প্রশ্ন উঠেছিল যে সংবিধান না মেনে অন্তর্বর্তী সরকার বসানো হয়েছে কিন্তু সংবিধান মেনে অফিস আদালতে শেখ মুজিবের ছবি কেন ঝুলানো হবে। জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মুখে ফ্যাসিবাদী হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা এবং সরকারি অফিস থেকে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণের মতো কিছু সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে অন্য অনেকের মতো আমার মাথায়ও এ রকম কিছু বিচ্ছিন্ন চিন্তা ঘুরপাক খাওয়া শুরু করে।

আমরা কি সত্যিই সাংবিধানিক ধাঁধার মধ্যে রয়েছি?

পরবর্তী সময়ে একদিকে দেখলাম অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা চেয়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স পাঠানো এবং অন্যদিকে দেখলাম সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাষ্ট্রদ্রোহের ভয়ে প্রায় তিন মাস শেখ মুজিবের ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে অফিস করা।

সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য ‘ডক্ট্রিন অব নেসেসিটি’র ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা দিয়েছে। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করা হয়েছে; শুনেছি যেখানে রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি কিছু অফিস থেকে শেখ মুজিবের ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে এটিও ডক্ট্রিন অব নেসেসিটির ভিত্তিতে করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে একাডেমিক পরিমণ্ডলে তাই আজকের এই সাংবিধানিক বিতর্ক। এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো যে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে শপথ নিয়েছিল যেখানে নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তন সম্ভব কিনা।

আমরা জানি পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অন্তর্নিহিত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকার পরিবর্তন করা অসম্ভব ছিল। এই প্যারাডক্স অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করলেও এর ব্যবহারিক বা রাজনৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেনি।

মূল সাংবিধানিক প্রশ্ন

১. একটি অননুমোদিত সংবিধানের অধীনে সরকার গঠন

বাংলাদেশের সংবিধান, অন্য অনেক দেশের মতো, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য রচিত হয়েছিল। তবে ফ্যাসিবাদী হাসিনার অপসারণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না বরং এটি ছিল বিপ্লবী গণ-অভ্যুত্থানের পরিণতি। সমালোচকরা যুক্তি দেখান যে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান সংবিধানের অধীন শপথ নিয়েছিল যা এমন সরকার গঠনের ব্যবস্থা করে না; কারণ সরকার পরিবর্তনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রয়োজন।

এই প্রশ্নটি সাংবিধানিক রীতি সম্পর্কে একাডেমিক উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এর বাস্তবতা আরো জটিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রাথমিকভাবে জনগণের ইচ্ছা (will of the people) থেকে উদ্ভূত হয়, যে জনগণ পূর্ববর্তী শাসনের কর্তৃত্ববাদিতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করে আসছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত বৈধতা, সাংবিধানিক কাঠামোর সীমার বাইরে হলেও তা জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার শক্তিকে প্রতিফলিত করে। এ অবস্থায় সবাই আওয়াজ তোলে যে সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো, বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনে ও সরকারের কাজে জনগণের দাবির প্রতিফলন হওয়া উচিত।

২. সংবিধান সংশোধন বা একটি নতুন সংবিধান তৈরি করার কর্তৃত্ব

বিপ্লবী পরিবর্তনের পর একটি বড় প্রশ্ন হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা আছে কিনা বা এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে পারে কিনা। যদিও বিপ্লব প্রায়ই সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে সংবিধানের সংশোধনের ক্ষমতা বা সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করার ক্ষমতা প্রদান করে না।

সংবিধানের ক্ষমতা একটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত পরিষদের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়, বিশেষ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধনের দায়িত্ব গণপরিষদকে দেয়া হয়।

কাজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন ছাড়াই সংবিধান পুনর্লিখনের ক্ষমতা একতরফাভাবে দাবি করতে পারে না; গণপরিষদের মতো একটি যথাযথভাবে নির্বাচিত পরিষদকে সেই ক্ষমতা দিতে পারে।

সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তনের বৈধতা তাই এমন একটি প্রক্রিয়ার ওপর ন্যস্ত করা উচিত, যেখানে যথোপযুক্ত একটি গণপরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করে।

এটি নিশ্চিত করবে যে নতুন সাংবিধানিক কাঠামো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা বৈধকরণের সম্ভাবনা এড়িয়ে জনগণের পূর্ণ সমর্থন অর্জন করেছে।

তিউনিসিয়া থেকে শিক্ষা: ২০১১ সালে বেন আলী সরকারের উৎখাতের পর তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান শিক্ষা হতে পারে। যদিও সেখানে সামরিক বাহিনী বিপ্লবে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিল এবং বিপ্লবে তাদের মালিকানা দাবি করেনি। তিউনিসিয়ার বিপ্লব-উত্তর প্রেক্ষাপটে একটি বৈধ সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য তারা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল।

জাতীয় গণপরিষদ নির্বাচন: বিপ্লবের পর তিউনিসিয়ার গৃহীত প্রথম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি ছিল নতুন সংবিধান প্রণয়নের একমাত্র ম্যান্ডেটসহ জাতীয় গণপরিষদ নির্বাচন করা। এ পরিষদকে শুধু দেশের নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করাই নয়, বরং স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া: তিউনিসিয়ার গণপরিষদ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীর বিস্তৃত সমন্বয়পূর্বক গঠিত হয়েছিলো। এই বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে যে নতুন সংবিধান তিউনিসিয়ার বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ এবং সমাজের সব শ্রেণীর চাহিদার প্রতিফলন।

বিপ্লবী এবং সাংবিধানিক বৈধতার ভারসাম্য: তিউনিসিয়ার বিপ্লব-উত্তর যাত্রা একটি হাইব্রিড পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত: পুরনো সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অংশগুলো অস্থায়ীভাবে স্থগিত করা হয়েছিল যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু বিপ্লবোত্তর যাত্রাটি শেষ পর্যন্ত একটি নতুন গণতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর দিকে নিয়ে যায়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিপ্লবী দাবির প্রতি সাড়া দেয়ার মধ্যে এই ভারসাম্যমূলক কাজটি তিউনিসিয়াকে স্থিতিশীলতা রক্ষা করার পাশাপাশি বিপ্লবের দাবি পূরণ করতে সহায়তা দেয়। এবং ২০১৪ সালে তারা একটি সংবিধান পায় যেটি গণতন্ত্র ও মানাবাধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়।

কারো কারো মতে তিউনিসিয়ার বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট মডেল হতে পারে, যেখানে সাংবিধানিক শূন্যতা মোকাবেলার জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করা যেতে পারে এবং ভবিষ্যতের শাসন যেন গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে পারে।

বেন আলির পতনের পরে সেখানে সেনাবাহিনী শাসনক্ষমতার কোনো মালিকানা দাবি না করলেও আমাদের এখানে কিছুটা ভিন্নতা আছে। আমরা ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলাম সেনাবাহিনীর ডাকে, তাদের আমরা শহীদ মিনারে বা জনতার মাঝে ডাকতে পারিনি বা সেখানে জনতার কাছে শপথ নিতে পারিনি; ’৭১-এর মতো আমরা প্রভিশনাল কনস্টিটিউশনও বানাতে পারিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শিক্ষা: দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য যুগের অবসান ঘটে ১৯৯৪ সালে, যা ছিল নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। প্রথমে একটি অন্তর্বর্তী সংবিধান গৃহীত হয়, যা নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের ভিত্তি তৈরি করে।

একটি Constitutional Assembly গঠিত হয়, যেখানে জনগণের মতামত গ্রহণে বিভিন্ন উপায়ে আলোচনা ও পরামর্শ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার, সমতা এবং অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের এই সংবিধান একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে পরিচিত, যা এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রগতিশীল সংবিধান বলে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে গণপরিষদের সম্ভাব্যতা: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি গণপরিষদ গঠন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে:

বৈধতা সংকট: বর্তমান সরকার একটি বৈধতা সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত না হওয়ার কারণে। গণপরিষদ গঠনে বিশেষভাবে নির্বাচনের আয়োজন ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করতে পারে না, বিশেষ করে যেহেতু অনেক মানুষ সাংবিধানিক কাঠামোর জটিলতার সঙ্গে অপরিচিত থেকে যায়। জনসচেতনতার এই অভাব কম ভোটার উপস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে আরো নষ্ট করে দিতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিরোধ: বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গণপরিষদ গঠনের চেয়ে জাতীয় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেবে। যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই উদ্দেশে একটি পৃথক নির্বাচন আয়োজন করতে অগ্রসর হয়, তবে এটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে। এ ধরনের প্রতিরোধ গণপরিষদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।

ব্যবহারিক বিবেচনা: পূর্বে বর্ণিত চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে এই সময়ে গণপরিষদের জন্য একটি পৃথক নির্বাচন আয়োজন করা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। একটি ভালো বিকল্প হতে পারে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য পৌঁছানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করা।

এই সুপারিশগুলোকে জাতীয় আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে পারে, যার ফলে নিশ্চিত করা যাবে যে পরিবর্তনের জন্য বৈপ্লবিক দাবিগুলো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পূরণ করা হবে।

সংবিধান সংশোধনী বনাম নতুন সংবিধান: একটি নতুন সংবিধানের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বিবেচনা

১. পঞ্চদশ সংশোধনীর নজির

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, যদিও টেকনিক্যালি এটি একটি সংশোধনী, অনেকগুলি বিধানকে এতটাই পরিবর্তিত করেছে যে এটি কার্যকরভাবে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করেছে। এটি ব্যাপক সংস্কারে সংবিধানে বর্ণিত সংশোধনী ক্ষমতা ব্যবহার করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে, কারণ এটি সাংবিধানিক সংশোধন এবং পূর্ণ প্রতিস্থাপনের বিষয়কে অস্পষ্ট করে। কারো কারো মতে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংশোধনী ক্ষমতার বিস্তৃত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর না করে একটি নতুন সংবিধান তৈরির জন্য একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া যেতে পারে। বর্তমানে সংশোধনীটির বৈধতা নিয়ে একটি রিট পিটিশন পেন্ডিং রয়েছে। ২. অনুচ্ছেদ 7B-এর অপরিবর্তনীয়তা

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের 7B অনুচ্ছেদে ‘মৌলিক কাঠামোর মতবাদ’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সংবিধানের এক-তৃতীয় অংশ বিধানকে অপরিবর্তনীয় বলে ঘোষণা করে।

এটি একটি ইটারনিটি ক্লজ হিসেবে বিবেচিত হয় যা আইনি অচলাবস্থা তৈরি করে যেখানে শাসন বা রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন সংবিধানকে সর্বতোভাবে প্রতিস্থাপন ছাড়া অসম্ভব।

এই অনমনীয়তাকে প্রায়ই গণতান্ত্রিক বিবর্তন এবং সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অন্তরায় বলে সমালোচনা করা হয়।

তাছাড়া এটি এক সংসদকে পরবর্তী সংসদের ওপর সুপ্রিয়টি দেয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা মামলায় এরূপ ইটারনিটি ক্লজ বহাল থাকতে পারে কিনা তা বিবেচিত হবে। একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের চ্যালেঞ্জ

১. একটি গণপরিষদ প্রতিষ্ঠা সম্ভাব্যতা আগে যেমন আলোচনা করা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গণপরিষদের নির্বাচন আয়োজন করা চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। গণপরিষদের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব এবং জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রতিরোধ প্রক্রিয়াটিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

২. বিভিন্ন স্বার্থের ভারসাম্য

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) বনাম মেজরিটারিয়ান সিস্টেম

একটি নতুন সংবিধানে অবশ্যই নির্বাচনী কাঠামোর দিকে নজর দিতে হবে, তবে সেখানে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ রয়েছে।

যেমন কিছু গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য বা কিছু দল তাদের দেশব্যাপী বিছিন্ন জনসমর্থনের জন্য একটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সিস্টেমের পক্ষে সমর্থন করে, অন্যরা সরলতা এবং স্থিতিশীলতার জন্য একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবস্থা পছন্দ করে। এই পার্থক্যগুলো মিটমাট করার জন্য ব্যাপক সংলাপ এবং ঐকমত্য নির্মাণের প্রয়োজন।

সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা: বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সামাজিক কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সংবিধানে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের যত্নশীল বিবেচনার প্রয়োজন। যেকোনো একটি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অত্যধিক জোর দেয়া জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

সংবিধান সংশোধনী: আগেই বলা হয়েছে যে এ মুহূর্তে গণপরিষদ ছাড়া সংবিধান সংশোধনী সম্ভব নয়। আবার গণপরিষদ বা পরবর্তী সংসদ সংবিধান সংশোধন করলেও তা ভবিষ্যতে টিকে থাকবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

জুডিশিয়াল রিভিউ অব কনস্টিটিউশনাল অ্যামেন্ডমেন্ট: বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট অষ্টম সংশোধনী মামলা (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ) এর মাধ্যমে কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা লাভ করে।

বেসিক স্ট্রাকচার ডক্ট্রিন–এই মামলার মাধ্যমেই বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। এটা কোর্টের একটি এক্সট্রা অর্ডিনারি পাওয়ার।

এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি সংশোধনীকে (৮ম, ৫ম, ৭ম, ১৩শ ও ১৬শ) সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে।

এর মধ্যে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী দিয়ে সামরিক শাসনামলের তৈরীকৃত বিভিন্ন আইনের বৈধতা দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট এ দুটি সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে।

ধরা যাক, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা পরবর্তী সরকার গণপরিষদ বা পরবর্তী সংসদের মাধ্যমে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন করে নতুন একটি সংশোধনীর মাধ্যমে এই সময়ে করা সব আইনের বৈধতা দিয়ে দিল।

পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের হাতে কিন্তু এই সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা থেকে যায়।

সংবিধান সংস্কার কমিশন : জানা নেই সংবিধান সংস্কার কমিশন কী করবে–তারা হয় সংবিধান সংশোধন, না হয় পুনর্লিখন করার সুপারিশ করবে। উভয় ক্ষেত্রেই সেগুলো বাস্তবায়নে তাদেরকে গণপরিষদ গঠন করতে হবে। আর তা সম্ভব না হলে সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন করার সুপারিশগুলো নিয়ে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করতে পারে সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য।

এ লক্ষ্যে তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের সুপারিশগুলো সন্নিবেশ এবং সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন করার জন্য নির্বাচন কমিশন, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও তাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করতে পারে।

এরূপ চুক্তি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন ভূমিকা রাখতে পারে যেমন রাজনৈতিক দল বা দলগুলো সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের সুপারিশগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে বা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করলে ক্ষেত্রবিশেষে তাদের নিবন্ধন বাতিল বা সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিল করতে পারবে।

তাই রাজনৈতিক দলগুলো এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্ব ও কর্মকে পূর্ববর্তীভাবে বৈধতা দেয়ার ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ম্যান্ডেট সেই নির্বাচিত সরকারেরই থাকবে।

তবে জুডিশিয়াল রিভিউর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী বা পুনর্লিখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। তাই সংবিধান সংশোধনী বা পুনর্লিখনকে সাস্টেইনেবল করতে হলে সেগুলোকে গণপরিষদ বা গণভোটের মাধ্যমে লিকপ্রুফ বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম: অধ্যাপক, আইন বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়