগে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের বিপরীতে টিসিবির মতো ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাজারে হস্তক্ষেপও কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি বৃহৎ ও নিত্য পরিবর্তনশীল ভোগ্যপণ্যের বাজারে সামান্য আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রয় ক্ষমতার সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিকে আমাদের মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটা কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। জনবল বাড়ানো, নতুন গুদাম তৈরি ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের পাশাপাশি নগদ তহবিল বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আপৎকালীন খাদ্য সংকটে সংস্থাটির কেনা পণ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও বিপণনক্ষমতা বাড়ানো দরকার। টিসিবির যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা দূর করার পাশাপাশি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও আবশ্যক।