বর্তমান সরকার ২০০৭ সালে ক্ষমতায় আসা এক-এগারোর অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তুলনীয় হলেও অর্থনৈতিক দক্ষতা দুটোর দুরকম। আগেরটি ছিল প্রশাসনিকভাবে শক্ত। ফলে ওর অর্থনৈতিক অর্জনও ছিল আশাতীতভাবে চমৎকার। বর্তমান সরকার প্রশাসনিকভাবে দুর্বল ও কখনো ‘কনফিউজড’। ফলে অর্থনীতির বড় সূচকগুলোয় পতনের সুর। প্রথমটি ‘আশাতীতভাবে চমৎকার’ এ কারণে যে ওই সরকারের সময় গোটা বিশ্ব এক বিশাল মন্দায় নিমজ্জিত হয়েছিল। সেটি ছিল ত্রিশের মহাবিষণ্নতার পর সবচেয়ে বড় মন্দা। তাই ত্রিশের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর পর এটিকে ‘গ্রেট রিসেশন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটি ২০০৭-এর ডিসেম্বর থেকে ২০০৯-এর জুন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমন বড় মন্দার বৈশ্বিক যুগেও ফখরুদ্দীন সরকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির যে অংক অর্জন করেছিল তা শুধু বর্তমান সরকারই নয়, উপরন্তু কোনো রাজনৈতিক সরকারের কাজকর্ম থেকে কল্পনা করা অসম্ভব।

২০০৭-০৯ কালপর্বের তুলনায় বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সে অবস্থার প্রতিফলন নেই বিদেশী বিনিয়োগে কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অথবা বেকারত্ব বা মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণে। নেই দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণের চিত্রে। এ সবই বর্তমান সরকার যেকোনো সময়ের সরকারের চেয়ে খারাপ করছে। বর্তমান সরকারপ্রধান নিজেই ‘দারিদ্র্যবিনাশক এক শান্তিদূত’-এর যে বৈশ্বিক খ্যাতি ভোগ করছেন, ফখরুদ্দীনের কপালে এর ছিঁটেফুটোও জোটেনি। উপরন্তু বর্তমান সরকার এত বেশি অর্থনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ টইটুম্বর করেছেন যার ধারেকাছেও ফখরুদ্দীন সরকার যেতে পারেনি। কিন্তু অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলার বর্তমান চিত্র দাবি করে যে কোথাও একটা সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। ফখরুদ্দীন সরকারের অন্তত লক্ষ্য ও সদিচ্ছার ঘাটতি ছিল না।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে আশির দশকের শেষ বছর ১৯৮৯ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ১৯৮৮-এর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয়াভহ বন্যা মূলত এর জন্য দায়ী। এরপর কভিডের বছর ২০২০ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ২ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ সরকার ধনাত্মক ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ যদি ২০২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে তাহলে সেটি হবে ১৯৮৯-এর পর গত ৩৬ বছরের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। গত জানুয়ারিতেই বিশ্বব্যাংক মনে করত যে বাংলাদেশ ২০২৫ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা আরো নিম্নগামী হয় মূলত চারটি কারণে—পতনশীল বিনিয়োগ, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের অস্থিরতা ও সর্বোপরি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ গত ছয় মাসে সরকারের দক্ষতা আরো নেমে গেছে বলেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বিষয়ে আরেকটু বেশি হতাশাবাদী হয়েছে।

প্রথম তিনটি কারণকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার উপজাত কারণ বলাটাই ঠিক। এখানেই ইউনূস সরকার ফখরুদ্দীন সরকারের অবস্থা থেকে তলে পড়ে গেছে। ফখরুদ্দীন সরকারের যেমন সুস্পষ্ট ‘রোডম্যাপ’ ছিল, এ সরকারের কার্যকলাপে কোনো ‘রোড’ বা কোনো ‘ম্যাপ’-এর অস্তিত্ব নেই। সংস্কারের নামে নানা কমিশনের আয়োজনে আড়ম্বর বেশি। অর্জন কম কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অর্জন নেই বললেই চলে যা অর্থনীতিকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মব সংস্কৃতির তাণ্ডবে সামাজিক বীভৎসতা অর্থনীতির ভোগ ও বিনিয়োগ দুটোকেই আক্রান্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠানের শান্তিসূচকে বাংলাদেশ কয়েক ধাপ নেমে গেছে। অশান্তি বেড়েছে। ফখরুদ্দীনের আমল শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে সুনাম অর্জন করেছিল যার ছাপ পড়েছে ওই সময়ের বর্ধমান বিনিয়োগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নানা বিষয় নিয়ে তামাশা করে এ দুঃসময়ে কিছুটা বিনোদন দিতে পারলেও একবাক্যে ইতিহাসের সেরা অদক্ষ স্বরাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ফখরুদ্দীনের কপালে এমন ‘স্টার’ জোটেনি। তাই স্বরাষ্ট্র বিভাগ শান্তি-শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা দিতে পেরেছিল।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিএনপি শাসনামলের শেষ বছরে ২০০৬ সালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ফখরুদ্দীন সরকার ২০০৭ সালে সেটিকে ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে উন্নীত করেছিল। বৈশ্বিক বড় মন্দার বছর ২০০৮ সালেও ওই সরকার ৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছিল। অর্থাৎ ফখরুদ্দীনের সরকার গড়ে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল যা বর্তমান ইউনূস সরকারের আমলে ওর প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর বড় কারণ ওই সরকার বিনিয়োগ কমতে দেয়নি একচুলও, অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপির শেষ বছর ২০০৬ সালে মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৬ শতাংশ। ফখরুদ্দীন সরকার ২০০৭ ও ২০০৮ এ দুই বছরই বিনিয়োগের হার ২৬ শতাংশে ধরে রেখেছে এবং অল্প করে বাড়াতে পেরেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ওপর ব্যাপক ‘ক্র্যাকডাউন’-এর পরও এ হার বজায় রাখার কাজটি অত্যন্ত কঠিন ছিল বৈকি।

আরো কঠিন ছিল বিদেশী বিনিয়োগ আনা। কিন্তু এটিতেও ফখরুদ্দীন সরকার আশাতীত সাফল্য দেখিয়েছে। বিএনপির শেষ বছর ২০০৬ সালে জিডিপির অংশ হিসেবে নেট বিদেশী বিনিয়োগের আন্তঃপ্রবাহ ছিল শতকরা শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফখরুদ্দীনের ২০০৭ সালে এটি শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ ও ২০০৮ সালে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০০৯ সালে এটি শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশে নামে। বিএনপির ২০০১-০৬ কালপর্বে এর গড় ছিল শতকরা শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ আর আওয়ামী লীগের ২০০৯-২৩ কালপর্বে এর গড় পরিমাণ ছিল ১ শতাংশের মতো। তাহলে ফখরুদ্দীন জমানা একটি অন্তর্বর্তী সরকার হয়েও বিদেশী বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে দুটো রাজনৈতিক সরকারকে টেক্কা দিয়েছে। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এত জৌলুশ, বিশ্বপরিচিতি, চৌকস বিডার চেয়ারম্যান থাকার পর এ সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ আগের তুলনায় শতকরা ৩৬ কমে গেছে। জিডিপির অংশ হিসেবে বিদেশী বিনিয়োগের মাত্রা ফখরুদ্দীন সরকারের ধারেকাছেও ভিড়তে পারেনি।

মব সংস্কৃতির সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার এ স্বর্ণযুগে এটি বাড়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। খোদ বিনিয়োগ সম্মেলনের দিন ‘জাগ্রত জনতা’ বাটা ও কেএফসির দোকান ভেঙে এ বিপ্লবী বার্তা দিয়েছে যে ‘এ দেশে ফিরিঙ্গিদের ঠাঁই নেই’। ফখরুদ্দীন সরকার এ জাতীয় হঠকারী ‘বিপ্লবীদের’ কঠোরহস্তে দমন করেছে। কারণ তাদের জনপ্রিয় থাকার প্রয়োজন ছিল না। ছিল না কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ। টাইম ম্যাগাজিনের ভাষায় ‘টু ইয়ার্স টু ডেমোক্রেসি’ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। এ নিশ্চয়তার পরিবেশই তাদের অর্থনীতিকে পোক্ত করেছে, যা বর্তমানে হতাশাজনকভাবে অনুপস্থিত। সর্বত্রই কালক্ষেপণের নানা কৌশল। অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন অনুন্নত দেশের কৃষিতে ‘ছদ্মবেশী বেকারত্ব’ আবিষ্কার করেছিলেন। সেটি যে শেষতক বর্তমানের ‘ঐকমত্য কমিশন’-এ এসে ঢুকবে তা কেউ অনুমান করেনি। একজন নেতা মন্তব্য করেছেন ‘সেখানে নাকি খাওয়া-দাওয়া ভালোই হচ্ছে’। মন্দ নয়। সেটিই বা ক’জনের ভাগ্যে জোটে।

গ্রামের সংসারে দেখেছি ঘরজামাই যেমন শ্বশুরের সমালোচনা করেন না, বর্তমান অনেক অর্থনীতিবিদও তেমন বহু সূচকের নিম্নগমনে তেমন মুখ খুলছেন না। এর একটা বড় কারণ তাদের অধিকাংশই বর্তমান সরকারের কোনো না কোনো কমিটিতে কাজ পেয়েছিলেন বা এখনো আছেন। চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটি কথা রয়েছে। এক শ্বেতপত্র কমিটিই শ্বেতহস্তির আয়তনে দেশের প্রায় সব অর্থনীতিবিদকে আঁটিয়ে ফেলেছিল। কেউ কেউ সরকারের প্রবৃদ্ধি দুর্বলতাকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করছেন এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করে। আইএমএফের হিসাবে এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে এটি ৪ শতাংশ। এ যুক্তিটি হচ্ছে, আমার ছেলে অংকে ৩৩ পেয়েছে, যা ফেল করার চেয়ে ভালো। তা ঠিক। তবে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ ৩৩ পাওয়ার ছাত্র নয়। ২০০০-২৩-এর এ ২৪ বছরের কালপর্বে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের একমাত্র তুলনীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে ভারত যা ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ওদের মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের নিচে যেখানে বাংলাদেশের তা প্রায় ৯ শতাংশ। একজন অর্থনীতিবিদ এ দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণ হিসেবে রাস্তাঘাটের বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন। মনে হচ্ছে, ইউনূস সরকার চালাচ্ছে অর্থনীতি আর গণ্ডগোল চালাচ্ছে আরেক সরকার। তাহলে দোষ চাপানো যায়। ফখরুদ্দীন সরকারের মধ্যে এ জাতীয় ‘অদৃশ্য দ্বৈতশাসন’ কাজ করেনি যেখানে ‘মব’ চালায় এক সরকার আর ‘জব’ চালায় আরেক সরকার। ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর টাইম ম্যাগাজিন এটিকে ‘সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন যে তিনি আর তার উপদেষ্টারা দেশ চালান। টাইম সেটি ছাপিয়েছিল। বর্তমানে নিউইয়র্ক টাইমস বা গার্ডিয়ানের মতো পত্রিকাগুলো বাংলাদেশে সরকারের মৌলবাদী চরিত্র বা মব-বিস্ফোরণ নিয়ে বেশকিছু রিপোর্ট ও সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে, যার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার একটিও প্রতিবাদলিপি ছাপাতে পারেনি। অথচ ইতিহাসের সবচেয়ে ‘চৌকস’ প্রেস বিভাগ এখন বাংলাদেশে কার্যকর কিংবা সরকারপ্রধান নিজেই একজন ‘গ্লোবাল সেলিব্রিটি’। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন।

অধ্যাপক ইউনূস দুটো গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস জাতিকে দিয়েছেন। এক, তিনি একটি মজবুত অর্থনীতি দেশের হাতে তুলে দিয়ে যাবেন। দুই, তিনি জাতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘সুন্দর নির্বাচন’ উপহার দেবেন। এর কোনটি জাতির কপালে জুটবে তা বলা কঠিন। এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতি যে আরো ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতার দিকে যাবে তা নিশ্চিত। তবে ফখরুদ্দীনের শাসনামল থেকে শিক্ষা নিলে অন্তত অর্থনীতিকে মজবুত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পাওয়া যেত। এটি হতো জাতির জন্য মঙ্গলজনক।

ড. বিরূপাক্ষ পাল: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক