তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে গত বছরের মে মাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক’ স্থাপনে গুরুত্বারোপ করেন। পরে তারই নির্দেশনায় সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য সম্প্রতি ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটিকে (এমআরএ) ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নন বেশির ভাগ অংশীজন। বিশ্লেষকরাও বলছেন, আবেগের বশবর্তী না হয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। সরকারের এ উদ্যোগ সময়োচিত কিনা তা নিশ্চিতের জন্য যা যা করা দরকার ছিল:

প্রথমত, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক (এমসিবি) প্রতিষ্ঠায় তাড়াহুড়ো না করে অংশীজনদের ব্যাপক মতামতের প্রয়োজন ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ১৫ ডিসেম্বর ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক গঠনের খসড়া অধ্যাদেশ ঘোষণা করেছে এবং জনমতের জন্য আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমআরএর (এমআরএ) অধীনে প্রায় ৭০০টি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) পরিচালিত হচ্ছে। যদিও বড় এমএফআইগুলো বাজারের বড় অংশ দখল করে আছে, তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মূলত ছোট ও মাঝারি এমএফআইগুলো কাজ করে। তারা শুধু ঋণই দেয় না, বরং টেকসইভাবে স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং শিক্ষার মতো ‘‌প্লাস’ কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা সমন্বিত বা ‘‌হোলিস্টিক’ পদ্ধতিতে কাজ করার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে, যা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমআরএ-ও সামাজিক উন্নয়নে উদ্বৃত্তের ২০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়ের অনুমতি দেয়। এ প্রেক্ষাপটে এত দ্রুত ব্যাংক গঠন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, ছোট ও মাঝারি এমএফআইসহ সবার মতামত নেয়া জরুরি। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়, তবে তারা তাদের ‘‌সমন্বিত ও সামগ্রিক’ সামাজিক কার্যক্রম কীভাবে চালিয়ে যাবে—তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের মূল ভিত্তিই ছিল সমন্বিত উন্নয়ন। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তর করা মূলত একটি ‘‌মিশন ড্রিফট’ বা লক্ষ্যচ্যুতি। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য পরিমাপ না করে মানুষের ঝুঁকি ও নাজুক অবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

তৃতীয়ত, ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের প্রভাব কী হবে তা বিশ্লেষণ প্রয়োজন ছিল। এ খাতে প্রায় চার কোটি পরিবার জড়িত এবং পাঁচ লাখ কর্মী কাজ করছেন। মোট ১৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে সদস্যদের সঞ্চয় ৫ বিলিয়ন ডলার (৪৩ শতাংশ)। পিকেএসএফ ৭ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকেরও ১৮ শতাংশ এখানে অংশীদারত্ব রয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে বৈদেশিক অনুদান আরো কমে যাবে। গত দুই দশকে এ খাতে বৈদেশিক অনুদান প্রায় নেই বললেই চলে। এমএফআইগুলো উদ্যোক্তা তৈরি এবং কারিগরি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছে। ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের উদ্যোগ এ প্রগতিশীল ভূমিকা হ্রাস করতে পারে, যা মূলত ক্ষুদ্র ঋণের উদ্বৃত্তের ওপর নির্ভরশীল।

চতুর্থত, ক্ষুদ্র ঋণ খাতের অগ্রাধিকার এবং প্রস্তাবিত ব্যাংকের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। এ খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা প্রয়োজন। একজন কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, বর্তমান সমস্যাগুলো হলো—ক. ঋণের দ্বৈধতা এবং ওভারল্যাপিং। খ. কর্মীদের দ্বারা অর্থ আত্মসাৎ। গ. খেলাপি ঋণের প্রবণতা বৃদ্ধি। ঘ. ছোট ও মাঝারি এমএফআইয়ের জন্য ভর্তুকিযুক্ত মূলধনের অভাব। ঙ. আরজেএসসি নিবন্ধনে জটিলতা ও অস্বাভাবিক বিলম্ব।

এমআরএ কর্তৃক প্রস্তাবিত সিআইবি এবং এসআইবি সফটওয়্যারের কাজ ধীরগতিতে চলছে। অন্যদিকে পিকেএসএফের মূলধন সীমাবদ্ধতা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্ত ক্ষুদ্র ঋণ খাতের জন্য সহায়ক নয়। অন্তর্বর্তী সরকার যদি এ খাতকে সাহায্য করতে চায়, তবে পাঁচটি সমস্যার সমাধান করা উচিত। ব্যাংক গঠন করলে এ সমস্যাগুলো সমাধান হবে না, বরং ছোট এনজিওগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক ছোট ও মাঝারি এমএফআইয়ের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলোকে এমন কিছু ‘‌সুপার পাওয়ার’ বা বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে যা এমএফআইয়ের নেই:

ক. এই ব্যাংক ‘‌পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট ১৯৩১’ অনুযায়ী ঋণ আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করতে পারবে, যা সাধারণ এমএফআই পারে না। খ. ব্যাংক স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক বা হাইপোথিকেশন নিতে পারবে। গ. বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ করতে পারবে, যা এমএফআইয়ের জন্য সীমাবদ্ধ। ঘ. ব্যাংকের লাইসেন্স বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিতে হয়, ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এমআরএ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে আইনি জটিলতা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে। ঙ. এমএফআইয়ের বিকাশে নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম (যেমন ফজলে হাসান আবেদ বা শফিকুল হক চৌধুরী)। শুধু যান্ত্রিক গণতান্ত্রিক নিয়ম চাপিয়ে দিলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

ষষ্ঠত, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক গঠনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। যেসব দেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক তৈরি করা হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে যে এটি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রান্তিক করে ফেলেছে। অনেক দেশে প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ছোট ও মাঝারি এমএফআইগুলো ধসে পড়েছে। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা উচিত।

রেজাউল করিম চৌধুরী: নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন