জাহেদ উর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য। চিকিৎসাবিদ্যায় গ্র্যাজুয়েশন করে মাস্টার্স করেছেন ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজে। প্রায় দেড় দশক পালাক্রমে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) ফিল্ম পড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি আইইউবিতে অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে কাজ করছেন। সংস্কার, নির্বাচন, রাজনীতি, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের কাজের মূল্যায়নসহ নানা ইস্যুতে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

জুলাই অভ্যুত্থানে সব রাজনৈতিক দল ও বলয়ের লোকজনের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য দেখেছিলাম। সেই ঐক্য দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি এবং এনসিপির মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মিত মতবিরোধ দেখছি। এমনটা কেন হচ্ছে বলে মনে করছেন?

যে পরিমাণ মতদ্বৈধতা দেখছি সেটাকে খুব বেশি মনে করছি না। শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে যাওয়ার পর আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, সব ইস্যুতেই অনেক বেশি ঐকমত্য তৈরি হবে, এটা সম্ভবত খানিক ভুল করছিলাম। যতটুকু ঐক্য হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাক্-বিতণ্ডা হচ্ছে। কিন্তু এটা অনিবার্য ছিল। আমরা যারা রাস্তায় নেমেছিলাম, এমনকি যারা অনেক পরে নেমেছে যারা আগে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে ছিল না, তাদের সবার কমন লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার পতন। কারণ তারা যখন দেখছে শেখ হাসিনা তার বন্ধু ও সমবয়সীদের হত্যা করছে, তখন সে রাস্তায় নেমে শেখ হাসিনার পতন চেয়েছে। রাজনৈতিক দল বলেন বা অরাজনৈতিক ব্যক্তি বলেন সবাই শেখ হাসিনার পতন চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার পতন হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কমন লক্ষ্য শেষ হয়ে গেল। তারপর এখন আমাদের প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল তার মতো করে চিন্তা করছে এবং তাদের নিজ নিজ এজেন্ডা আছে। পুরনো কোনো দল মনে করছে দ্রুত নির্বাচন হয়ে যাওয়া দরকার। এর মাধ্যমে সে দ্রুত ক্ষমতায় যেতে পারবে এবং তার সব প্রস্তুতি আছে। আবার কোনো একটি দল মনে করছে সে এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত না এবং নতুন দল। যদি সময় পায় তার জন্য ভালো হবে। সেজন্য কেউ কেউ সরকারের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। আবার কেউ মনে করছে নির্বাচন হয়ে গেলে সম্পূর্ণ ক্ষমতা তার হাতে চলে আসবে। আবার কেউ মনে করছে, এ সরকারের ওপর যেহেতু তার প্রভাব আছে, সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন সে এক ধরনের ডি-ফেক্টো ক্ষমতা উপভোগ করবে। সরকারের হাতে কতটা ক্ষমতা থাকা উচিত—প্রত্যেকটি দলেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত। এখন আমরা সেটারই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। এটাকে আমি খুব খারাপ কিছু মনে করি না। বিশেষ করে এনসিপি মাঝেমধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে ধরনের শক্ত অবস্থান দেখাচ্ছে, সেগুলো মূলত এক ধরনের রাজনৈতিক দরকষাকষির জন্য করছে। তবে শেষ পর্যন্ত এটা খুব বড় কোনো ইস্যু হয়ে উঠবে না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেলে মোটাদাগে সবাই নির্বাচনমুখী কর্মকাণ্ড শুরু করবে। আমরা যখন বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা করব, তার একটি গণতান্ত্রিক ভাষা আছে, সেটি মাথায় রাখা দরকার। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা অনেক ক্ষেত্রে এ গণতান্ত্রিক ভাষার লিমিটকে (সীমা) অতিক্রম করছি। মাঝেমধ্যে আমরা কাউকে ট্যাগ করছি বা কারো বিরুদ্ধে এমন সব শব্দ ব্যবহার করছি, যেগুলো পাল্টা এক ধরনের শত্রুতামূলক আচরণ তৈরি করতে পারে। এটাই সংকটের জায়গা এবং এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখলেই চলবে।

আপনি নির্বাচন সংস্কার কমিশনে ছিলেন। নির্বাচন সংস্কার কমিশন যে কাজগুলো করেছে তার মাধ্যমে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ ও স্বাধীন করতে পারবে? তারা একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে পারবে? শেষ তিনটা নির্বাচনের স্মৃতি মাথায় রেখে যদি বলি, সরকার বা শাসন বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে নির্বাচন কমিশন?

একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, আমরা এখনো জাতিগতভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর পূর্ণাঙ্গভাবে নির্ভর করছি না। জাতীয় নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার জন্য সবাই মনে করছি। সুতরাং এটা নিয়ে দ্বিমত নেই যে নির্বাচন কমিশনকে আইনগত, সাংবিধানিক সব রকম সক্ষমতা এবং তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এক্ষেত্রে কিছুদিন সরকারের পক্ষ থেকে সদিচ্ছা প্রয়োজন। সেই কারণেই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট শক্তিশালী- সেই আচরণ করতে পারা উচিত। কারণ এটা নিয়ে তর্ক আছে। কেউ কেউ চাইছেন এ সরকারের অধীনেই সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে যাক। কিন্তু এটা নির্বাচিত সরকারের অধীনেই হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট শক্তিশালী আচরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে যথেষ্ট আইন ও সদিচ্ছা তৈরি হয়েছে। এমনকি বিএনপি অন্যান্য কমিশনের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব রাখার ঘোরতর পক্ষে থাকলেও তারা নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে গঠন করার ক্ষেত্রে একমত হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো স্বচ্ছভাবে করতে পারবে। তবে মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে।

গত এক বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে এ আত্মবিশ্বাস আসেনি যে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দেবে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে একটি অনাস্থা আছে। এ অনাস্থা দূরীকরণের ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ যথাযথ বলে মনে করেন?

অনাস্থার বিষয়কে একেবারে সরলভাবে দেখতে চাই না। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বক্তব্যে সবসময় যা বলে তা হুবহু মিল হবে তা নাও হতে পারে। সারা বিশ্বে বিশেষ করে আমাদের এ অঞ্চলে কিন্তু রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রচুর রেটরিক শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা থাকে। তারা যখন এ ধরনের কথা বলছে, এর মাধ্যমে তারা সরকারকে চাপ দিচ্ছে। এর অর্থ এই না যে, তারা সরকারের ওপর সম্পূর্ণ অনাস্থা পোষণ করে। এটা এ কারণে হতে পারে, তারা সরকারকে বা তার প্রতিপক্ষকে কোনো ধরনের চাপ দিয়ে কোনো সুবিধা পেতে চাইছে। তবে সরকার এখন পর্যন্ত কয়েকটি জায়গায় অনাস্থা তৈরির মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বা নির্বাচনের সময় যদি কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটা নিয়ন্ত্রণে শতভাগ কনফিডেন্ট পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়নি। সুতরাং সরকারের এক্ষেত্রে প্রস্তুতির ঘাটতি আছে। যদি যথেষ্ট সেনা মোতায়েন করা হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপিও যদি তাদের জায়গা থেকেও খুবই সতর্ক থাকে তাহলে নির্বাচনে যেকোনো ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হবে না। সবাই চেষ্টা করলে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। তবে সরকারকেও তার সদিচ্ছা দেখাতে হবে। ধরে নিই নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হবে। তাহলে ছয় মাসের মতো সময় আছে। তাই সরকারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুবই উদ্যোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনেকেই প্রশ্ন করছে, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বিগত ফ্যাসিবাদী রেজিমের বিভিন্ন সুবিধাভোগী দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা? তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও ভোটার আছে। আমরা যদি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই তাহলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ওই দলগুলাকে কীভাবে ডিল করা হবে?

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অসম্ভব বলে মনে করি। আওয়ামী লীগ এখনো টেকনিক্যালি নিষিদ্ধ দল না। তাদের ব্যাপারে আইসিসিতে মামলা করা হয়েছে। সেটা তদন্ত হবে ও শুনানি হবে, তারপর সিদ্ধান্ত হবে। আমার মনে হয়, নির্বাচনের আগে সিদ্ধান্ত হবে না। কিন্তু সন্ত্রাস দমন আইনের অধীনেও তাদের সব রকম রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে এখন আশা নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টি এখন পর্যন্ত নিষিদ্ধ দল নয়। তাদের কর্মকাণ্ড আছে, কর্মসূচি আছে। জাতীয় পার্টি সম্ভবত নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। আমি ধারণা করছি, আওয়ামী লীগের অনেকেই হয়তো জাতীয় পার্টিতে এসে নির্বাচন করতে পারে। যদি তাদের দলগত সিদ্ধান্ত হয়। যারা অন্তত দেশে আছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাদের কেউ কেউ জাতীয় পার্টিতে এসে লাঙ্গল মার্কায় নির্বাচন করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে খুবই দুঃখজনক যে শেখ হাসিনার এ বীভৎসতার পরও সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। সেই মানুষগুলোকে একটা পলিটিক্যাল স্পেস দেয়া দরকার। ধীরে ধীরে এটা ভাবতে হবে। এ নির্বাচনে তাদের সুযোগ দেয়া খুব কঠিন হবে, কিন্তু ভবিষ্যতে এটা মাথায় রাখতে হবে।

গত এক বছরে হতাহতের সরকারি তালিকা স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শহীদের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ বেশি থাকলেও সরকারের গেজেটে মাত্র ৮০০। আহতদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। আপনি নিজেও একজন চিকিৎসক। সরকার আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিতে ব্যর্থ হলো কেন? শহীদদের সঠিক তালিকা এখন পর্যন্ত করতে পারেনি কেন?

সরকারের যদি একটা ব্যর্থতা আমাকে খুঁজে বের করতে বলা হয় তাহলে আমি এটাই বলতাম। আহতদের সরকার সেবা দিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু আহতদের যথেষ্ট পরিমাণ সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাব না এবং এর কোনো ক্ষমা নেই। সরকারের দিক থেকে নানা ধরনের যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করা হয় কিন্তু এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আর শহীদের তালিকাটি সঠিকভাবে হওয়া দরকার। কারণ সরকার যখন একটা সরকারি গেজেট করবে তার আলাদা একটি মূল্য আছে। কিন্তু সেটা এক বছরের মধ্যে না হওয়াটা আমি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না। সরকারের কোনো না কোনো ফর্মে আন্তরিকতার ঘাটতি আছে। এ বিষয়েই ড. ইউনূসকে একজন সম্পাদক জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। একটা সরকার এত জনসমর্থনের পরও যদি সেসব আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে মোকাবেলা করে কাজ করতে না পারে তাতে কি হবে? এটা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতারই নির্দেশ। যখন সরকার প্রশাসনিকভাবে ব্যর্থ হয়, তখন তার ব্যর্থতা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী না হয়ে যেসব ব্যর্থতার কারণ দেখানো হচ্ছে, সেগুলো সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমাদের ছাত্র নেতৃত্বের মাধ্যমে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলটির গত ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু হয়। গত পাঁচ-ছয় মাসে দলের পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

পারফরম্যান্স যেমন ভেবেছি বেশ খানিকটা সেরকমই হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছেন, রাতারাতি খুব বড় কিছু বা ভালো কিছু হয়ে যাবে। একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের মতো একটি জটিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি নতুন দল তৈরি হওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার ও সময়সাপেক্ষ।

আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হলো, ‘তাদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে বা তাদের ডাকেই মানুষ এসেছিল’। এ ধারণা তারা নিজেরাও নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছে এবং এই মানসিকতাকে যারা প্রচার করেছে তাদের পালেও হাওয়া দিয়েছে। কিন্তু এটা আসলে ঠিক না। কারণ তারা সামনে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের পেছনে অংশ নিয়েছিল দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। এমনকি আন্দোলনে এমন অনেক মানুষ ছিল যারা কোনো রাজনৈতিক দল করে না। তারা এসেছিল তাদের নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে। সেখানে দলটি গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল বলে যদি তারা ভেবে থাকে যে, জনগণ শুধু তাদের ডাকেই এসেছিল সেটা তো ঠিক না। আবার এখন যদি তারা মনে করে যে, রাজনৈতিক দল গঠন করতে গেলে তাদের আহ্বানে জনগণ একইভাবে সাড়া দেবে, সেটিও একটি ভ্রান্ত চিন্তা। সুতরাং আমি মনে করি যা হচ্ছে, এ রকমই হওয়ার কথা ছিল।

বরং বর্তমানে এসে দলটি সম্পর্কে ঝুঁকিপূর্ণ পারসেপশন তৈরি হয়েছে, যেটি কিনা বিস্তৃত আকারে ছড়িয়েও পড়ছে যে, এটি হল ‘কিংস পার্টি’। অর্থাৎ এটি সরকারের মদদপুষ্ট একটি দল। এমনকি টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে। জনপরিসরেও সেই আলাপ উঠছে। শুধু সেটাই নয়, এই দলের একটা অংশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ রকমের অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ রকম দল আগেও ছিল সেজন্য নতুন দলের উচিত ছিল এর চেয়ে আলাদা এবং কার্যকর কিছু নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। সেটা যেহেতু তারা করেনি তাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি সন্দিহান।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দল। বিএনপির রাজনীতিতে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর কেমন গুণগত পরিবর্তন দেখছেন?

অভ্যুত্থানের পর বিএনপিতে কিছু গুণগত পরিবর্তন অবশ্যই পরিলক্ষিত করেছি। বিশেষ করে, তাদের নেতৃত্বের শীর্ষস্তরে এবং সর্বোচ্চ স্তরে পরিবর্তনটা বেশি এসেছে। কিন্তু নিচের পর্যায়ে বা তৃণমূল যেমন ছিল তেমনি আছে। তারা চাঁদাবাজি, দখলদারি, মারামারি করছে সহিংসতা আগের মতোই অব্যাহত আছে। এমনকি নিজেদের মধ্যেও তারা হানাহানি-খুনখারাবিও করছে। যেটার পরিবর্তন হচ্ছেই না।

আবার দেখুন শীর্ষ নেতৃত্ব দলটির প্রায় চার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে। বহিষ্কার না করলে বিএনপি কি নির্বাচনে জিতত না? আমি মনে করি, জিতত। কিন্তু তার পরও তারা এটা করেছে, কারণ তারা বুঝতে পারছে যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। আবার দলটি সংস্কারের পথে এগিয়েছে। তারা শুরুতে মানতে চায়নি এমন কিছু সংস্কারও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছে। এমন অনেক প্রস্তাব আছে, যা তারা আগে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের ৩১ দফায় ছিল না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই কিন্তু পরে আবার সেগুলোয় সম্মত হয়েছে। আলোচনায় তাদের শীর্ষ নেতাও অংশ নিয়েছেন। এটা একটা খুবই ভালো দিক। তবে দলের তৃণমূল স্তরে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া পৌঁছায়নি। জায়গাটি আগেও যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে। সেখান থেকে বলা যায়, শীর্ষ নেতৃত্বে যতই পরিবর্তন আসুক, নিচের স্তরে সেটি না পৌঁছালে গুণগত রূপান্তর অসম্পূর্ণই থাকবে। সুতরাং বিএনপির আরো সচেতন হতে হবে।

অভ্যুত্থানে বামপন্থী বেশ কয়েকটি দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্রকল্পে আমরা কি তাহলে সামনে কোনো শক্তিশালী বাম বলয় বা জোট দেখতে পারব?

অভ্যুত্থানে বামপন্থী দলগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে তাদের বড় একটা সুযোগ ছিল একটি শক্তিশালী, কার্যকর রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করার। কিন্তু আমার মতে সেই সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। কেননা আগে বিএনপিকে যেহেতু অনেকেই ‘‌সেন্টার-রাইট’ বা মধ্য ডান বলে চিহ্নিত করেন, সে জায়গা থেকে তাদের বিরুদ্ধে এখন পাল্টা ‘ফার রাইট’ বা অতি ডানশক্তির একটা পাল্টা জোটবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তো, বিএনপিকে সেন্টারে আসতে হবে। পতিত আওয়ামী লীগ নিজেদের দাবি করত কথিত সেন্টার বা সেন্টার-লেফট হিসেবে, কিন্তু আমার মত, তারা নিতান্তই একটি ডাকাত দল। তার পরও এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শুধু তাদের সঙ্গেই বাম দলগুলোর জোট করা সম্ভব ছিল। যদিও বাম দলগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র ও সাংগঠনিক দুর্বলতা বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উপস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন বাম শক্তি গড়ে ওঠার বিষয়ে সংশয় থেকেই যায়।

বরং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্গঠনে বিএনপিই হয়তো সেন্টার-রাইট থেকে সেন্টার বা সেন্টার-লেফট পজিশনে চলে আসবে যদি এই ফার-রাইট পক্ষগুলো শক্তিশালী হয়। সেজন্য বামদের খুব বেশি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই বরং আমি মনে করি তারা বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার মূল্যায়নে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়কালের তুলনা করা হয়। ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছিল, যেমন প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, যানবাহন-ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নগর পরিষেবা, শব্দদূষণ কমানো। এ সরকারে বেশ কয়েকজন পরিবেশ ও এনজিও কর্মী থাকলেও আমরা মৌলিক নাগরিক সেবায় উন্নতি দেখিনি। আপনার মূল্যায়ন কেমন?

আলোচিত দুটি সরকারের মধ্যে কিন্তু বিরাট একটা পার্থক্য আছে। আগের ওয়ান-ইলেভেনের সরকারটি মূলত মিলিটারি সরকার ছিল। সেটাকে যতই বেসামরিক চেহারা দেয়ার চেষ্টাই আমরা করি না কেন ওটা আসলে মিলিটারি ক্যু ছিল, যেখানে কিছু সিভিল লোকজন বসিয়ে একটা সিভিল চেহারা আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে মিলিটারির পক্ষে অনেক বেশি কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে মাঠে কাজ করার ক্ষমতা ছিল। সে কারণেই মূলত অল্প সময়ে কিছু দৃশ্যনীয় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।

আর এখনকার সরকার পুরোপুরি সিভিল/বেসামরিক। বর্তমানে যেহেতু মিলিটারি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত নয়, এ সরকার সম্পূর্ণভাবে নিজের কর্তৃত্বে কাজ করছে। আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে, শুরুতে বেসামরিক প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। শেখ হাসিনার সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠান একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। সব পুলিশ পালিয়ে গেছে যেটা চিন্তা করাটাও কষ্টকর। তো, সেই পুলিশকে দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করানো মুশকিল। আপনি যেখানেই কাজ করাতে যান না কেন আপনার একটা বাহিনী লাগবে, লোকবল লাগবে।

এবং সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তাই একই ধরনের কার্যকর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রশাসন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাওয়ায় নাগরিক সেবাগুলোর কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব হয়নি। এটা তো গেল আলাদা হিসাব।

সবচেয়ে বড় কথাটা হলো, সরকার যদি আরো বেশি যোগ্য হতো, অর্থাৎ ড. ইউনূসের যদি একটি কার্যকর উপদেষ্টা পরিষদ থাকত তাহলে এ পরিস্থিতিতে আরো বেশি ভালো কাজ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উনারা অত্যন্ত অদক্ষ একটি সরকার গড়ে তুলেছেন। ফলে নাগরিক সেবা, পরিবেশ, গণপরিবহন—সব জায়গাতেই ব্যর্থতা।