বিগত সরকারের আমলে সব ধরনের এনার্জি সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৫ বছর ধরে অন্যায় ও অযৌক্তিক তথা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জ্বালানি খাতে আর্থিক ঘাটতি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি ও মূল্যহার বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক তা সমন্বয়ও অব্যাহত থাকে। ফলে রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা হারায়। তাতে ভোক্তা জ্বালানি সুবিচার বঞ্চিত হয় এবং জ্বালানি অধিকার হারায়।
দুই. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগের আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন অব্যাহত থাকায় লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩-এর ৩৪ ধারার সঙ্গে ৩৪ক ধারা সংযোজন করে সব ধরনের এনার্জির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে, ‘...কমিশন কর্তৃক প্রবিধান প্রণয়ন না করা পর্যন্ত, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করিতে পারিবে।’—এ বাক্য সংযোজন করা হয়।
এরপর মন্ত্রণালয় ঘন ঘন বেশি বেশি এনার্জির মূল্যহার বাড়িয়ে জনগণের জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি ঘটায় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা চরম বিপর্যয়ে পড়ে। ফলে জনগণের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়। এখনো পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
তিন. যদিও জ্বালানি খাতে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, মূল্যহার নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনয়ন, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ১৩ নং আইন দ্বারা স্বাধীন নিরপেক্ষ রেগুলেটরি কমিশন হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। আইনের ২২ ধারায় বর্ণিত কমিশনের কার্যাবলি ও ক্ষমতাগুলোর অন্যতম:
২২। (ক) এনার্জি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, উহার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের মান নিরূপণ, এনার্জি অডিটের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে জ্বালানি ব্যবহারের খরচের হিসাব যাচাই, পরীক্ষণ, বিশ্লেষণ, জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতার মান বৃদ্ধি ও সাশ্রয় নিশ্চিতকরণ;
২২। (ঘ) লাইসেন্সির (এনার্জি খাতে সেবাদানকারী বিইআরসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান/কোম্পানি) সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে স্কিম অনুমোদন এবং এই ক্ষেত্রে তাহার চাহিদার পূর্বাভাস (load forecast) ও আর্থিক অবস্থা (financial status) বিবেচনায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ;
২২। (ঝ) বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এনার্জি সঞ্চালন, বিপণন, মজুদকরণ, বিতরণ ও সরবরাহ বিষয়ে প্রয়োজন বোধে, সরকারকে সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান;
২২। (ঞ) লাইসেন্সিদের মধ্যে এবং লাইসেন্সি ও ভোক্তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করা এবং প্রয়োজনীয় বিবেচিত হলে আরবিট্রেশনে প্রেরণ করা এবং
২২। (ট) ভোক্তা বিরোধ, অসাধু ব্যবসা বা সীমাবদ্ধ (monopoly) ব্যবসা সম্পর্কিত বিরোধের উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করা।
এসব ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সরকারের অধিদপ্তরের মতো সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গত ১৫ বছরে কেবল মূল্যহার নির্ধারণের কাজ করেছে। আইনের ২২ ধারায় বর্ণিত উল্লিখিত কার্যক্রম থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে। অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় থাকে। বর্ণিত ক্ষমতা ব্যবহারেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বর্তমানেও ওই অবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
চার. তাছাড়া এনার্জির ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনের ৩৪ ধারায় বর্ণিত বিবেচ্য বিষয়গুলো:
৩৪। (২)(খ) বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এনার্জি সঞ্চালন, বিপণন, বিতরণ, সরবরাহ ও মজুদকরণের ব্যয়ের সহিত ট্যারিফ সামঞ্জস্যপূর্ণ করা;
৩৪। (২)(গ) দক্ষতা, ন্যূনতম ব্যয়, উত্তম সেবা প্রদান ও উত্তম বিনিয়োগ;
৩৪। (২)(ঘ) ভোক্তাস্বার্থ;
৩৪। (৪) কমিশন লাইসেন্সি এবং অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগণকে শুনানি দেওয়ার পর ট্যারিফ নির্ধারণ করিবে;
৩৪। (৫) কমিশন একক বা পৃথক পৃথক আদেশ দ্বারা, তৎকর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোন অর্থবছরে প্রয়োজনে এক বা একাধিবার পরিবর্তন করিতে পারিবে।
গত ১৫ বছরে ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচিত হলে এনার্জি খাতে আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকত। ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে বছরে বারবার এনার্জির মূল্য বাড়ানোর জন্য আইনের উপধারা ৩৪(৫) বদলাতে হতো না। বছরে বিদ্যমান ঘাটতি গ্যাসে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বিদ্যুতে ৪২ হাজার কোটি টাকা হতো না। গ্যাসের মূল্যহার ৩০ টাকাও হতো না।
বর্তমান বিইআরসি অতীত বিইআরসিকে অনুসরণ না করে উল্লিখিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নিলে গ্যাসের মূল্যহার ৩০ থেকে ৭৫ টাকা করার প্রস্তাব বিইআরসিকে বিবেচনা করতে হতো না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গণ-অভ্যুত্থান ও জীবনদানের মতো ঘটনা রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটালেও আলোচ্য ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি! মন্ত্রণালয় ও বিইআরসির কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেনি!
পাঁচ. পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকারের পতন হয়েছে। বর্তমান সরকার ওই বিশেষ বিধান আইন এবং বিইআরসি আইনে সংযোজিত ওই ধারা ৩৪ক বাতিল করে। তবে আইনে সংযোজিত, ‘...কমিশন কর্তৃক প্রবিধান প্রণয়ন না করা পর্যন্ত, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করিতে পারিবে’ বাক্যটি বাতিল করা হয়নি। এরপর মন্ত্রণালয় কর্তৃক তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ অব্যাহত আছে। আবার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ বাতিল করা হলেও তাতে ২(খ) ও ২(গ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে ওই আইনের আওতায় যেসব অন্যায় ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে, সেসব কার্যক্রমকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। তাতে জনগণ প্রতারিত হয়েছে। ফলে বলা যায়, সরকার ও বিইআরসির চেতনা ও ধারণায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। লুণ্ঠন ধারাবাহিকভাবে সুরক্ষা পাচ্ছে।
ছয়. বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ক্যাবের পক্ষ থেকে দেয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংস্কার প্রস্তাব কোনো কাজে আসেনি। বিইআরসি লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মূল্যহার কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকারকেও কোনো পরামর্শ দেয়নি। বরং বিইআরসি কর্তৃক গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, পেট্রোবাংলা এবং তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল, সুন্দরবন ও কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রাকৃতিক গ্যাসের শিল্প ও ক্যাপটিভ শ্রেণীতে বিদ্যমান, প্রতিশ্রুত ও সম্ভাব্য ভোক্তার গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর ২৬ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি দিনব্যাপী শুনানির আয়োজন করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বিদ্যুতেরও শুরু করা হবে।
সাত. শোনা যায়, গ্যাসে বিদ্যমান আর্থিক ঘাটতি বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রতিশ্রুত ও সম্ভাব্য শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের বর্তমান মূল্যহার ৩০ থেকে ৭৫ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব বিইআরসি আইনের ধারা ২২ ও ধারা ৩৪ এবং জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিবেচনায় নিম্নে উল্লেখিত তিনটি প্রস্তাব গৃহীত ও বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত উল্লিখিত গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর আয়োজিত শুনানি এবং পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য ভোক্তাদের পক্ষ থেকে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পত্রে বিইআরসির চেয়ারম্যানকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানায়:
(১) বিগত সরকারের আমলে ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এনার্জি তথা বিদ্যুৎ, তরল জ্বালানি, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি, এলপিজি এবং সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সরবরাহে অন্যায় ও অযৌক্তিক তথা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কী পরিমাণ সমন্বয় করা হয়েছে, এর পরিমাণ বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত হতে হবে,
(২) লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা রোধ করে এবং সরকারের রাজস্ব কমিয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার ও ভর্তুকি কী পরিমাণ কমানো সম্ভব তা বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত হতে হবে এবং
(৩) জ্বালানি অপরাধীদের বিচারের জন্য বিইআরসিকে বিইআরসি আইনের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।
তাছাড়া জ্বালানি অধিকার সংরক্ষণের জন্য জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩ অংশীজন প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা সংস্কার করতে হবে।
মানুষকে বাঁচান, তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যহার কমান।
এম শামসুল আলম: জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)










