দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্যে বিষাক্ত ধাতু ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকে, যা মানুষের শরীরে জমে ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সমস্যা, স্নায়বিক বিকার এবং শিশুদের বুদ্ধি বিকাশজনিত সমস্যার সৃষ্টি করে। ফলে খাদ্যের পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেও এর নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মাটি মানবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। মানবজাতির খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—সবকিছুর সঙ্গে মাটির সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছিন্ন। পৃথিবীর ইতিহাসে যত সভ্যতা বিকশিত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল উর্বর ও সুস্থ মাটি। কিন্তু আধুনিক শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও নির্বিচার অস্থিতিশীল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে সে মাটিই আজ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ দূষিত মাটি থেকে উৎপাদিত খাদ্য শুধু পরিমাণে নয়, গুণগত মানেও ক্রমাগত অবনতি ঘটাচ্ছে। ফলে মানবস্বাস্থ্য, পুষ্টিনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ জীবন গভীর হুমকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে মাটি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং মানুষের জীবনধারণ, খাদ্য উৎপাদন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি। হাজার বছরের কৃষিসভ্যতা এ ভূখণ্ডে গড়ে উঠেছে উর্বর মাটির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আধুনিক সময়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং পরিবেশগত অবহেলার কারণে বাংলাদেশের মাটি আজ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ মাটি দূষণ কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, বরং এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি গভীর ও বহুমাত্রিক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মাটি দূষণ বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে মাটির স্বাভাবিক ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায় এবং মাটি আর উদ্ভিদ উৎপাদন ও পরিবেশগত কার্যক্রম বজায় রাখতে সক্ষম থাকে না। বাংলাদেশে মাটি দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস কৃষিতে নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে উচ্চফলনশীল জাতের ফসল চাষের পাশাপাশি ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। শুরুতে ফসল উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা মাটির জৈব উপাদান কমিয়ে দিয়েছে, মাটির গঠন শক্ত ও অনুর্বর করে তুলেছে এবং উপকারী অণুজীব ধ্বংস করেছে।

অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে নাইট্রেট জমা হচ্ছে, যা শুধু ফসলের গুণগত মান কমাচ্ছে না, বরং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। একই সঙ্গে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মাটিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশক আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বা সীমিত হলেও সেগুলোর ব্যবহার এখনো দেখা যায়, যা মাটির পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

শিল্পায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর পরিবেশগত মূল্য অত্যন্ত উচ্চ। ট্যানারি, টেক্সটাইল, ডায়িং, কেমিক্যাল, সার ও ওষুধ শিল্প থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য নদী, খাল ও কৃষিজমিতে সরাসরি ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে, যা মাটিতে জমে বহু বছর সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে শিল্পবর্জ্যজনিত মাটি দূষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এসব মাটিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও খাদ্যশস্য মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও মাটি দূষণের একটি বড় কারণ। শহরের পলিথিন, প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য ও হাসপাতাল বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করায় তা আশপাশের জমিতে জমা হচ্ছে। প্লাস্টিক মাটির ভেতরে পানি ও বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, ফলে শিকড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়া বৃষ্টির পানির সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে, যা সেচ ও পানীয় জলের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবস্থাকে আরো অনিরাপদ করে তোলে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ছে, যা মাটি দূষণের একটি স্বতন্ত্র কিন্তু গুরুতর রূপ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। লবণাক্ত মাটি ধান, গম ও সবজির মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক কৃষক জমি চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা সীমিত লবণসহিষ্ণু ফসলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা এতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি। সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, আর্সেনিক, ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু মাটিতে জমা হয়ে ফসলের শিকড়ের মাধ্যমে উদ্ভিদে প্রবেশ করে। এসব ধাতু মানুষের শরীরে জমে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে, কিন্তু তার আগেই খাদ্যের গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। স্বাদ, রঙ, গঠন ও পুষ্টিগত মান—সব ক্ষেত্রেই এ খাদ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্যের পুষ্টিমান হ্রাস দূষিত মাটির একটি মারাত্মক ফল। সুস্থ মাটি উদ্ভিদকে প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করে। কিন্তু মাটি দূষিত হলে এ উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে কিছু পুষ্টি অতিরিক্ত হলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কমে যায়। ফলে শস্যে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ হ্রাস পায়, যা পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য গ্রহণের পরও মানবদেহে অপুষ্টি সৃষ্টি করে। দূষিত মাটিতে উৎপাদিত শাকসবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ একটি বড় সমস্যা। এসব রাসায়নিক অনেক সময় পুরোপুরি ভেঙে যায় না এবং রান্নার পরও খাদ্যে থেকে যায়। এতে খাদ্যের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয় এবং মানবদেহে বিষাক্ত প্রভাব সৃষ্টি করে। শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো বেশি মারাত্মক হয়। ধীরে ধীরে এসব বিষাক্ত উপাদান লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফলের ক্ষেত্রেও দূষিত মাটির প্রভাব গভীর। ফলের আকার হয়তো বড় হয়, কিন্তু এর ভেতরের পুষ্টিমান কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ফলের ভেতরে অস্বাভাবিক কেমিক্যাল জমা থাকে, যা স্বাদ ও গন্ধ পরিবর্তন করে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের খাদ্য গ্রহণ মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। দূষিত মাটির কারণে খাদ্যে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত নিকাশির পানি মাটিতে প্রবেশ করলে সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব জন্মায়। এসব জীবাণু শাকসবজি ও ফসলের সঙ্গে লেগে থেকে খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডের মতো পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ে।

মাটির দূষণ খাদ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। নিরাপদ খাদ্য বলতে শুধু পচনমুক্ত খাবার নয়, বরং বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যকেও বোঝায়। দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্য বাহ্যিকভাবে ভালো দেখালেও ভেতরে নীরব বিষ বহন করে। এ ‘নীরব বিষ’ ধীরে ধীরে মানবদেহে জমে দীর্ঘস্থায়ী রোগ সৃষ্টি করে, যা প্রাথমিকভাবে ধরা পড়ে না। দীর্ঘদিন দূষিত খাদ্য গ্রহণে মানুষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কমে যায়, হরমোনজনিত সমস্যা দেখা দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ, ক্যান্সার ও বিভিন্ন জটিল অসুখের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব সমস্যার মূল কারণ অনেক সময় খাদ্যের গুণগত মানের অবনতি হলেও মানুষ তা সহজে উপলব্ধি করতে পারে না। দূষিত মাটি খাদ্যের সংরক্ষণ ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। পুষ্টিমান কম ও রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য দ্রুত নষ্ট হয়, ছত্রাক ও পচনের ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে খাদ্য অপচয় বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। বাজারে এমন খাদ্য টেকসই না হওয়ায় ভোক্তাকে বারবার নতুন খাদ্য কিনতে বাধ্য হতে হয়।

খাদ্যের গুণগত মানের ওপর দূষিত মাটির প্রভাব একটি সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। নিম্ন আয়ের মানুষ সাধারণত কম দামের খাদ্যের ওপর নির্ভর করে, যা অনেক সময় দূষিত জমি থেকে আসে। ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হয়। এ বৈষম্য সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত অসমতা বাড়িয়ে তোলে। দূষিত মাটির প্রভাব কৃষকদের ওপরও পড়ে। মাটির উর্বরতা কমে গেলে কৃষক বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান বাড়ে না, বরং কমে যায়। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভোক্তাও নিরাপদ খাদ্য থেকে বঞ্চিত হন। শুধু সুস্থ মাটি থেকেই পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব।

গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিজেদের উৎপাদিত খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হলেও তারা মাটি দূষণ ও রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। ফলে একদিকে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। মাটির উর্বরতা কমে গেলে একই জমিতে আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। তখন দরিদ্র কৃষকরা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আরো বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ক্রমাগত কমছে নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে। এ পরিস্থিতিতে মাটির স্বাস্থ্য অবহেলা করলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দেবে, যা খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

এ সংকট থেকে উত্তরণে টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। জৈব সার ব্যবহার, সবুজ সার চাষ, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফেরত দেয়া, ফসল পর্যায়ক্রমিক চাষ এবং রাসায়নিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ মাটিকে ধীরে ধীরে দূষণমুক্ত করতে পারে এবং মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কম্পোস্ট, গোবর ও ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবহারে মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি পায় এবং পানি ধারণক্ষমতা উন্নত হয়। একই সঙ্গে জৈব কীটনাশক ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করলে মাটি দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। প্রতিটি শিল্প-কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, বর্জ্য পৃথক্‌করণ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা চালু করলে মাটির ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মানুষ যদি খাদ্যের বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, বরং গুণগত মানের গুরুত্ব বুঝতে শেখে, তাহলে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির প্রতি চাহিদা বাড়বে। ফলে কৃষক ও উৎপাদকরাও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য হবে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মাটির স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা প্রদান করা হলে কৃষকরা রাসায়নিক ব্যবহারে আরো সতর্ক হবেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মাটি ও পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো দায়িত্বশীল করে তুলবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা সরাসরি মাটির সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। দূষিত মাটি খাদ্যের গুণগত মানকে ধ্বংস করে নীরবে মানবসভ্যতাকে দুর্বল করে তুলছে। খাদ্য শুধু পেট ভরানোর উপকরণ নয়; এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি। যদি এ খাদ্যের ভিত্তিই হয় দূষিত ও বিষাক্ত মাটি, তবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ হবে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। মাটি দূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট। বর্তমান প্রজন্ম যদি স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য মাটিকে বিষাক্ত করে তোলে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চরম খাদ্য অনিশ্চয়তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে। তাই সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমে মাটি দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের জন্য সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব।

ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি এবং চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য