খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি। বেঁচে থাকার জন্য এ উপাদান অপরিহার্য। তবে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য মানসম্মত খাবার আবশ্যক। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ ছাড়া মানুষের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়। কিন্তু বর্তমানে ‍নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তিও নানা কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আর্থসামাজিক কারণেও মানুষ অনেক সময় গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য নিজেদের জন্য নিশ্চিত করতে পারে না। দুঃখজনকভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় খাবারে ভর্তুকি দেয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা কম দামে খাবার খেতে পারেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে খাবারের দাম বেড়েছে এবং বিপরীতে মান কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খাবারের মান সন্তোষজনক নয়।

উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে বিবেচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা নানা প্রত্যাশা নিয়ে ভর্তি হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণী-পেশার পরিবার থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন এবং আবাসিক হলে ও ক্যাম্পাসেই দৈনন্দিন জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটান। ফলে ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও পুষ্টিগুণ সরাসরি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে। অথচ এখানে খাবারের গুণগত মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়ে গেছে দীর্ঘকাল ধরেই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ তরুণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎও। শিক্ষার্থীদের এ পুষ্টিহীনতা দীর্ঘমেয়াদে উন্নত জাতি গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

বণিক বার্তার এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগও উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, একদিকে খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে ক্যান্টিন ও ডাইনিংগুলোর অধিকাংশই স্বাস্থ্যকর ভালো মানের পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করে না। রান্নাঘরের পরিবেশ ভালো না। মাছ-মাংস পরিষ্কার করা হয় না। মাছের পেটে ময়লা থেকে যায়। মাংস কাঁচা থাকে। এমনকি খাবারে পোকামাকড়ও পাওয়া যায়। এছাড়া খাবারে ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের কথাও জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যান্টিন মালিকদের অতি মুনাফালিপ্সা ও অসাধুতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদারকির অভাবে এমনটি ঘটছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় খাবারের মানের এ সংকট দীর্ঘকালের। বিশেষত বিগত সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে ক্যাম্পাসগুলোয় তাদের ছত্রছায়ায় থাকা ছাত্রসংগঠনের দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজি ক্যান্টিন ব্যবস্থাপনাকে এক ধরনের জিম্মি করে রেখেছিল। ফলে খাবারের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়েছে, মান পড়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিস্থিতির সাময়িক কিছু উন্নতি হলেও বর্তমানে পুরনো বন্দোবস্তে ক্যান্টিনগুলো ফিরেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জন্য প্রধানত দায়ী ক্যান্টিন পরিচালনায় অদক্ষতা, অতিমুনাফার প্রবণতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদারকির অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তিন কারণে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীরা এতে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। যেমন ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রম, পার্কিনসনস, আলঝেইমারস ইত্যাদি।

খাবারের মান নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পুষ্টির ঘাটতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা গড়ে প্রতিদিন যে ক্যালরি গ্রহণ করছেন তা একজন তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় ২৮০০-৩০০০ কিলোক্যালরির প্রায় অর্ধেক। এ পুষ্টিহীনতা শিক্ষার্থীদের শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অস্থিরতা ও পড়াশোনায় মনোযোগ হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র বিদ্যমান। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়—সবখানেই শিক্ষার্থীরা খাবারের গুণগত মান ও দামে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কোথাও কোথাও প্রশাসনের সরাসরি নজরদারিতে মান কিছুটা উন্নত হলেও তা টেকসই হয়নি।

এক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যুক্তি, খাবারের মান উন্নয়নে বরাদ্দ প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে তারা মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে পারছেন না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক ছাত্র উপদেষ্টা বা প্রাধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, খাবারের দাম বাড়িয়ে পুষ্টিমান নিশ্চিত করা সম্ভব, কিন্তু শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় তা সম্ভব নয়। সুতরাং বরাদ্দের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সবার জন্য সহনীয় দাম নির্ধারণ করে খাবারের মানও বাড়ানো যায়। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি—সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহের দায়িত্ব কার? মনে রাখা প্রয়োজন, খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা—এসব শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উন্নত মানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাইলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় খাবারের মান বৃদ্ধি তাই অতীব জরুরি। সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।

খাবারের মান বৃদ্ধি ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যান্টিন পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। ক্যান্টিনের মালিক নির্বাচন ও পরিচালনায় শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বচ্ছ কমিটি থাকা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও অডিটের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে রান্না ও খাদ্য পরিবেশন নিশ্চিত করতে মাসিকভাবে ক্যান্টিন অডিট চালু করা প্রয়োজন। এ কাজেও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন ও ডাইনিং ব্যবস্থাকে সরকারি ভর্তুকির আওতায় এনে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যেন খাবারে পুষ্টি নিশ্চিত করেও তা সাশ্রয়ী রাখা যায়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গড়ে উঠছে, তখন তাদের মৌলিক প্রয়োজন সুস্থ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তা সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের জন্যও সমান ক্ষতিকারক। তাই খাবারের মানে পুষ্টি ও দামে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় নীতিনির্ধারকদের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।