ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও সাবেক পরিচালক; অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের (এএইচআরবি) আহ্বায়ক এবং ইউনিভার্সাল রিসার্চ কেয়ার লিমিটেডের প্রধান উপদেষ্টা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়ে গত ২৬ বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতার আলোকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণে বাংলাদেশের জন্য একটি রূপান্তরমূলক স্বাস্থ্য অর্থায়ন কাঠামোর রূপরেখা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক

কেন বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অর্থায়নে রূপান্তর জরুরি?

স্বাস্থ্য অর্থায়নের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলির ওপর—রাজস্ব সংগ্রহ, সম্পদের পুলিং এবং ক্রয় ও বরাদ্দ। এর মধ্যে সম্পদের পুলিং জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি ভাগাভাগি নিশ্চিত করে, আর ক্রয় ও বরাদ্দ নির্ধারণ করে সংগৃহীত অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ তিনের সমন্বয়ই একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ন্যায়সংগততা, দক্ষতা ও টেকসইতার মূল নির্ধারক।

বাংলাদেশে এ কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই ভারসাম্যহীন। স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বা আউট-অব-পকেট ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ আসে ব্যক্তিগত ব্যয় থেকে, যেখানে বিশ্বব্যাংকের হিসাব এ হারকে প্রায় ৭৪ শতাংশ হিসাবে দেখায়; বাস্তব চিত্রে এটি প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে ওষুধ খাতেই ব্যয় হয় মোট আউট-অব-পকেট (ওওপি) ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী এই আউট অব পকেট ব্যয়কে কমিয়ে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা জরুরি। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন একটি অধিক কাঠামোবদ্ধ, ন্যায্য ও ঝুঁকিভিত্তিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা।

অন্যদিকে সরকারি অর্থায়ন এখনো অত্যন্ত সীমিত। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ আসে সরকারি উৎস থেকে। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বহু বছর ধরেই প্রায় ৫ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। জিডিপির অনুপাতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় মাত্র শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ৫ শতাংশের তুলনায় অত্যন্ত কম। এমনকি সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ স্বল্প বিনিয়োগ স্বাস্থ্য খাতকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে রেখেছে।

কম বরাদ্দের পাশাপাশি বাস্তবায়ন অদক্ষতা এ সংকটকে আরো গভীর করেছে। দুর্বল পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অব্যবহৃত তহবিল এবং অকার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে নিরুৎসাহিত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর, যারা ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপে পড়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা, জনবল সংকট, দুর্বল অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং নিয়মিত ওষুধ সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এর ফলেই মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি সেবার দিকে ঝুঁকছে, যা দারিদ্র্য ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজের পথে এগিয়ে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, বরং সমন্বিত ও কাঠামোগত রূপান্তর অপরিহার্য।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অর্থায়নে ‘সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা’ প্রচলন কতটা যুক্তিসংগত?

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য অর্থায়নে প্রধানত দুটি মডেল অনুসৃত হয়। একটি হলো যুক্তরাজ্যে ১৯৪৮ সালে প্রবর্তিত বেভারিজ মডেল, যা করভিত্তিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। অন্যটি হলো ১৮৮৩ সালে জার্মানিতে চালু হওয়া বিসমার্ক মডেল, যা সামাজিক স্বাস্থ্য বীমাভিত্তিক। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে করভিত্তিক একটি কাঠামো অনুসরণ করে আসছে, যা মূলত বেভারিজ মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক জোরালো হয়েছে—এ করভিত্তিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা হবে, নাকি সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হবে।

বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। যেসব দেশে সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা সফল হয়েছে, সেখানে বড় আকারের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজার বিদ্যমান। বাংলাদেশে শ্রমশক্তির মাত্র ১২-১৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, আর প্রায় ৮৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। ফলে নিয়মিত প্রিমিয়াম সংগ্রহ ব্যয়বহুল, জটিল এবং প্রশাসনিকভাবে দুরূহ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের কম কর-জিডিপি অনুপাত, যা এখনো ১০ শতাংশের নিচে। এ সীমিত রাজস্ব কাঠামোর মধ্যে এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রিমিয়াম ভর্তুকি দেয়া বাস্তবসম্মত নয়।

এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলো এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ বীমাভিত্তিক ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। বিদ্যমান পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিধিমালার আওতায় তারা বীমা থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করতে পারে না। বহু বছর ধরে এ বিধিমালা সংস্কারের আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। এ সংস্কার ছাড়া সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, আর সেবার মান নিশ্চিত না হলে জনগণের বীমায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহও তৈরি হবে না। প্রিমিয়াম পরিশোধ করেও যদি মানুষ পর্যাপ্ত সেবা না পায়, তাহলে আস্থাহীনতা আরো বাড়বে। একই সঙ্গে শুধু বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করাও কোনো টেকসই সমাধান নয়। এসব বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে একটি সর্বজনীন সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু করা বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।

স্বাস্থ্য বীমার পথ কি পুরোপুরি বন্ধ নাকি ধাপে ধাপে অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে?

স্বাস্থ্য বীমার পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়। বরং ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের দিয়ে সামাজিক স্বাস্থ্য বীমার সূচনা করা যেতে পারে, যেখানে প্রিমিয়াম সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে সহজ এবং প্রশাসনিক ব্যয় কম। একই সঙ্গে পুলিং ব্যবস্থাযোগ্য এমন পরিবেশে গ্রুপ স্বাস্থ্য বীমা উৎসাহিত করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হতে পারে। দেশে এক মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে; তাদের স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনলে একদিকে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্য বীমার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ সালের শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি, যা ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, এরই মধ্যে দেশের আরো অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরূপ উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করলে গ্রহণযোগ্যতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

তাহলে করভিত্তিক ব্যবস্থাই কি আপাতত বাস্তবসম্মত পথ?

এসব বিবেচনায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে করভিত্তিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন জোরদার করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। সমস্যা শুধু বরাদ্দের স্বল্পতা নয়; বরাদ্দকৃত অর্থের দক্ষ ও কার্যকর ব্যবহার না হওয়াটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ, পরিকল্পনা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য খাতের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন সংস্থা—যেমন অধিদপ্তরগুলো, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড, সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো ও গণপূর্ত অধিদপ্তর—এর বহুস্তরীয় ও জটিল কাঠামো বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

অতএব, আগামীর পথ হলো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিধিমালার সংস্কার করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা সরলীকরণ করা। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক স্বাস্থ্য বীমার কর্মসূচি ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে একটি মিশ্র এবং আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার রূপান্তরের প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতায় জর্জরিত একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রথমেই তিনটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। নাগরিকরা কি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বাস্তব অর্থে ক্ষমতাবান? সরকারি সেবাদানকারীরা কি যথাযথভাবে অনুপ্রাণিত ও প্রণোদিত? এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আকর্ষণ কি সত্যিই বিদ্যমান? বাস্তবতা হলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ তিন প্রশ্নের কোনোটিরই সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় না।

এ ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে আরো গভীর তিনটি অজানা বিষয়। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে রোগীরা যে সেবা পাচ্ছেন তার প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে তারা সচেতন নন, সেবাদানকারীরা যে সেবা দিচ্ছেন তার আর্থিক ও সামাজিক মূল্য তারা স্পষ্টভাবে জানেন না এবং সরকারও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা অর্থের প্রকৃত রিটার্ন যথাযথভাবে পরিমাপ করতে পারে না। এ অজানা বিষয়গুলো দূর করতে হলে এমন একটি নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন যা নাগরিক, সেবাদানকারী ও রাষ্ট্র—এ তিন পক্ষের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার রূপান্তরের উদ্দেশ্য ও দিকনির্দেশনা কী হওয়া উচিত?

অর্থায়ন ব্যবস্থার রূপান্তর কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হলো একটি টেকসই, ন্যায্য ও দক্ষ স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে, সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটাবে এবং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। রাজস্ব সংগ্রহ, সম্পদ পুলিং ও কৌশলগত বরাদ্দ—এ তিন কার্যাবলির সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে যা নাগরিককে স্বাস্থ্য গ্রহণে ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় সমান গুরুত্ব দেয়।

এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি তিন স্তরবিশিষ্ট স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশল প্রচলন করা অপরিহার্য যেখানে প্রাথমিক, মধ্যবর্তী এবং গুরুতর বা জটিল ব্যাধি/অসুস্থতা ও দুর্ঘটনাজনিত সেবা—প্রতিটি স্তরের জন্য উপযোগী অর্থায়ন পদ্ধতি, সেবা প্রদান মডেল ও সুবিধা নির্ধারণ থাকবে। এ সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশকে একটি কার্যকর, ন্যায্য ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

প্রাথমিক, মধ্যবর্তী ও গুরুতর বা জটিল ব্যাধি/অসুস্থতা ও দুর্ঘটনাজনিত সেবার জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্য অর্থায়ন কাঠামো কেমন হওয়া উচিত?

স্বাস্থ্য অর্থায়ন কাঠামোর প্রথম স্তর হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন, যা যেকোনো কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। এ স্তরে করভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক, প্রোমোটিভ এবং মৌলিক চিকিৎসা সেবা—বিশেষত সাধারণ বহির্বিভাগীয় সেবা—সম্পূর্ণভাবে অর্থায়ন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, যাতে সবার জন্য বিনামূল্যে ও ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা গেলে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় হ্রাস—এ তিন লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য গ্রামীণ কমিউনিটি ক্লিনিক, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টার এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোকে বিচ্ছিন্ন কাঠামো থেকে বের করে এনে একীভূত ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করার প্রয়োজন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের আওতায় এনে পরিকল্পনা, জনবল ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নে সমন্বয় জোরদার করা যেতে পারে। সেবাদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করবে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীরা; তবে পাহাড়, চর, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে।

অর্থায়নের দিক থেকে করভিত্তিক ব্যবস্থা বজায় রেখে প্রচলিত লাইন-আইটেম বাজেটের পাশাপাশি কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা চালু করা জরুরি। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ববোধ ও সেবার মান উভয়ই বাড়বে। একই মডেল উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের পৌরসভাগুলোতেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বড় সিটি করপোরেশনগুলোতে ‘আলো ক্লিনিক’-এর মতো সেবা প্রদান মডেল অথবা কৌশলগত ক্রয়ের মাধ্যমে বেসরকারি সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা কমিয়ে সমন্বয় ও সেবার মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ প্রাথমিক স্তরের অর্থায়নের সুফল বহুমাত্রিক। নাগরিকরা বিনামূল্যে ও ন্যায্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার পেলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যয় কমবে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত ফলাফল উন্নত হবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনীর জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ স্তরে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদ ঘাটতি পূরণ ও প্রণোদনা প্রদানের জন্য অতিরিক্ত ২০-২৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোর দ্বিতীয় স্তর হলো মধ্যবর্তী সেবার অর্থায়ন, যা প্রাথমিক ও উন্নত সেবার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে। এ স্তরে রেফারকৃত বহির্বিভাগীয় সেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, ভর্তি রোগী সেবা এবং মৌলিক জরুরি সেবার জন্য পরিবারপ্রতি বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা সীমাসহ একটি ফ্যামিলি হেলথ কার্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কার্ড নাগরিকদের জন্য সেবার নিশ্চয়তা তৈরি করবে এবং হঠাৎ বড় ব্যয়ের ঝুঁকি কমাবে।

প্রস্তাবিত অর্থায়ন কাঠামোটি বাস্তবায়ন করতে কী কী সংস্কার প্রয়োজন?

এ তিন স্তরের কাঠামো কার্যকর করতে হলে কিছু মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একীভূত কাঠামো প্রতিষ্ঠা, সীমা নির্ধারিত (সিলিং বেসড) বেনিফিট প্যাকেজ চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ সম্প্রসারণ, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সর্বজনীন ফ্যামিলি হেলথ কার্ড প্রবর্তন এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল প্রতিষ্ঠা।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কী ধরনের প্রত্যাশা থাকবে?

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বাস্থসেবা গ্রহণে জনগণকে সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়িত করতে ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করতে এ রূপান্তরমূলক স্বাস্থ্য অর্থায়ন কাঠামো গ্রহণের বিকল্প নেই। করভিত্তিক অর্থায়ন, উদ্ভাবনী রাজস্ব উৎস এবং কৌশলগত সংস্কারের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, ন্যায্য ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ ও উদ্ভাবনী অর্থায়ন উৎসের মাধ্যমে টেকসইভাবেই মোকাবেলা করা সম্ভব।