ড. মোস্তফা কে মুজেরী, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। এছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও সিরডাপের গবেষণা পরিচালকও ছিলেন। বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ, পোশাক শিল্পে প্রভাব, পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যকরণসহ নানা ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক

বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব কেমন হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ইতোপূর্বে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। এখন এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যুক্ত হওয়ার কথা ১ আগস্ট থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে এখন ৫০ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। এতে বিশেষ করে আমাদের সর্ববৃহৎ রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের ওপর একটা বড় আঘাত আসবে। এর বড় কারণ, যারা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক খাতে, যেমন ভারত, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশ, তারা কিন্তু সফলভাবে দরকষাকষি করে তাদের শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে। এর ফলে যা হবে তা হচ্ছে, এসব দেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বৈষম্যমূলক একটা অবস্থান তৈরি হবে বাংলাদেশের জন্য যা আমাদের রফতানিকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেহেতু এসব দেশের জন্য শুল্কহার কম থাকবে তাই আমাদের বিদ্যমান অর্ডার বা ভবিষ্যতে নতুন অর্ডারগুলো এসব দেশে চলে যেতে পারে। ফলে আমাদের সবচেয়ে বড় যে রফতানি খাত সেই খাতটিতে বড় আঘাত আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। কার্যকর হওয়ার আগেই আমাদের দরকষাকষি করে শুল্কহার অন্তত একই পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন কিন্তু তিন মাস আগেই, বিশেষ করে যেসব দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তাদের ওপর এ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল। যেমন তখন বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের কথা বলা হয়েছিল যা ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ছিল ৪৫ শতাংশ। তবে এগুলো তিন মাস স্থগিত রাখা হয়েছিল যাতে এ দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি যৌক্তিক সমাধানে আসতে পারে। কিন্তু এ সময়ে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা আরো অনেক দেশ যদিও সফলভাবে এ অতিরিক্ত শুল্কহার ২০ শতাংশের কাছাকাছি কমিয়ে আনতে পেরেছে, বাংলাদেশ তা ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশে নামাতে পেরেছে। এর ফলে এ অবস্থার পরিবর্তন না হয় তাহলে ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একটা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে যা আমাদের রফতানিকে ব্যাহত করবে। ফলে বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন তাতে কতটুকু সফলতা আসবে সেটা ভবিষ্যতের কথা। কারণ আমাদের যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যকে ধরে রাখা। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যকে ধরে রাখার জন্য আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে তখন বেশি শুল্ক থাকলেও তাদের সঙ্গে তুলনামূলক কম মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে। এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রফতানি বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখা।

বাংলাদেশ কীভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে?

দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে নিঃসন্দেহে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। দেশের পোশাক খাত একেবারে দক্ষতার শীর্ষে আছে তা বলা যায় না। অনেক অদক্ষতা রয়েছে। সব অদক্ষতা কীভাবে দূর করা যায় সেই প্রচেষ্টা নিতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি শুল্ক না কমায় তাহলে বেশি দিয়েই আমাদের পণ্য রফতানি করতে হবে। কারণ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। বেশি শুল্কেই যদি রফতানি করতে হয় তাহলে বাংলাদেশে একটা বড় প্রভাব পড়বে। অনেক অদক্ষ কারখানা রয়েছে যেগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং অনেক শ্রমিক চাকরিচ্যুত হতে পারেন। সবকিছু মিলিয়ে একটি প্রতিকূল অবস্থায় পড়বে পোশাক খাত। কারণ এটিই দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত এবং উৎপাদনের দিক থেকেও একটি বড় শিল্প। সেখানে প্রচুর শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিকও নিয়োজিত আছেন।

শুল্কহার কমানো ছাড়াও শুল্ক চুক্তিতে কিছু শর্তের কথা উঠে এসেছে। এ শর্তগুলো আসলে বাংলাদেশের পক্ষে কতটুকু মানা সম্ভব হবে বা এগুলো মেনে চুক্তি করা উচিত কিনা?

ভূরাজনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র তো চাইবেই আমাদেরকে হাত-পা যতটা সম্ভব বেঁধে রাখতে। এটাই তো যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দেশগুলোর নীতি। যেহেতু আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল এবং তাদের ঘোষিত শুল্কহার কার্যকর হলে আমাদের পোশাক শিল্পে একটা বিরাট আঘাত পড়বে, তাই এ সুযোগে তারা তাদের শর্তগুলো আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করবে। এক কথায় বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো চলতে হবে আমাদের। দেখুন, দ্বিতীয় দফা বাণিজ্য আলোচনা যা ৯-১১ জুলাই শেষ হয়েছে, সেখান থেকে ফিরে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন যে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তবে বেশকিছু বিষয়ে মতানৈক্য রয়ে গেছে যা নিয়ে তৃতীয় দফা আলোচনা হবে। তবে কী কী বিষয়ে মতানৈক্য তা গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটা কিন্তু ধারণা করা যায়—এগুলো সরাসরি বাণিজ্য বিষয়সংক্রান্ত নয়, এগুলোর ব্যাপ্তি অনেক ব্যাপক যা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবান্বিত করতে পারে। এতে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে যে সার্বভৌমত্ব তা ক্ষুণ্ন হবে, যা আমাদের কাম্য হতে পারে না। এজন্য এ ধরনের চুক্তি করা যৌক্তিক হবে কিনা সেটাও দেখতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে চুক্তিতে যাওয়া কতটুকু সমীচীন হবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বর্তমানে দেশে কোনো নির্বাচিত সরকার নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া কতটুকু সমীচীন হবে তা ভেবে দেখতে হবে। আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় যে ভুল করেছে সেটা হচ্ছে আমরা তিন মাস সময় পেয়েছিলাম। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসেই পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে ঘোষণা দেয়। গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। ঘোষণার কিছুদিন পরই তিন মাসের জন্য তা স্থগিত করে। অর্থাৎ তিন মাস পর এটা কার্যকর হবে। যে সময় শেষ হয়েছে গত ৯ জুলাই। এ সময়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ নেয়নি। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য ৯, ১০ ও ১১ জুলাই—এ তিনদিন ধার্য করেছে। অর্থাৎ যখন সময়টা প্রায় শেষ হয়েছে। তিন মাস আমরা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। অন্যান্য দেশ যারা সফলভাবে শুল্কহার কমাতে পেরেছে তারা কিন্তু এ ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। ভিয়েতনাম দরকষাকষি করে শুল্কহার ৪৬ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে। ভিয়েতনাম করতে পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা পারলাম না কেন? সেটি আমাদের ব্যর্থতা।

ভিয়েতনাম দরকষাকষিতে সফল হলেও আমরা ব্যর্থ হলাম কেন?

ভুলটা আমরাই করেছি। আমরা যদি প্রথম দিক থেকেই সিরিয়াস হতাম এবং সঠিকভাবে আলোচনা করতাম, তাহলে হয়তো সফল হওয়া যেত। আলোচনার জন্য আমরা সময় ক্ষেপণ করেছি। আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা সঠিক পন্থা ও কৌশল গ্রহণের জন্য যথাযথ হোমওয়ার্ক করিনি। একটা উদাহরণ দিই। আমরা প্রথম দফায় আলোচনা করলাম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নেতৃত্বে। এতে আমরা প্রথমেই পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিলাম যে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় ভূ-নিরাপত্তা বিষয়ক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা হলো, তাদের স্বার্থে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য কিংবা অন্যান্য সহায়তা বিষয়ক বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করার। এ আলোচনার জন্য আমাদের বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় আছে, বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ট্যারিফ কমিশন রয়েছে। আলোচনা অপরিকল্পিত ও অগোছালো ছিল। যদিও দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে হয়েছে তবে আমরা অনেকটাই সময় ক্ষেপণ করেছি, ফলে সফলতা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে এখন পর্যন্ত। এখন প্রস্তুতি চলছে তৃতীয় দফায় আলোচনার যা এ মাসেই শুরু হওয়ার কথা। আশা করা হচ্ছে, একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। তবে সময়ই বলে দেবে আমরা এতে কতটুকু সফল হব।

পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ওই প্রতিনিধি দলে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

প্রতিনিধি দলে ব্যবসায়ীদের রাখা দরকার ছিল। পারস্পরিক সম্পর্ক একটি বড় জিনিস। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে নেগোসিয়েশন করা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) একজন প্রতিনিধি থাকলে আরো ভালোভাবে আলোচনার কৌশলগত দিক দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন বা মানিয়ে নেয়া সম্ভব হতো। এজন্যই আমি বলেছি, ‘আমরা সঠিক কৌশল নিতে পারিনি। সঠিক সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। সঠিক ব্যক্তিকেও সঠিক সময়ে আলোচনায় নিয়োজিত করতে পারিনি।’

ভিয়েতনাম পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর নতুন করে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিদ্যমান আছে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্কহার কমিয়ে আনতে পারলেও এখনো বাংলাদেশ পারেনি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বা রফতানি বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

আমাদের যারা প্রতিযোগী নিঃসন্দেহে তারা একটি সুবিধা পাবে। ভারত বা ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক রফতানিতে আমাদের বড় প্রতিযোগী। প্রতিযোগিতায় সফলভাবে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে বেশকিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে একটি উপায় হচ্ছে সক্ষমতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি যার প্রধান মাধ্যম হবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। তবে সেটা রাতারাতি হবে না। কীভাবে সক্ষমতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারব সেটার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার বিষয় আছে। আমাদের যারা প্রতিযোগী রয়েছে তাদেরও যদি বাংলাদেশের মতো ৫০ শতাংশ শুল্ক হতো তাহলে একটা মোটামুটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকত। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগীরা যেহেতু চুক্তি করে শুল্কহার কম করে নিতে সক্ষম হয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একটি সুবিধা পাবে।

আমাদের রফতানির সিংহভাগ দখল করে আছে তৈরি পোশাক। আমাদের একক বাজার ও একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে কতটুকু ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে?

একটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কীভাবে বাংলাদেশকে একটা সংকটময় পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে, তার বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ। আমাদের এখান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। একটা দেশ যদি একক বাজার বা পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়, দুর্যোগটা কীভাবে আসতে পারে এটি সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে। কাজেই রফতানি বাজার বৈচিত্র্যময় করতে ও উৎপাদন বাড়াতে অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে। এসব কথা নতুন নয়। এগুলো করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একমাত্র তৈরি পোশাকই প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি রফতানি হয়। এসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হলে আমাদের পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। আরো আগে থেকেই আমাদের এদিকে বেশি দৃষ্টি দেয়া উচিত ছিল। এখন আরো বেশি দিতে হবে। বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করা না গেলে রফতানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা থেকে যাবে।

পণ্য বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে আমরা কোন কোন পণ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে পারি?

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আছে। ফার্মাসিউটিক্যালস একটি ভালো শিল্প হতে পারে। এগুলো আমরা রফতানিও করছি। এছাড়া আরো অনেক পণ্য আছে যেগুলো রফতানি করা যায়। কৃষি খাতেও আমাদের অনেক কৃষিপণ্য আছে। এভাবে আমরা রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারি। কিন্তু কৃষকের হাতে যখন পণ্য থাকে তখন এর মূল্য খুব একটা থাকে না। যখনই পণ্যটি কৃষকের হাত থেকে বেরিয়ে যায় তখন মূল্য বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ে আলু ও চাল অন্যতম উদাহরণ। এভাবে আমরা কৃষিকে ধ্বংস করে ফেলছি। কৃষকরা পণ্যের দাম পান না। কৃষি শিল্প বিকাশ হলে আমরা কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য বিদেশে রফতানি করতে পারতাম। এতে কৃষকরা ভালো মূল্য পেতেন।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা কমাতে হলে আমাদের কী করণীয়?

আমাদের তৈরি পোশাক এ দুই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেখানে আমরা তৈরি পোশাক রফতানি করতে পারি। ইউরোপের অনেক দেশ, জাপান ও রাশিয়াসহ আরো অনেক দেশ আছে যেখানে তৈরি পোশাক, কৃষিজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যও রফতানি করতে পারি। এজন্য বাজার অন্বেষণ করতে হবে। কোন বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা আছে সেটি শনাক্ত করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমাদের পণ্য তৈরি করতে হবে। আমাদের এক্সপ্লোর করার মানসিকতা নেই। রফতানি বাজারগুলো কোথায় কীভাবে বিকাশ হচ্ছে, পণ্যের চাহিদা কোথায় বাড়ছে, কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, কী ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে এসব তথ্য যদি সংগ্রহ করা যায় তাহলে আমাদের রফতানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ করা সম্ভব। পৃথিবীর বেশির ভাগ বড় বড় দেশেই আমাদের দূতাবাস রয়েছে। দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তথ্য দিতে পারে। সেই অনুসারে ব্যবসায়ী যারা আছেন তারা সেটাকে ফলোআপ করতে পারেন। বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করতে পারলে এ ধরনের ধাক্কাকে আমরা সামলে নিতে সক্ষম হব, যা আমাদের রফতানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা অশনিসংকেত সৃষ্টি করেছে বর্তমান সময়ে।