মাহফুজ আলম, অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। এর আগে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) দেয়া তার এক সাক্ষাৎকারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বাপর নানা ইস্যু উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ

এক বছর আগের ৫ আগস্টে ছিল একদিকে প্রচণ্ড ভয় আবার অন্যদিকে প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণ। সেই সময়ের কোন মুহূর্ত আপনার মনে পড়ে?

গত বছরের ২ আগস্ট একটি অনলাইন পোর্টাল রিপোর্ট প্রকাশ করে আন্দোলনের পেছনে একজন ইন্টেলেকচুয়াল তরুণ আছেন এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে। আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, যারা অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের সবার এক ধরনের অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর আমার পরিচয় উন্মোচিত হয়ে যায়। এতে আমি ১৯ জুলাই থেকে যে বাসায় আত্মগোপনে ছিলাম সেখানে থাকা অনিরাপদ হয়ে যায়। আমার সঙ্গে চারজনের একটি গ্রুপ ছিল। তারা হলেন—নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার। ৫ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত এ গ্রুপ থেকেই মূলত অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। ১৭ জুলাই যখন আখতার গ্রেফতার হয় এবং ১৯ জুলাই রাতে নাহিদ গুম হয় তখন আসিফ কিংবা বাকের কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাচ্ছিল না।

তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, তাদের সব মোবাইল যেহেতু গোয়েন্দা সংস্থার হাতে যাবে বা সরকারের হাতে যাবে, তারা জানতে পারবে আমার সঙ্গে সংলাপ হচ্ছে বা আমাদের দিক থেকে নির্দেশনা যাচ্ছে, পরামর্শ যাচ্ছে অথবা কো-অর্ডিনেশন হচ্ছে। এ কারণেই আমাকে স্বাভাবিকভাবেই আত্মগোপনে যেতে হয়েছে।

কিন্তু আত্মগোপনের অবস্থা ২ আগস্ট ব্রেক করে। এখন আত্মগোপনে থাকার আর কোনো মানে নেই। কারণ সরকার, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও গণমাধ্যম—সবাই মিলে কো-অর্ডিনেটেড উপায়ে এটা সামনে নিয়ে আসে যে একজন আন্দোলনের পেছনে আছেন, যার সিভিল সোসাইটি, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। পুরাতন ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্রশক্তি—এ সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আন্দোলনে জড়িত। ফলে আমার কাছে মনে হয়েছে, অলরেডি উই আর এক্সপোজড। এখন আত্মগোপনে থাকা না থাকা একই। অভ্যুত্থানের পেছনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, যারা ভূমিকা রাখছেন তাদের সবার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নাহিদ ও অন্য যারা ছাত্রনেতা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

ওইদিন অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিলেন, আজকের রাতটা একটু অন্য কোথাও গিয়ে থাকেন। পরদিন সকালে স্থান পরিবর্তন করিয়েন। আমরা যে বাসায় ছিলাম ওই বাসার মালিক আশ্রয় দিলেন। ওই রাতে আমি আর আমার বোন রাত ৫টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। বাস্তবিকভাবেই ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমি ব্যক্তিগতভাবে রাতে ঘুমাতাম না। সকাল ৬টা থেকে ৭টার পর ঘুমাতাম। কারণ পুলিশ যদি আমাদের তুলে নিয়ে যায় তাহলে যেন অন্তত আমি ১০ জনকে জানাতে পারি।

আপনার কী মনে হয়, গণমাধ্যম হঠাৎ করে পেছনের লোক বা অন্তরালয়ের লোক খোঁজ করল কেন? আপনি একটু আগে বলছিলেন যে মিডিয়া এস্টাবলিশমেন্ট ও গোয়েন্দা সবাই মিলে এটা করেছে। এটা ছিল যে আন্দোলনের কোর্টটাকে চিনিয়ে দেয়া বা তাকে ধাক্কা দেয়া বা তাকে ধ্বংস করা, এ রকম কিনা, কী মনে হয়েছে?

আন্দোলনে আমাকে এক ধরনের বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি জানতে পেরেছি, এটা আমার সত্যায়নের সুযোগ নেই যে এটা এভাবেই ঘটছে কিনা। কিন্তু পুলিশ বা যারা বিভিন্ন দায়িত্বে ছিল তারা বলছিল যে ওইদিন রাতেই গ্রেফতারের কথা হচ্ছিল এবং ডিবি হারুন এর নেতৃত্ব দিত। কিন্তু পরদিন সকালে ডিবি হারুনকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর আমরা স্থান পরিবর্তন করি। আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নিই। নাহিদ ইসলামকে গ্রেফতার করা স্বাভাবিক। কারণ তিনি সামনে আছেন। আরো ১০ জনকে গ্রেফতার করা স্বাভাবিক, তারা সামনে আছেন। এখন একটা লোককে গ্রেফতার করতে হলে তার জন্য ফ্রেমিং করতে হবে। ফ্রেমিং হচ্ছে এ লোক সবকিছুর খোঁজ-খবর জানে। সে পেছনে থেকে বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।

তখন সরকার আমাকে খুঁজে বের করে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। সরকার বলতে চেয়েছিল তারা সবকিছু জেনে গেছে। আমার কাছে এ রকমই মনে হয়েছে। আমি স্থান পরিবর্তন করি এবং ২ আগস্ট দুপুরের দিকে আমি চলে গেলাম আমার বন্ধুর বাসায়। ৩ আগস্ট আমার যারা শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তারা বললেন, এখন আর গোপনে থেকে কোনো লাভ নেই। তুমি প্রকাশ্যে আসো। ৩ আগস্ট নাহিদ এল। নাহিদকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বাসা থেকে নিয়ে এলেন। আমার আরেক বন্ধু আসাদ এল। পরে আমরা চারজন একসঙ্গে শহীদ মিনারে গেলাম সিএনজিতে করে। যতটুকু চেষ্টা করা যায় পুলিশের নজরে না পড়ি। ৩ আগস্ট কী ধরনের বাংলাদেশ চাই, সেটা নিয়ে আমাদের ওই অনুষ্ঠানে একটা বক্তব্য দিলাম। ওইদিন এক দফার ঘোষণা ও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হয়। অসহযোগ আন্দোলনের ধারণাটি আমরা আমাদের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি করছি। আন্দোলনের একটা পর্যায়ে ৩০, ৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট নার্সরা রাস্তায় নেমে গিয়েছিলেন, মেডিকেল প্র্যাক্টিশনাররা নেমেছেন। আইনজীবীরাও নেমে গেছেন। তখন আমাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় আমরা একটা পর্যালোচনা করলাম। আমরা অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেব। অসহযোগ অর্থ হচ্ছে গান্ধীবাদী আন্দোলন নয়, বরং ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের মতো হবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি এবং যারা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন তারা যেভাবে অসহযোগ আন্দোলন করছেন যেসব শ্রেণী-পেশার মানুষ একটা লক্ষ্যে নেমে পড়বে এবং এক ধরনের সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স করবে। আমাদের লক্ষ্য ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে যারা থাকবেন তারা সবাই নেমে পড়বেন। আর যারা জুলাই অভ্যুত্থানের বিপক্ষে থাকবেন এটা একেবারে স্পষ্ট পার্থক্য হয়ে যাবে। আমরা স্পষ্ট চিনতে পারব, কারা আমাদের পক্ষে এবং কারা আমাদের বিপক্ষে।

এই যে এত শ্রেণী-পেশার মানুষ নামল, এ নামানোর ক্ষেত্রে আপনাদের কি কোনো যোগাযোগ ছিল?

সেটা ছিল। বামপন্থীদের একটা অংশের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল যারা আওয়ামীবিরোধী। বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপ, অ্যাক্টিভিস্ট বা শিক্ষকদের সংগঠন মনে করল, তারা আর নৈতিক দায়ভার নিতে পারব না। আওয়ামী লীগকে রাখাটা বাংলাদেশের সেকুলারিজম, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা—এগুলো দমন করার জন্য জরুরি ছিল। কিন্তু আর কতদিন ধরে নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাব! কারো কারো রাজনৈতিক লড়াই হয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। ওই সময় থেকেই তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২০১৯ সালের ডাকসু আন্দোলন ও ২০২০ সালে ভারত কর্তৃক সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। সীমান্ত হত্যাবিরোধী আন্দোলনে সব ধরনের মানুষ এসেছে। আনু মুহাম্মদ থেকে শুরু করে গণসংহতির নেতারাও আন্দোলনে এসেছেন। যারা বাংলাদেশের পক্ষে ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থী আছেন বা যারা বামপন্থী না হয়ে সিভিল সোসাইটির অংশ আছেন, তাদের সবার সঙ্গে কিন্তু আমাদের যোগাযোগ ২০১৯ ও ২০২০ সালেই শুরু হয়। কভিড-১৯-এর কারণে আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। পরে ২০২২ সালে আবার আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়।

আবার যখন ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হলো, তখন কাশ্মীরের লোকদের নিয়ে আমরা একটি সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করলাম। সেখানে বামপন্থী সব ছাত্র সংগঠনকে আমরা দাওয়াত দিয়েছি। ফলে বোঝাপড়া ও যোগাযোগ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু যাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক অবস্থান আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক ওই সময় থেকে শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগকে সাপোর্ট দেব কি দেব না—এ প্রশ্নে ছাত্র ইউনিয়নের একটা অংশ ভাগ হয়ে গেল। ছাত্র ইউনিয়ন যে অংশটা ভাগ হয়ে গেল সে অংশের সঙ্গে আমাদের একটা যোগাযোগ ২০২২-২৩ সালেই ছিল। আমরা বিভিন্ন প্রোগ্রামও করেছি একসঙ্গে। পাঠচক্র বা সেমিনার আয়োজন বা আমাদের টিএসসি-ভিত্তিক যে সভা-সেমিনারগুলোর সুযোগ ছিল সেগুলোয় আমরা তাদের দাওয়াত করেছি এবং প্রোগ্রামে এনেছি।

একদফা ও তার পরে আপনারা ‘‌লং মার্চ টু ঢাকা’ যে কর্মসূচি অর্থাৎ অসহযোগ থেকে একেবারেই চূড়ান্ত কর্মসূচিতে চলে গেলেন—এটা কি হিসাব-নিকাশ করে? নাকি চূড়ান্ত মুহূর্তে চলে এসেছে?

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং জনগণের অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়। কারফিউ তখন ঘোষিত হয়নি। কারফিউ ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় ঘোষিত হবে। ৩ আগস্ট সরকারকে আহ্বান জানালাম, আর রক্তপাত কিংবা হত্যা নয়। আমরা চাই সরকার চলে যাক। আমরা নতুন একটি সরকার ও নতুন একটি বন্দোবস্তের দিকে যাব। সেটা সরকার মানেনি। তখন আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এটা একটা শেষ পরিস্থিতি। হাসিনা আর ওই জায়গায় নেই তাকে কোনো রকম সুযোগ দেয়া যাবে। বরং এটি একটা মরণপণ লড়াই। এখানে কোনো অনারেবল এক্সিটের (সম্মানজনক প্রস্থান) সুযোগ নেই। বাংলা ব্লকেড থেকেই আমাদের গণভবন ঘেরাওয়ের পরিকল্পনা ছিল। ৩ আগস্টও কিন্তু অনেকে বলেছে, চলেন গণভবনে যাই। কিন্তু আন্দোলনের বিভিন্ন স্তর থাকে। মানুষের চৈতন্যের স্তর থাকে বা জনগণ কতটুকু আমাদের সমর্থনে আছে। ওই সমর্থনকে কতটুকু আমরা আর্টিকুলেট করতে পারব, সেটাও একটি বিষয়। ৩ তারিখ আমরা যে ঘোষণা দিলাম, সেটি দেখি সরকার কনসিডারেট (বিবেচক) হয় কিনা। কিন্তু কনসিডারেট হওয়ার প্রশ্নই আসে না হাসিনার কাছে। ৪ তারিখ গুলি চলার পর বিকাল ৫টায় ঘোষিত হলো সন্ধ্যা থেকে কারফিউ শুরু হবে। তখন আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম ৬ তারিখের পরিবর্তে ৫ তারিখ ঢাকা মার্চ হবে। এটা আসিফ মাহমুদ ফেসবুক ভিডিওতে ঘোষণা করল। তখন আমরা একটা স্লোগান বানালাম, ‘‌ঢাকায় আস জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা’। যদি সরকার দায়িত্ব ছেড়ে দেয় তখন কী রকম সরকার হবে—সেটার ড্রাফটিংয়ের (খসড়া) কাজ ৪ তারিখ রাতেই করি। গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ৪ তারিখ রাতে ছাত্রশিবিরের একটি অংশের সঙ্গে কথা হয়েছে, ফরহাদ মজহারের গ্রুপের সঙ্গে কথা হয়েছে, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা অনিক রায়ের সুবাধে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ অনেক বামপন্থী সার্কেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। মুসতাঈন জহিরের সুবাধে ওনার একটা সার্কেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। শুরু থেকেই আসিফ মাহমুদ ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। আমি মনে করি যে আমাদের এক ধরনের বাজে স্বভাব, আমরা আন্দোলনে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে এক জায়গায় কনফাইন (সীমিত) করতে চাচ্ছি। বাস্তবতা হচ্ছে সবগুলোর পক্ষের অংশগ্রহণ ছিল। আজকে হয়তো আমি স্লোগান লিখছি, আগের দিনের স্লোগান হয়তো অন্যের লেখা।

বিশেষ গণমাধ্যমটি আপনাকে নিশানা করল, আপনাকে ধ্বংস করার জন্য হয়তো রাষ্ট্রযন্ত্র তা ব্যবহার করত। সৌভাগ্যের কথা আপনাকে তারা খুঁজে পায়নি। এরপর আবার আমরা দেখছি মাস্টারমাইন্ড কথাটা এল আপনার ওপর। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মাস্টারমাইন্ড শব্দটি স্বীকার করি না। শুরু থেকেই এ শব্দের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অস্বীকার করছি। কাউকে বলির পাঁঠা বানানোর জন্য মাস্টারমাইন্ড বানানো হয়েছে। নাহিদ ইসলাম নিজে বলেছেন, তাকে যখন মারা হচ্ছিল তখন ‘মাস্টারমাইন্ড’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। এজন্য মাস্টারমাইন্ড শব্দকে আমি ডিজওউন করি। আন্দোলনের কথা যদি বলেন, আমাদের অবশ্যই কৌশল ছিল। শুধু বাংলাদেশ না, সারা বিশ্বের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা গণ আন্দোলন নেই যেখানে কোনো রকম পরিকল্পনা বা কৌশল থাকে না। অবশ্যই কৌশল ছিল। ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ তারিখ ঢাকা মার্চের কর্মসূচি নিয়ে আসাও একটা কৌশলের অংশ। পাঁচ-ছয় জন মানুষ সিদ্ধান্ত নিল, সিদ্ধান্ত নেয়ার পর পাঁচ-ছয়টা সার্কেলের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শভিত্তিক একটা সিদ্ধান্ত নিল, সেটাকেও স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের যে লড়াই এবং জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেটাকেও স্বীকার করতে হবে। যখন আন্দোলনে নেতা ছিল না, নেতারা আত্মগোপনে ছিল, আবার আন্দোলনের নেতাদের কেউ কেউ গুম ছিল, কেউ গ্রেফতার ছিল, সেই সময়ে যাত্রাবাড়ীতে যেসব মানুষ রাস্তায় নেমেছিল তারা কোনো নেতার কথা ভাবেনি। যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার ছাত্ররা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। আমি ভাবিওনি যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নামবে। এটার কোনো ক্রেডিট নেয়া আমার দরকার নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের সাধারণ দাবিতে ভূমিকা রেখেছে।

৬ আগস্টের কর্মসূচি ৫ তারিখ আনা না হলে অনেক মানুষকে হত্যা করা হতো। আমি যদি ভুল না বলি, ৪ তারিখে কারওয়ান বাজার থেকে বাংলামোটরের মধ্যে প্রচুর সংঘর্ষ হয়েছে এবং অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ৪ তারিখ সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে কারফিউ ঘোষণা করে সরকার। শাহবাগে যারা ছিল তাদের কাছে আমাদের বার্তা ছিল, তারা যেন প্রতীকীভাবে হলেও কারফিউ ভাঙে। যাতে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যায় আমরা কারফিউ ভেঙেছি। তাই হয়েছে।

৪ আগস্ট রাতে কী রকম সরকার হতে পারে তার একটা খসড়া প্রস্তুত করলাম আমরা। তখন সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কারা সরকারের উপদেষ্টা হতে পারে সে বিষয়ে কথা হয়েছে। ৩ আগস্টই আমাদের বোঝাপড়া হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান করব। ৪ আগস্ট বৈঠকে একটা গ্রুপ অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে কথা বলেছিল, আরেকটা গ্রুপ ড. ইউনূসের সঙ্গে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পলায়ন করলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর ঢাকায় সবচেয়ে বড় জনসমাবেশ ঘটল। ময়দান থেকে ঘোষণা না এসে শলাপরামর্শ করে ঘরের ভেতর থেকে সরকারের রূপরেখা এল কেন?

৪ আগস্ট রাতেই নাহিদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে বলেছিলাম পরদিন শাহবাগের আশপাশে থাকতে। তারা এক শিক্ষকের বাসায় ছিলেন। আমরা পরদিন কি ঘোষণা দেব তার খসড়া করছিলাম। আমি ওই রাতে মহানগর প্রজেক্টে আমার এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। ৫ আগস্ট বেলা ১১টায় সেখান থেকে সিএনজি করে বের হই। আমার সঙ্গে ছিল আসাদ। সাতরাস্তা মোড়ে পুলিশ আমাদের আটকায়। ২০-২৫ জন পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলে। তখন কারফিউ চলছিল এবং পুরো ঢাকার পরিস্থিতি থমথমে। আসাদ তার পেশাজীবী পরিচয় দেয় এবং মেডিকেল ইমার্জেন্সির কথা জানায়। একটা প্রতিবেদন ছাড়া আমি যেহেতু অতটা পরিচিত ছিলাম না পুলিশ আমাদেরকে চিনতে পারেনি। এদিকে নাহিদ ও নাসিরের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। দেড়টা-দুটার দিকে যখন হাসিনা পলায়নের খবর এল তখন বিজয়ী জনতা নাহিদ, আসিফদের সংসদ ভবনের দিকে নিয়ে গেল। ৫ আগস্ট আসিফ-নাহিদের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ছিল আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। রাতেই আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, ৫ আগস্ট আমরা একটা ঘোষণাপত্র দেব। আপনি যদি দেখেন, ৪ আগস্ট আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিল যা আমার লেখা ছিল। পরদিন তা আরো বিস্তারে ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। সেটাকে বিস্তারিত করে আমরা একটা ঘোষণাপত্র দিতাম। এ ঘোষণাপত্র তৈরিতে সব পক্ষ জড়িত ছিল। সামিনা লুৎফা ম্যাম বলেন, মনজুর আল মতীন বলেন অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে অপেক্ষা করছিল। পরিকল্পনা ছিল, ক্যাম্পাসের ভেতরে বসে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে কী ঘোষণাপত্র যাবে। এটা জনগণের সামনেই প্রথমে ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। আসিফ-নাহিদরা চলে যাওয়াতে আমরা তা করতে পারিনি। আমি মনে করি না এটা কোনো ইচ্ছাকৃত বিষয় ছিল। জনগণের নেতাকে জনতা নিয়ে গেছে। যাই হোক, নাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ততক্ষণে মোমেন্ট শেষ। মানুষ রেভুলেশনারি ভায়োলেন্সে ব্যস্ত হয়ে গেছে। কেউ বাড়ি ফিরে গেছে। মানুষ আনন্দের মধ্যে ছিল, মিষ্টি বিতরণ করছিল। কিন্তু আমরা আমাদের ওই মোমেন্টটা হারিয়ে ফেললাম।