দেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের আনুপাতিক হারও বেড়ে চলেছে। দেশে এখন প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। এ প্রবীণরা সবাই একটি সময় পর্যন্ত নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। আজ দেশের সেই প্রবীণরা সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে তাদের প্রদত্ত সেবার বিপরীতে সামাজিক সম্মান আর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রত্যাশা করেন। প্রবীণদের জীবনকে স্বস্তিদায়ক ও শান্তিপূর্ণ রাখা কালের দাবি। দেশের প্রবীণরা বিশ্বাস করেন, সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় না করেও সরকার সদিচ্ছার মাধ্যমে তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবনের অনেকখানি নিশ্চিত করতে পারে। দেশের প্রবীণরা আশা করেন না শুরুতেই সরকার তাদের জন্য উন্নত বিশ্বের মতো সুযোগ-সুবিধা দিতে উদ্যোগী হবে। তবে এটা আশা করেন, সরকারিভাবে প্রবীণদের যে সামান্য সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান আছে সে ব্যবস্থাটুকু সহজতর করা হবে। যদিও সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ে যে বয়স্ক ভাতা দেয়া হয় তা দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন সম্ভব না—এটা সবাই জানে ও বোঝে। তাই সে বিষয়ে এখানে কিছু বলতে চাই না। শুধু বলতে চাই, একজন প্রবীণ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে প্রতিনিয়ত যেসব বৈষম্যের শিকার হয়, নিপীড়ন ও নির্যাতনের মধ্যে বাস করে তা থেকে মুক্তি দিতে কিছু সামান্য উদ্যোগ গ্রহণ করলেই হয়।

প্রবীণদের সব থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে তাদের শরীর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন কল-কবজা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিডনি-ফুসফুস-লিভার-হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। দাঁত পড়ে যায়, চোখ ও কানের কার্যকারিতা কমতে থাকে। এতে করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নানা শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। শরীরের পাশাপাশি আয়বৈষম্যের কারণেও প্রবীণদের একটা বিশাল সমস্যায় পড়তে হয়। যদিও যারা আয়বৈষম্যের শিকার নন এমন অনেকের কথাও জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে প্রকাশ হতে দেখি। এর আগেই উল্লেখ করেছি, সাধারণ মানুষ উন্নত বিশ্বে প্রবীণদের জন্য প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা আমাদের দেশে এখনই প্রত্যাশা করে না। তারা শুধু বলতে চায়, যেসব মানবিক সংগঠন এগিয়ে এসে প্রবীণদের নিয়ে কাজ করছে তাদের সংগঠনের কাজকে কিছু আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার যেন সহজ করে তোলে। যেমন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ওষুধ কোম্পানির সহযোগিতায় বিত্তহীন প্রবীণদের বিশেষ ব্যবস্থায় ওষুধের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি। এখানে অর্থের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তরিক উদ্যোগ।

কয়েক মাস আগে জাতীয় পত্রিকায় প্রথম দেখেছিলাম, সাবেক রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ একটি সভায় দেশের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য করণীয় বিষয়ে নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য, একজন রাষ্ট্রপতি যিনি দলীয় প্রবীণ নেতা ছিলেন তার প্রত্যাশা রক্ষা করতেও তৎকালীন সরকার ন্যূনতম আগ্রহ প্রকাশ করেনি। আসলে দেশের ক্ষমতাবানরা বিত্তবান, ব্যবসায়ী সমাজের মানুষ। প্রবীণদের নিয়ে তাদের ভাবনার সময় কোথায়? যে দেশে সাধারণ জনগণের কল্যাণ বিবেচনায় চিন্তাভাবনা করার চেয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতি স্বপ্ন দেখিয়ে নিজেদের ১৪ পুরুষের অভিজাত জীবন নিশ্চিত করাই রাজনীতিবিদদের একমাত্র ভাবনা ছিল সেখানে প্রবীণদের কথা ভেবে একজন রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশা পূরণ কি সত্যিই সম্ভব?

নতুন করে দেশের প্রবীণ নাগরিকের জন্য চিন্তাভাবনা সুযোগ সৃষ্টি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বেতন মওকুফের নির্দেশ জারি করেছেন। সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই এ নির্দেশ কার্যকর হবে। সরকারি এমন উদ্যোগ সাধারণ প্রবীণদের উৎসাহী করে তুলেছে। দেশের ষাটোর্ধ্ব দুই কোটি প্রবীণ মানুষ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকে সম্মান হারানোর ভয়ে আবার অনেকে আয়বৈষম্যের শিকার হয়ে নিপীড়ন সহ্য করে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন। সে কারণেই বলতে চাই, সরকার প্রাথমিকভাবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে কোষাগারের অর্থ ব্যয় না করেও প্রবীণদের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রবীণরাও বিশাল কিছু পেয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা করে না। দেশের প্রবীণদের পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বিবেচিত হোক, সরকার প্রবীণদের ব্যাপারে আন্তরিক তা প্রকাশ করে না। দেশের প্রবীণদের পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বিবেচিত হোক, সরকার প্রবীণদের ব্যাপারে আন্তরিক তা প্রকাশ করে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করুক, কিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ সামনে নিয়ে আসুক—এটুকুই প্রত্যাশা।

দেশের প্রবীণ জনগণের জন্য একটা নীতিমালা প্রণয়ন করে তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে আসতে পারে সরকার। হাসপাতাল, গণপরিবহন, সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট, বহির্গমন, কর ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি-টেলিফোনসহ অন্য বহু ক্ষেত্রে প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে প্রাগুক্ত সব ক্ষেত্রে প্রবীণ ডেস্ক করা যেতে পারে যেখানে প্রবীণরা নিজেদের কাজে কিছুটা অগ্রাধিকার এবং নিরাপত্তা পাবেন। কিছু ক্ষেত্রে কোটা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে, যে কোটার ভিত্তিতে তারা হাসপাতালে গেলে একটা সিট পাবেন, রেলের টিকিটটা নিশ্চিতভাবে পাবেন, বাসের টিকিট এবং সিট পাবেন, পাসপোর্ট জমা ও গ্রহণ করতে পারবেন, বিভিন্ন সেবার বিলটা সহজে জমা দিতে পারবেন, সেবা পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে না। প্রাথমিকভাবে এসব সুবিধা প্রবীণদের প্রদান করার জন্য সরকারি কোষাগারের কোনো অর্থ ব্যয় করা লাগবে না। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে সরকারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২০-৩০ শতাংশ রেয়াতের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

দেশের ধনী-গরিব সব প্রবীণই কমবেশি একই বৃত্তে পড়ে আছে। তাই শুধু আইন করে কারো ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে কোনো লাভ হবে না। প্রবীণদের অতীত বিবেচনা করে তাদের নিশ্চিত আনন্দময় জীবন নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের অবসর গ্রহণের পর শতভাগ পেনশন প্রদান করে। একজন সরকারি কর্মচারী দেশের কল্যাণে কতটা নিবেদিত ছিলেন তা সাধারণ জনগণের কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন হলেও তারা যদি অবসর জীবনে কাজ না করেই শতভাগ পেনশন পেতে পারেন তাহলে প্রবীণদের অন্যায় কোথায়? দেশের যে কৃষক, যে শ্রমিক, যে রেমিট্যান্সযোদ্ধা নিজের জীবন-যৌবন উজাড় করে দেশকে সেবা দিয়ে গেল তারা আজ প্রবীণ জীবনে এসে সরকারি ব্যবস্থায় ন্যূনতম সুযোগ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে? তাই পরিবর্তিত দেশে আজ প্রবীণদের জন্য ন্যূনতম কিছু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ প্রত্যাশা করি। প্রবীণদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে অপ্রাপ্তি ও অসহায়ত্ব থেকে জন্ম নেয়া ক্ষোভ প্রকাশ হওয়ার আগেই সরকারি উদ্যোগ দেখার প্রত্যাশায় রইলাম।

এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)