কিন্তু জনমনে যে বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছিল তার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়। জনগণ বুঝতে পেরেছিল, উন্নয়নের সার্বিক চিত্রটি আসলে একটি ফেক বাবল। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি অর্থাৎ ব্যাংক খাত, রাজস্ব আয় এমনকি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। এসব স্থানে দেখা দিয়েছে নানামুখী বৈষম্য। অর্থনীতির খেলায় নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য তাই সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে। অর্থনীতিতে চাঙ্গা করার জন্য নতুন করে ব্যবসায়িক নীতিমালা গড়ার কোনো বিকল্প এ মুহূর্তে নেই।
জনসম্পদ এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এ সম্পদের পরিপূর্ণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়বদ্ধতা। জাতিসংঘের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যের ভিত্তিতে, চলতি বছর শেষে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ১৮ হাজারের আশপাশে পৌঁছবে। বর্তমানে জনসংখ্যার নিরিখে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪-২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য ও প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশে ১৫-৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যা ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান দেশের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি বড় সুযোগ। অন্তত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা বিচার করতে গেলে তো বটেই। কিন্তু দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মীর জোগান দিতে পারছে না। বিআইডিএসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ২৮-৩৪ শতাংশ স্নাতকসম্পন্ন শিক্ষার্থী বেকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাস করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ শতাংশ এবং প্রথম শ্রেণী প্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও প্রায় ৩৪ শতাংশ। কারণ শ্রমবাজার যেমন দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও কর্মপদ্ধতিসম্পন্ন কর্মী দাবি করছে, বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলামে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ সংশ্লিষ্ট বিষয়েরও অভাব রয়েছে।
নানামুখী এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগরায়ণের বড় ধাক্কা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দারিদ্র্য মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্রামে দারিদ্র্য কমলেও শহরে সে হারে কমছে না। সেখানে শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রাকে ‘মানবেতর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রতি চারজনের পরিবারে অন্তত একজন হয় বেকার অথবা অনিয়মিত দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। অর্থাৎ বিপুল জনশক্তিকে বহুমুখী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। যদি এখনই জনসম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বহু চাপ তৈরি হবে। অবশ্য এসব পরিসংখ্যানের অধিকাংশই বেসরকারি গবেষণা উৎস থেকে নেয়া হয়। সরকারি পরিসংখ্যানে তথ্য ও উপাত্ত কিছুটা কম দেয়া হয়। ফলে সঠিকভাবে পরিসংখ্যান যাচাই করে নীতিমালা প্রণয়ন করা যায় না। এটি সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেসব পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, সেগুলো মূলত জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি হ্রাস আর রফতানির সংখ্যাবৃদ্ধি দেখানোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এখানে পরিসংখ্যানকে নানাভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। যেমন ২০১০-১৯ সাল নাগাদ দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার যে তথ্য আমাদের সামনে ছিল তা এখন অনেকাংশে ভ্রম বলে মনে হচ্ছে। এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই ব্যাংক জালিয়াতি বা মেগা প্রজেক্টের আড়ালে অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। রফতানির তথ্যে যখন ১ হাজার কোটি ডলারের মতো ফাঁকি থাকে এবং মূল্যস্ফীতি লুকিয়ে রাখা হয়, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। পরিসংখ্যান যা-ই বলুক না কেন, বাজার সবসময় সত্যটা উপস্থাপন করে। এজন্যই বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
দেশে সম্পদের বৈষম্য এখন এমন এক পর্যায়ে, যেটা স্রেফ সাধারণ মানুষের বিপক্ষে কাজ করা একটা গাণিতিক সমীকরণ। অর্থনীতির আকার বড় করে নীতিনির্ধারকরা দেখিয়েছেন। কিন্তু দেশ এর কোনো রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট পায়নি। কয়েকটি পরিসংখ্যান বলছে, মোট অভ্যন্তরীণ সম্পদের ২৪ শতাংশ দেশের অতি ধনীদের (জনসংখ্যার হিসাবে ১ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণে। আবার আয়ের দিকে তাকালে অতি ধনীরা ৪১ শতাংশ এবং দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষ মাত্র ১৯ শতাংশ আয় করছে। এসব পরিসংখ্যান কী বলে? দেশে অনেক নীতি ও প্রকল্প নির্ধারণ হয়। এগুলো অভিজাত কিংবা বড় ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে করা হয়। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ এ কাঠামোর সুবিধা পায় না।
বেসরকারি খাতের অবস্থা আরো নাজুক। অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান, যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বা প্রভাব রয়েছে তারাই বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে। কারণ বাজারের ৯৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। বিশেষ ঋণ, করছাড় কিংবা ব্যবসায়িক পারমিট—এগুলো তারা সহজেই পান। অথচ দেশের অর্থনীতির আরেকটি মেরুদণ্ড অর্থাৎ এসএমই খাত (৩০ শতাংশ অবদান) এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। মূল্যস্ফীতি আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ছে। অথচ এসব উদ্যোগকে পুঁজি আর নীতিসহায়তা দিলে অর্থনৈতিক দক্ষতা অনেক বাড়ানো সম্ভব।
এদিকে ব্যাংক খাত অনেকটা লাইফ সাপোর্টে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষদিন পর্যন্ত দেশের খেলাপি ঋণের চিত্র ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বেনামে ঋণ নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থ লোপাট করেছে। এজন্য ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট প্রবল। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির এবং এ মুহূর্তে ডলার সংকট থাকায় অনেক পণ্যই আমদানি করা যাচ্ছে না। এর বিপরীতে ভিয়েতনামের দিকে তাকালে কিছুটা হতাশ হতে হয়। মধ্য আয়ের দেশটি ক্রমেই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সব তথ্য স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং শ্রমবাজার দক্ষ ও টেকসই। ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আমাদের জন্য তাই বড় পথনকশা।
এখন সমস্যা নিরসনে সমাধান আসলে কী? জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়া। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী ও পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং উপস্থাপনে আরো স্বাধীনতা দেয়া দরকার। এসএমই খাতে পুঁজি বাড়ানো জরুরি। সেজন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং প্রতিটি জেলায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। ব্যাংক খাতের তারল্য বিবেচনায় খেলাপি ঋণের বিষয়ে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নও জরুরি। এখানে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রবর্তনের পাশাপাশি নারী কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি। দেশের কর ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি। বিলাসজাত পণ্যে বেশি কর দেয়া যেতে পারে। কর ব্যবস্থায় যে বৈষম্য আছে তা চিহ্নিত করে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সংশোধন আনা জরুরি। এর বাইরেও অনেক পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তবে জরুরি ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নিলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো সহজ হবে।
মো. সালাউদ্দিন: সাবেক পরিচালক, রিয়াজ গার্মেন্টস










